বাংলায় চাই আইনের দৃঢ় শাসন, জনরোষের দমন সরকারের দায়িত্ব

বাংলায় চাই আইনের দৃঢ় শাসন, জনরোষের দমন সরকারের দায়িত্ব


শুধুমাত্র দুর্নীতির মামলা দিয়ে তৃণমূল দলটাকে পথে বসিয়ে দেওয়া যায়! এবং এই কারণেই দলটা পথে বসছে। রবিবার বিকেলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়িতে তৃণমূল পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। বৈঠকে কোরাম-ই হয় নি। মাত্র ২০ জন বিধায়ক উপস্থিত ছিলেন! মমতা রাগ করে বৈঠকস্থলেই উপস্থিত‌ই হন নি। বৈঠক বাতিল হয়ে গেছে। এক‌ই অবস্থা রাজ্যের‌ তৃণমূল পরিচালিত পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি, জেলা পরিষদ, পুর কর্পোরেশন ও পুরসভাগুলির।

এই স্বায়ত্বশাসিত সাংবিধানিক সংস্থাগুলি কোলাপ্স করে যাচ্ছে প্রতিদিন। সভাধিপতি-চেয়ারম্যান-মেয়রেরা দফতরে আসা ছেড়ে দিয়েছেন। কাউন্সিলররা গাঢাকা দিয়েছেন। দুর্নীতির অভিযোগে ইতিমধ্যেই অনেকে গ্রেফতার। পুরসভা, জেলা পরিষদগুলিতে নতুন সরকার হিসেব পরীক্ষা শুরু করলে তৃণমূলের কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদের সদস্যরা দলে‌ দলে‌ দল ছাড়বেন। দল ছাড়া শুরু হয়ে গেছে। অনেকেই হাতেপায়ে ধরে বিজেপিতে আসতে চাইছেন। কেউ কংগ্রেস বা সিপিএমের দরজায় টোকা দিয়ে দেখছেন, দরজা তাদের জন্য খোলে কিনা। গ্রেফতারের হাত থেকে বাঁচতে রাজনৈতিক সন্ন্যাসে যেতেও রাজি অনেকে।

একটা কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বিরোধী দলের নেতাকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল মারা, বিরোধী দলনেতার গাড়ি ঘিরে বিক্ষোভ, গাড়ি ভাঙচুর, এগুলো আর যাই হোক, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি নয়। তৃণমূল সরকারে থাকতে এসব করে জনরোষ বলে চালাতো। এখন তৃণমূল করেছে বলে‌ বিজেপিকেও করতে হবে? তাহলে পরিবর্তনটা কী হল? একটা ভাল খবর যে পুলিশ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে মামলা করে সোনারপুরের ঘটনায় পাঁচ-ছয়জনকে গ্রেফতার করেছে।

একটা গণতান্ত্রিক দেশে, একটা সভ্য সমাজে গণরোষ, জনরোষ কোনও অজুহাত হতে পারে না। জনরোষ‌ই যদি নির্ণায়ক হয় তবে আইনের শাসন, সংবিধান কী দরকারে আছে? গণরোষ, জনরোষ শব্দটাকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহারে অভ্যস্ত বামপন্থীরা। ১৯৮২-র ৩০ এপ্রিল বিজন সেতুর উপর আনন্দমার্গীর সন্ন্যাসী-সন্ন্যাসিনীদের পুড়িয়ে মারার ঘটনাকেও তৎকালীন সিপিএম নেতৃত্ব গণরোষ বলে প্রচার করেছিল।‌ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গণরোষ পরিকল্পিতভাবে উৎপাদন করা হয়। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বাংলাকে বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। নচেৎ ক্ষমতার অলিন্দে শত পরিবর্তনেও পশ্চিমবঙ্গ একচুলও এগোবে না। রাজ্যের কোথাও জনরোষের ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছে, এই আঁচ পাওয়া মাত্রই প্রশাসনের দায়িত্ব হচ্ছে তা প্রশমনে সব রকমের ব্যবস্থা নেওয়া।

একটা কথা মাথায় রাখতে হবে, গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ব্যবস্থায় মেরে কাউকে থামানো যায় না। ১৯৯০ সালের ১৬ আগস্ট কংগ্রেসের ডাকা কলকাতা বনধের দল হাজরা মোড়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মাথায় ডান্ডা মেরে মমতাকে যে পলিটিক্যাল ডিভিডেন্ড সিপিএমের লালু আলমেরা দিয়েছিল, তা মমতার পরম সুহৃদ‌রাও দিতে পারেন নি। ১৯৮৯-এর ডিসেম্বরের লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর কেন্দ্রে সিপিএমের মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে পরাজিত মমতাকে পলিটিক্যাল অক্সিজেন যুগিয়েছিল হাজরা মোড়ের ঘটনা। ইট-পাটকেল ছুঁড়ে প্রতিপক্ষের নেতাকে হেডলাইনে নিয়ে আসে আহাম্মকেরা। পশ্চিমবঙ্গে এখন আশু দরকার সুশাসন, কঠোর হাতে আইনের শাসন ও ব্যাপক কর্মসংস্থান; অহেতুক, অকারণ রাজনৈতিক উত্তেজনা নয়। চুলোচুলি, ঠ্যাঙাঠেঙি এইসব মানুষকে স্যাডিস্টিক প্লেজার দেয় বটে, কিন্তু দিনশেষে কর্মনাশ করে মানুষের‌ই।

Feature image is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com