বিশ্বের বৃহত্তম যুবশক্তির দেশ ভারত। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই বিপুল যুবশক্তিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দক্ষ ও কর্মক্ষম করাটাই আজকের দিনের সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। লিখলেন অরুণ কুমার–
প্রতি বছর ১৫ জুলাই পালিত হয় বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস (World Youth Skills Day)। তরুণ প্রজন্মকে কর্মসংস্থান, উন্নত কর্মপরিবেশ এবং উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক দক্ষতায় সক্ষম করে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরতে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ পরিষদ ২০১৪ সালে এই দিনটির ঘোষণা করে। এরপর এক দশকেরও বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। এই সময়ে বিশ্বজুড়ে যেমন দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার গুরুত্ব বহুগুণ বেড়েছে, তেমনি ভারতেও দক্ষতা উন্নয়নকে কেন্দ্র করে নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।
২০২৬-এর প্রতিপাদ্য: “একটি ভাগ করা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষতা”
এ বছরের প্রতিপাদ্য “Skills for a Shared Future” বা “একটি ভাগ করা ভবিষ্যতের জন্য দক্ষতা”। এই প্রতিপাদ্যের কেন্দ্রে রয়েছে দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মসংস্থানের বাজার, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), অটোমেশন এবং ডিজিটাল রূপান্তরের মতো বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তরুণদের প্রস্তুত করে তোলা। অর্থাৎ, শুধু চাকরি পাওয়ার জন্য নয়, ভবিষ্যতের সমাজ ও অর্থনীতিকে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্যও দক্ষতা অর্জন এখন অপরিহার্য।
ভারতেও সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে নানা কর্মসূচির মাধ্যমে এই দিনটি পালন করা হয়। তবে কেবল আনুষ্ঠানিক উদ্যাপন নয়, আমাদের প্রয়োজন একটি গভীর আত্মসমালোচনা—ভারতের যুবসমাজ কি সত্যিই আগামী বিশ্বের জন্য প্রস্তুত?
স্বামী বিবেকানন্দের দৃষ্টিতে যুবশক্তি
ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে স্বাভাবিকভাবেই স্মরণে আসেন স্বামী বিবেকানন্দ। তিনি যুবকদের জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি বলে মনে করতেন। তাঁর মতে, শিক্ষা মানে কেবল তথ্য সঞ্চয় নয়; শিক্ষা এমন এক শক্তি, যা মানুষের অন্তর্নিহিত সামর্থ্যকে জাগিয়ে তোলে এবং তাকে কর্মক্ষম, আত্মবিশ্বাসী ও আত্মনির্ভর করে তোলে।
বিবেকানন্দ বারবার জোর দিয়েছিলেন চরিত্রগঠন, শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রম, নেতৃত্বের গুণ এবং সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতার ওপর। তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থার কথা বলেছিলেন, যা জ্ঞান ও দক্ষতার সমন্বয়ে তরুণদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করবে। আজকের দক্ষতাভিত্তিক অর্থনীতিতে তাঁর এই চিন্তাধারা নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ভারতের অবস্থান: আশার আলো, নাকি সতর্কবার্তা?
ভারতের যুবশক্তি নিয়ে আশাবাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের শিক্ষিত যুবকদের মধ্যে কর্মযোগ্যতার হার (Employability) প্রায় ৫৬.৩৫ শতাংশ। আবার AI-ভিত্তিক দক্ষতার ক্ষেত্রেও ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রতিভাভান্ডার; বৈশ্বিক AI প্রতিভার উল্লেখযোগ্য অংশ ভারতীয়দের হাতে।
তবে ছবির অন্য দিকটিও উদ্বেগজনক। আনুষ্ঠানিক বৃত্তিমূলক বা দক্ষতা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত যুবকের হার এখনও অত্যন্ত কম। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও জাতীয় মূল্যায়ন অনুসারে, ১৫-২৫ বছর বয়সী ভারতীয় যুবকদের মাত্র প্রায় ৫.৪ শতাংশ আনুষ্ঠানিক দক্ষতা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে। তুলনায় দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রায় ৯৬ শতাংশ, জাপানে ৮০ শতাংশ এবং জার্মানিতে ৭৫ শতাংশ যুবক-যুবতী আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের আওতায় আসে।
এই পরিসংখ্যান আমাদের সামনে এক দ্বৈত বাস্তবতা তুলে ধরে। একদিকে ভারতের রয়েছে বিপুল যুবসম্পদ ও প্রতিভা, অন্যদিকে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণের প্রসারে এখনও বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
ভবিষ্যতের কাজের জন্য প্রস্তুতি
বিশ্ব অর্থনীতি দ্রুত বদলে যাচ্ছে। AI, রোবোটিক্স, ক্লাউড কম্পিউটিং, সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা অ্যানালিটিক্স, গ্রিন টেকনোলজি এবং ডিজিটাল পরিষেবা আগামী দিনের কর্মসংস্থানের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হলে প্রচলিত ডিগ্রির পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন অপরিহার্য।
ভারতে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন ও উদ্যোক্তা মন্ত্রক, প্রধানমন্ত্রী কৌশল বিকাশ যোজনা (PMKVY), আইটিআই আধুনিকীকরণ এবং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রশিক্ষণ কর্মসূচির মাধ্যমে লক্ষ লক্ষ তরুণকে শিল্পের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা চলছে। Mera Yuva Bharat (MY Bharat) প্ল্যাটফর্ম তরুণদের স্বেচ্ছাসেবা, নেতৃত্ব ও দক্ষতা উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।
আন্তর্জাতিক সূচকগুলিও ইঙ্গিত দিচ্ছে যে ভারত ভবিষ্যতের দক্ষতা অর্জনের পথে এগোচ্ছে। QS World Future Skills Index 2027-এ ভারত বিশ্বে ১৩তম স্থান অর্জন করেছে এবং দক্ষিণ এশিয়া ও নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশগুলির মধ্যে শীর্ষস্থানে রয়েছে। এই সাফল্য আশাব্যঞ্জক, কিন্তু এটিকে শেষ গন্তব্য ভাবার কোনো সুযোগ নেই।
জনমিতিক সুবিধাকে সম্পদে রূপান্তর
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ যুবশক্তির দেশ ভারত। দেশের প্রায় ৬৫ শতাংশ মানুষের বয়স ৩৫ বছরের নিচে। এই জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend) ভারতের সবচেয়ে বড় শক্তি হতে পারে—আবার সঠিক পরিকল্পনার অভাবে এটিই বড় চ্যালেঞ্জেও পরিণত হতে পারে।
তাই এখন সবচেয়ে জরুরি-
- বিশ্বমানের বৃত্তিমূলক শিক্ষা,
- শিল্পের চাহিদা অনুযায়ী প্রশিক্ষণ,
- ডিজিটাল ও AI-ভিত্তিক দক্ষতা বৃদ্ধি,
- গ্রামীণ ও প্রান্তিক অঞ্চলে প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ,
- এবং তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা মানসিকতার বিকাশ।
গত কয়েক বছরে ইতিবাচক একটি পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে। অনেক তরুণ কেবল চাকরিপ্রার্থী হয়ে থাকার বদলে স্টার্ট-আপ গড়ে তোলা, ফ্রিল্যান্সিং, ডিজিটাল পরিষেবা এবং উদ্ভাবনী উদ্যোগের দিকে ঝুঁকছেন। এই প্রবণতা ভবিষ্যতের ভারতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
দক্ষতার সঙ্গে চাই মানবিকতা
আগামী দিনে বিশ্বব্যাপী দক্ষ কর্মীর ঘাটতি পূরণে ভারতীয় যুবকদের বড় ভূমিকা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, উৎপাদন, বাণিজ্য ও পরিষেবা খাতে ভারতীয় পেশাজীবীদের চাহিদা ক্রমশ বাড়ছে। কিন্তু কেবল প্রযুক্তিগত দক্ষতাই যথেষ্ট নয়; সফল হতে হলে প্রয়োজন সফট স্কিল, যোগাযোগের ক্ষমতা, দলগত কাজ, নেতৃত্ব, নৈতিকতা এবং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মানসিকতা।
এই কারণেই আজও স্বামী বিবেকানন্দের বাণী আমাদের পথ দেখায়। তিনি বলেছিলেন, আত্মবিশ্বাস, চরিত্র, জ্ঞান ও কর্মনিষ্ঠাই যুবসমাজকে মহৎ করে তোলে। দক্ষ, সৎ ও মানবিক যুবশক্তিই একটি জাতির উজ্জ্বল ভবিষ্যতের ভিত্তি।
দক্ষ যুবশক্তি গড়তে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে
বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবস কেবল একটি প্রতীকী উদ্যাপন নয়; এটি ভবিষ্যৎ নির্মাণের আহ্বান। ভারত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে তার বিপুল যুবশক্তি দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পক্ষেত্র, নীতিনির্ধারক এবং সমাজ—সকলকেই সমানভাবে উদ্যোগী ও আন্তরিক হতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত, দক্ষতা শুধু কর্মসংস্থানের চাবিকাঠি নয়; এটি আত্মমর্যাদা, আত্মনির্ভরতা এবং জাতীয় অগ্রগতির ভিত্তি। আর সেই পথেই প্রতিধ্বনিত হয় বিবেকানন্দের চিরন্তন আহ্বান- “যুবসমাজই জাতির সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি।” সেই শক্তিকে জাগিয়ে তুলতে পারলেই বিশ্ব যুব দক্ষতা দিবসের প্রকৃত সার্থকতা অর্জিত হবে
Feature graphic is representational and AI generated.
