কোয়ার্টার ফাইনালেও দেরিতে জ্বলেই ম্যাচ বের করল আর্জেন্টিনা! সম্মান ধরে রেখে বিদায় নিল সুইজারল্যান্ড

কোয়ার্টার ফাইনালেও দেরিতে জ্বলেই ম্যাচ বের করল আর্জেন্টিনা! সম্মান ধরে রেখে বিদায় নিল সুইজারল্যান্ড


খেলার ১১২ মিনিটে সুইজারল্যান্ডের বিরুদ্ধে জয়সূচক গোলটি করার পর উল্লসিত আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার জুলিয়ান আলভারেজ। সংগৃহীত ফটো।

দীর্ঘ সময় আর্জেন্টিনাকে আটকে রেখেছিল সুইজারল্যান্ড। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অভিজ্ঞতা, বেঞ্চের শক্তি ও বড় ম্যাচ সামলে নেওয়ার মানসিক দৃঢ়তা- এই তিন কারণে অতিরিক্ত সময়ে খেলার মোড় দ্রুত ঘুরিয়ে দিল মেসির দল। ৩-১ গোলে জিতে সেমিফাইনালে উঠে মাঠ ছাড়ল আর্জেন্টিনা।

মেসির নেওয়া কর্নার থেকে অ্যালিস্টারের গোল

ম্যাচের শুরু থেকেই বল দখলের লড়াইয়ে এগিয়ে ছিল আর্জেন্টিনা। ঘন ঘন আক্রমণে উঠে আসছিল তারা। মাঝ মাঠে মেসি ও ম্যাক অ্যালিস্টারের যুগলবন্দী সুইস রক্ষণকে চাপের মধ্যে ফেলে। খেলার ১০ মিনিটের মাথায় মেসির নেওয়া কর্নার থেকে হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার।

নিখুঁত মাপে সুইজারল্যান্ডের বক্স লক্ষ্য করে মাথা দিয়ে বল উড়িয়ে দেন অ্যালিস্টার। বলের নাগাল পান নি সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল। প্রথমার্ধে আরও কয়েকটি গোলের সুযোগ তৈরি করেও ব্যবধান বাড়াতে পারেন নি আলবিসেলেস্তেরা।

গোল শোধ করে খেলা জমিয়ে দেয় সুইজারল্যান্ড

গোল খাওয়ার পরেও মনোবল হারান নি সুইজারল্যান্ডের ফুটবলারেরা। রক্ষণে লোক বাড়িয়ে দ্রুত প্রতিআক্রমণে উঠে এসেছেন ড্যান এনদোয়ে এবং ব্রিল এমবোলোরা। মাঝমাঠ দখলে রেখে নিজেদের মধ্যে পাস খেলে খেলা ধরে রেখেছেন সুইস খেলোয়াড়েরা। আর্জেন্টিনার বক্সে বেশ কয়েকবার বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেও ফিনিশিং টাচ দেওয়ার মতো দক্ষ কারিগরের অভাবে গোলের দেখা পায় নি সুইজারল্যান্ড।

দ্বিতীয়ার্ধে ৬৭ মিনিটের মাথায় ড্যান এনদোয়ের করা গোলে খেলায় সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। এআই জেনারেটেড স্কেচ।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই আক্রমণের ঝাঁঝ বাড়ায় সুইজারল্যান্ড। খেলার ৬৭ মিনিটের মাথায় যে সুযোগ আসে, তা আর হাতছাড়া করেন নি সুইসরা। এনদোয়ের করা গোলে সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। রিকার্ডো রদ্রিগেজের পাস থেকে বল পেয়েই আর্জেন্টিনার বক্সে ঢুকে পড়েন এনদোয়ে। মাথা ঠাণ্ডা রেখে জাল লক্ষ্য করে শট। মার্টিনেজ বুঝে ওঠার আগেই গোওললল।

লাল কার্ডে ছন্দপতন সুইসদের

খেলায় সমতা ফিরিয়ে এনে যখন সুইজারল্যান্ডের ফুটবলাররা আরও বেশি আক্রমাত্মক হয়ে ওঠার পরিকল্পনা সাজাচ্ছেন, ঠিক তখনই ছন্দপতন ঘটালেন স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো। বিপক্ষকে ফাউলের ফাঁদে ফেলতে গিয়ে মাঠে ছিটকে পড়লেন এমবোলো। তাঁর সেই ‘প্লে অ্যাক্টিং’ রেফারির নজর এড়ালো না। হলুদ কার্ড দেখালেন রেফারি।‌ আগেই একবার নিজে ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখে বসে আছেন। ডাবল হলুদ কার্ড দেখতেই ‘লাল কার্ড’ দেখে খেলা থেকেই ছিটকে গেলেন এমবোলো। খেলার বয়স তখন ৭২ মিনিট।

লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগে ভেঙে পড়েছেন সুইস স্ট্রাইকার ব্রিল এমবোলো। তাঁকে স্বান্তনা দিচ্ছেন সতীর্থ ডেনিস জাকারিয়া। ফটো ক্রেডিট: ইএসপিএন/ রয়টার্স।

লাল কার্ড দেখে ব্রিল এমবোলো মাঠ ছাড়তেই ম্যাচের মোড় ঘুরে যায়। স্ট্র্যাটেজি পাল্টে রক্ষণাত্মক হয়ে ওঠে ১০ জনের সুইজারল্যান্ড। কিন্তু আর্জেন্টিনার মতো দলের বিপক্ষে খেলতে নেমে রক্ষণের দেওয়াল কতক্ষণ পর্যন্ত দুর্ভেদ্য রাখা সম্ভব! তারপরেও একের পর এক দুর্দান্ত সেভ করে ম্যাচকে অতিরিক্ত সময় পর্যন্ত টেনে নিয়ে যান সুইস গোলরক্ষক গ্রেগর কোবেল।

অতিরিক্ত সময়ে খেলার মোড় ঘোরাল আর্জেন্টিনা

অতিরিক্ত সময়ে খেলা গড়ানোর শুরু থেকেই সুইজারল্যান্ডের রক্ষণে ঝড় তোলে আর্জেন্টিনা। কিন্তু বাহবা দিতে হয় সুইসদের ডিফেন্সের সেনানীদের। ১০ জনে খেলেই বিপক্ষের একের পর এক আক্রমণ ভোঁতা করে দেন সুইৎজারল্যান্ডের ডিফেন্ডারেরা। মাথা গরম করে অকারণে হলুদ কার্ড দেখেন আর্জেন্টিনার থিয়াগো আলমাডা এবং লাউতারো মার্টিনেজ।

অতিরিক্ত সময়ের ২২ মিনিটে আর্জেন্টিনার হয়ে জয়সূচক গোলটি করছেন জুলিয়ান আলভারেজ। এআই জেনারেটেড স্কেচ।

অতিরিক্ত সময়ের ২২ মিনিটে বক্সের বাইরে থেকে নেওয়া দুর্দান্ত একটি বাঁকানো শটে গোল করেন জুলিয়ান আলভারেজ। মেসির বাঁ পায়ে মারা শট সুইস গোলরক্ষক কোবেল আটকে দিলেও ফিরতি বলে চোখ ধাঁধানো শটটি মেরে বিপক্ষের গোলরক্ষককে ধরাশায়ী করে জয়সূচক গোলটি করেন আলভারেজ। অতিরিক্ত সময়ের অ্যাডেড টাইমে গোল করে আর্জেন্টিনার জয়ের ব্যবধান বাড়ান লাউতারো মার্টিনেজ।

নিজেদের অর্ধে বিপক্ষের পা থেকে বল কেড়ে নিয়ে দ্রুত দৌড় লাগান আলমাডা। সুইজারল্যান্ডের আরডন জাশারিকে চমৎকার পাশ কাটিয়ে জাল লক্ষ্য করে শট মারেন আলমাডা কিন্তু প্রতিরোধ করেন কোবেল। তবে বল ফিরতেই সুযোগ নষ্ট করেন নি মার্টিনেজ। তিন নম্বর গোল আর্জেন্টিনার।

গোল না করেও নায়ক মেসি

কোয়ার্টার ফাইনালে গোল পেলেন না কিংবদন্তি লিওনেল মেসি। কিন্তু তাতে কী! এ’দিন‌ও মেসিই ছিলেন আর্জেন্টিনার আক্রমণের ভরকেন্দ্র। প্রথম গোলটি হয় যে কর্নার থেকে, তা আসে মেসির পা থেকেই। পুরো ম্যাচেই তিনি সহযোদ্ধাদের সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন। সুইস রক্ষণকে ব্যস্ত রাখতে যা যা করার দরকার, সব করেছেন। বড় ম্যাচে নিজে গোল না করেও কীভাবে একজন খেলোয়াড় খেলার গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন, তার আরও একটা নজির ফুটবলের ইতিহাসে রাখলেন মেসি।

সুইজারল্যান্ডের সম্মানজনক বিদায়

স্কোরলাইন যাই বলুক, ম্যাচ একপেশে ছিল না। জান দিয়ে লড়ে খেলা অতিরিক্ত সময়ে টেনে নিয়ে গেছে সুইজারল্যান্ড। এমনকি দল ১০ জন হয়ে যাওয়ার পরেও হাল ছেড়ে দেন সুইস খেলোয়াড়েরা। জয়সূচক গোলটির জন্য ১২২ মিনিট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয়েছে মেসির দলকে। ভাগ্য সহায় থাকলে রবিবার ম্যাচ জিতেই মাঠ ছাড়তে পারত সুইজারল্যান্ড। এবারের বিশ্বকাপে সুইজারল্যান্ড প্রমাণ করেছে, ইউরোপের অন্যতম সংগঠিত দল তারাই।

ফুটবলের ইতিহাসে আরও একটি মহাযুদ্ধের প্রতীক্ষা

১৯৮৬ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে মুখোমুখি হয়েছিল আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। হ্যান্ডবল করে জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদোনা। যখন এক ব্রিটিশ সাংবাদিকের ক্যামেরায় ধরা পড়ে মারাদোনার করা জয়সূচক গোলটি ছিল ফুটবলের কানুনে স্রেফ হ্যান্ডবল, ততদিনে আর্জেন্টিনার ঘরে সাজানো সোনার বিশ্বকাপে ধুলো পড়তে শুরু করেছে। মারাদোনা বলেছিলেন, “ওটা ছিল ঈশ্বরের হাত!”

এবারের বিশ্বকাপে সেমিফাইনালে মুখোমুখি ইংল্যান্ড-আর্জেন্টিনা। বলা যায় ফুটবলের ইতিহাসে আবার একটা মহারণ হতে চলেছে। একদিকে মেসির অভিজ্ঞতা, অন্যদিকে হ্যারি কেনদের ইউরোপীয় ঘরানার পাওয়ার ফুটবল- কে জিতবে বলবে সময়। ইংল্যান্ড কি পারবে ৮৬-র বদলা নিতে?

Feature image credit: AI generated sketch by ChatGPT.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com