কলকাতায় তসলিমার আবার একটি বাসা হোক

কলকাতায় তসলিমার আবার একটি বাসা হোক


বিদ্রোহী কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভ্রাতুষ্পুত্র বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য তাঁকে রাজ্য থেকে তাড়িয়েই দিয়েছিলেন বলা যায়। ২০০৭ সালের ঘটনা। তসলিমা নাসরিনের অনেক উপন্যাসের একটি ‘দ্বিখণ্ডিত’। সেটি প্রকাশিত হতেই কলকাতার মুসলমান সমাজের গোঁড়া, ধর্মান্ধ ও মৌলবাদী অংশটি বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। সে বছরের ২১ নভেম্বর প্রতিবাদের নামে মহানগরীকে অচল করে দেয় তারা। উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে নিয়ন্ত্রণ না করে উল্টে লেখিকা তসলিমাকেই রাজ্যছাড়া করার সিদ্ধান্ত নেন পশ্চিমবঙ্গের প্রগতিশীল মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।

বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রশাসনের এক রাতের নির্দেশে কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গ ছাড়তে বাধ্য হন তসলিমা নাসরিন। এরপর থেকে পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে আর পা পড়ে নি বাংলাদেশের নির্বাসিত লেখিকার। বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত তসলিমা নাসরিন সুইডেনের নাগরিকত্ব লাভ করেছেন। তিনি সুইডিশ পাসপোর্ট বহন করেন এবং রেসিডেন্স পারমিটে ভারতে থাকেন। দিল্লিতে তসলিমার বাসা আছে। ভারতের প্রায় সব প্রদেশেই তসলিমা সফর করেছেন কিন্তু বাঙালি সাহিত্যিক হয়েও দুই বাংলার মাটিতেই তিনি নিষিদ্ধ! বাম জামানার অবসান হয়েছে ২০১১ সালেই। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ১৫ বছরের শাসনেও তসলিমার কলকাতা ভ্রমণের উপর রাজ্য প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা ছিল। এবার তা উঠতে চলেছে।

ইসলামিক মৌলবাদীদের মোকাবিলা করার প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই ভন্ড বামপন্থীদের উঁচু গলা নিচু হয়ে যায়। তখন মার্জারের মতো মিউ মিউ করেন তারা। কাজেই বামফ্রন্ট ক্ষমতায় থাকতে তসলিমার পশ্চিমবঙ্গে ফেরার প্রশ্ন‌ই ছিল না। আর সলিড ভোটব্যাঙ্ক দুধেল গাইয়েরা রুষ্ট হন, এমন কোনও পদক্ষেপ করা ছিল মমতার জন্য স্বপ্নের‌ও অতীত। তাই মমতার রাজত্বে কলকাতায় পা পড়ে নি তসলিমা নাসরিনের। তবে এ বছরের ৪ মের পর পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিস্থিতি পাল্টে গেছে। দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ভোটে জিতে রাজ্যে প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় এসেছে বিজেপি। ৯ মে ব্রিগেডে শপথ নিয়েছিল মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার। আগামী ১ আগস্ট কলকাতায় আসছেন তসলিমা।

রবীন্দ্রসদনে ‘সেক্যুলার মিশন’ নামে একটি সংগঠন আয়োজিত অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠ করবেন সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন। ‘সেক্যুলার মিশন’ মৌলবাদ বিরোধী ও মুক্ত চিন্তক একাধিক সংগঠনের যৌথ মঞ্চ বলে জানা গেছে। তাদের অনুষ্ঠানে সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিদের পাশাপাশি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীকেও আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। কবি-সাহিত্যিক তসলিমা নাসরিন ময়মনসিংহের কন্যা। ‘লজ্জা’ উপন্যাস লেখার পর থেকেই তিনি বাংলাদেশের মৌলবাদীদের চক্ষুশূল। তিনি নারীবাদী এবং তাঁর লেখায় ফুটে ওঠে বাংলাদেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিপন্নতার চিত্র। ওপার বাংলার ইসলামিক মৌলবাদীরা তাঁর কল্লা চায়। প্রাণ ভয়ে স্বদেশ থেকে নির্বাসিত তিনি।

তসলিমা নাসরিনের লেখা ইংরেজি, ফরাসি, জার্মানি, স্প্যানিশ, হিন্দি, তামিল মালায়ালম ও কন্নড় সহ পৃথিবীর সকল প্রধান প্রধান ভাষায় অনূদিত হয়েছে। পৃথিবীর দেশে দেশে ঘুরে বেড়ান তসলিমা। দুনিয়ার বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিনারে, সাহিত্যসভায় ভাষণ দেন। তবে সবথেকে বেশি ভালবাসেন বাংলায় থাকতে ও স্বজাতি বাঙালির মধ্যে বাস করতে। পশ্চিমবঙ্গকে বিদেশ বলে মনে করেন না বাংলাদেশী লেখিকা। দীর্ঘদিন কলকাতায় ছিলেন তিনি। ঢাকার থেকেও রবীন্দ্রনাথ-সত্যজিৎ-ঋত্বিকের শহরে বেশি স্বচ্ছন্দ বোধ করেন তসলিমা নাসরিন।

একজন বাঙালি সাহিত্যিক বাঙালি সমাজের মধ্যে থাকবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ধমকিতে প্রিয় শহর কলকাতার পাট তুলতে বাধ্য হয়েছিলেন ‘দ্বিখণ্ডিত’-র লেখিকা। আমরা সবাই চাই কলকাতায় আবার তসলিমার একটা স্থায়ী আস্তানা হোক, বাসা হোক। কলকাতায় ভবিষ্যতে তসলিমা নাসরিনের স্বাধীন জীবনযাপনকে কেউ বাধাগ্রস্ত করতে এলে পুলিশ ধরে তাদের স্যাঁটা ভেঙে দেবে- মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনকে এই গ্যারান্টি কিন্তু দিতে হবে।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com