স্পোর্টস ডেস্ক: ১৯৮৬-র বদলা তো নেওয়া হলই না, উল্টে আবার ইংল্যান্ডের ভোঁতা মুখ থোতা করে ছাড়ল আর্জেন্টিনা। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে খেলতে নামলেই যেমন ভারতের ক্রিকেট কিম্বা হকি টিমের রক্ত টগবগ করে ফুটতে থাকে, তেমনি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামলেই আর্জেন্টিনার ফুটবলারদের রক্ত তেতে ওঠে। প্রত্যেকবার ফকল্যান্ড যুদ্ধে হারের বদলা না নিয়ে মাঠ ছাড়েন না আর্জেন্টিনার একাদশ ফুটবল যোদ্ধা। বুধবার রাতে আটলান্টার মাটিতে মেসির দল আবার প্রমাণ করল, ফুটবল আসলে শেষ ১৫ মিনিটের খেলা!
৮৫ মিনিট পর্যন্ত পিছিয়ে থেকেও শেষ বাঁশি বাজার পর জিতেই মাঠ ছাড়ল আর্জেন্টিনা। ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছে গেল গতবারের চ্যাম্পিয়নরা। মরণপণ লড়াই হবে, জানাই ছিল সবার। ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলই ছিল অত্যন্ত সতর্ক। ইংল্যান্ডের পরিকল্পনা ছিল লিওনেল মেসিকে যতটা সম্ভব বোতলবন্দি করে রাখা। দীর্ঘ সময় পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা সফলও হল। মাঝমাঠে চাপ সৃষ্টি করে এবং রক্ষণকে ঘন করে আর্জেন্টিনার আক্রমণভাগকে আটকে রাখে থমাস টুখেলের দল। প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা বলের দখল বেশি রাখলেও গোলের সুযোগ বলতে যা বোঝায়, তেমন একটাও তৈরি করতে ব্যর্থ হয় তারা।
দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে বল গড়াতে শুরু করতেই ছন্দে ফেরার চেষ্টা শুরু করল আর্জেন্টিনা। ভীতি ও জড়তা কাটিয়ে উঠে আক্রমণে উঠতে শুরু করল মেসির দল। দ্রুত গতিতে খেলে অভ্যস্ত ইউরোপের দলগুলি বরাবরই প্রতিআক্রমণ থেকে সুযোগের সদ্ব্যবহারে দক্ষ। সেমিফাইনালের মরণ-বাঁচন ম্যাচে ইংল্যান্ডও সেই সুযোগ কাজে লাগাল। খেলার ৫৫ মিনিটের মাথায় ডান প্রান্ত দিয়ে উঠে এসে রিস জেমসের ক্রসে গোল করে দলকে এগিয়ে দিলেন ইংল্যান্ডের অ্যান্টনি জর্ডন।

আর্জেন্টিনার বক্সে দাঁড়িয়ে ধোঁকা খেয়েছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোমেরো। তিনি আঁচ করতে পারেন নি তাঁর পেছনেই শিকারের অপেক্ষায় ওত পেতে আছেন জর্ডন। আহত বাঘের ক্রোধ সর্বদাই ভয়ঙ্কর। গোল খেতেই বদলা নিতে মরীয়া হয়ে উঠল আর্জেন্টিনা। গোল শোধ না করলেই সম্মানের লড়াই থেকে বিদায় নিশ্চিত। এই পরিস্থিতিতে অল-আউটে যাওয়া ছাড়া আর কোনও রাস্তাও খোলা ছিল না স্কালোনির সামনে।
ঠিক এই সময়েই অভিজ্ঞতার ছাপ রাখলেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক লিওনেল মেসি। বাঘকে কতক্ষণ খাঁচায় পুড়ে রাখবে ইংল্যান্ড! টমাস টুখেলের দল ব্যবধান ধরে রাখতে অতিরিক্ত রক্ষণাত্মক হতেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করলেন মেসি।ডি পল, লাউতারোরা খেলতে নামার পর মাঝমাঠ ছেড়ে ডান প্রান্তে সরে এসে তিনি ইংল্যান্ডের রক্ষণে ফাটল ধরাতে শুরু করলেন। ৮৬ মিনিটে মেসির পাস ধরে বক্সের বাইরে থেকে দূরপাল্লার শটে গোল করে সমতা ফেরান এনজো ফের্নান্দেজ়।

গোল শোধের পরেই যেন আর্জেন্টিনার ফুটবলারেরা প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, নির্ধারিত ৯০ মিনিটেই জয় ছিনিয়ে নিতে হবে। অ্যাডেড টাইম মিলিয়ে শেষ দশ মিনিট আক্রমণের পর আক্রমণে খেই হারিয়ে ফেলল ইংল্যান্ড। অ্যাডেড টাইমেই মেসির ক্রসে দুর্দান্ত হেড মেরে গোল করলেন লাউতারো মার্তিনেজ। ব্যস! এই গোলের সাথে সাথেই ইংরেজদের স্বপ্ন ভেঙে খানখান। শেষ সাত মিনিটের আর্জেন্টেনিয়ান ঝড়ে কুকুরে গিয়ে অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হল টমাস টুখেলের দল।
এই ম্যাচ আবারও প্রমাণ করল, ফুটবলের মহারণে আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় শক্তি তাদের মানসিক দৃঢ়তা। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করার মানসিকতা, চাপের মধ্যেও শান্ত থাকা এবং অভিজ্ঞ ফুটবলারদের সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতাই বিপক্ষের সঙ্গে আর্জেন্টিনার পার্থক্য গড়ে দেয়।

বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনার এই জয় শুধু একটি ম্যাচ জেতা নয়; এটি আবারও দেখিয়ে দিল কেন বড় টুর্নামেন্টে আলবিসেলেস্তেরা শেষ বাঁশি না বাজা পর্যন্ত কখনও হার মানে না। আর সেই বিশ্বাসের ভরকেন্দ্রে যিনি রয়েছেন, তিনি ৩৯ বছরের বুড়ো লিওনেল মেসি। মেসি হয়তো আর আগের মতো দৌড়ান না, কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একটি পাস, একটি ক্রস কিংবা একটি সিদ্ধান্ত দিয়েই পুরো ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
আর্জেন্টিনার সামনে এখন ইতিহাস গড়ার হাতছানি। ফাইনালে তাদের সামনে ইউরোপীয় ফুটবলের সবথেকে শক্তিশালী দল স্পেন। ১৯৯০-এ যা পারেন নি ফুটবলের রাজপুত্র দিয়েগো মারাদোনা, ২০২৬-এ কি তা পারবেন ফুটবলের ঈশ্বর লিওনেল মেসি?
This feature sketch was created using AI.