রাষ্ট্রের গোপনীয়তা ভঙ্গ করে রাষ্ট্রদ্রোহিতার তুল্য অপরাধ করেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতাকে গ্রেফতার করা উচিত। লিখলেন উত্তম দেব-
ভারতবর্ষের কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারগুলির মন্ত্রীদের দায়িত্বভার গ্রহণ করার সময় দেশের সংবিধানের প্রতি আনুগত্য এবং দেশের সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা রক্ষার শপথ নিতে হয়। পাশাপাশি তাঁরা গোপনীয়তা রক্ষারও শপথগ্রহণ করেন। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় মন্ত্রগুপ্তি। গোপনীয়তা রক্ষা বা মন্ত্রগুপ্তির শপথটি কেমন হয়, দেখে নেওয়া যাক- “আমি… ঈশ্বরের নামে (অথবা সত্যনিষ্ঠার সহিত) প্রতিজ্ঞা করিতেছি যে, …মন্ত্রী হিসাবে আমার বিবেচনার জন্য আনিত বা আমার জ্ঞাত হওয়া কোনও বিষয়, আমার কর্তব্য যথাযথভাবে পালনের প্রয়োজন ব্যতিরেকে, আমি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কোনও ব্যক্তি বা ব্যক্তিবর্গের নিকট প্রকাশ করিব না।”
পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার কলকাতার ধর্মতলার কাছে ওয়াই চ্যানেলে ভাষণ দেওয়ার সময় এই ‘মন্ত্রগুপ্তি’ ভঙ্গ করেছেন। তিনবারের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ১৯৮৪ সালে মাত্র ২৮ বছর বয়সে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি দেশের কেন্দ্রীয় সরকারে রেলমন্ত্রীর দায়িত্বও সামলেছেন। এমন একজন দেশের প্রবীণ, অভিজ্ঞ, পোড়খাওয়া ও জনপ্রিয় রাজনীতিক প্রকাশ্যে মন্ত্রগুপ্তি ভঙ্গ করতে পারেন, তা কল্পনারও বাইরে!
মঙ্গলবার দুপুরে ওয়াই চ্যানেলে তৃণমূল কংগ্রেসের ধর্না কর্মসূচি চলছিল রাজ্যের নবগঠিত বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগে। বিজেপি সরকারের বিরুদ্ধে যে কোনও ধরণের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি নেওয়া তৃণমূল ও মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক অধিকার। এমন একটি রাজনৈতিক কর্মসূচিতে মমতা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সমালোচনা করতে গিয়ে মমতা কীভাবে বৈদেশিক শক্তির কাছে নিজের দেশকে কূটনৈতিকভাবে অপদস্থ করার মতো অস্ত্র তুলে দিতে পারলেন?
মমতার বক্তব্যের সেই অংশের ভিডিও ইতিমধ্যেই ভাইরাল এবং বাংলাদেশের প্রত্যেকটি সংবাদমাধ্যম তা ফলাও করে প্রচারে ব্যস্ত। মমতা কী বলেছেন? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, “বাংলাদেশ থেকে একটা বড় খুনিকে এসটিএফ অ্যারেস্ট করেছিল জেনে রাখুন। যা নিয়ে বাংলাদেশে অনেক রেভোলিউশন হয়েছিল। অন্য দেশের কথা আমি বলছি না। আমার বলার অধিকার নেই। কিন্তু আমি যেটা বলছি, পরেরটা। তারপরে তারা মেঘালয় দিয়ে বাংলায় চলে আসে। বাংলায় যখন চলে আসে, তখন আমাদের এসটিএফ তাকে ধরে। এইটা তাদের ক্রেডিট।”
মমতা আরও বলেন, “তারপরে হোম মিনিস্টার নিজে আমাকে ফোন করে বলেছে, কই এতদিন তো আমি বলি নি! মুখ খুলি নি! আজকে অত্যাচারের শেষ সীমায় গেছেন বলে। কারণ, এটা। আমি এখনই নামটা বলছি না ভদ্রতা করে। বাংলাদেশের লোক উত্তাল হয়ে যাবে। আমি সেটা চাই না। আমি দেশকে ভালবাসি।” এখানেই না থেমে মমতা আরও যা বললেন- “কী বললেন? আপ থোরা আপকো বেঙ্গল পুলিশ কো বোল দো, ইয়ে বাত বাহার মে নেহি কহনে কে লিয়ে। ইয়ে দেশ কে লিয়ে হ্যায়। কাকে দিয়ে খুন করিয়ে ছিলেন? কার কার নাম বেরিয়েছিল? আজ গভর্নমেন্ট চেঞ্জ হয়েছে। মনে রাখবেন, আমি কিন্তু সবটাই জানি। আমার হৃদয়টাই একটা কথা ভান্ডার। একটা তথ্য ভান্ডার। একটা সত্য ভান্ডার…।”
ভারতের যে কোনও সুনাগরিকের পিত্তি জ্বলে যাবে মমতার এই বক্তব্য শোনার পর। যাচ্ছেও। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মঙ্গলবার যতটা নীচে নামলেন, দলমত নির্বিশেষে ভারতের কোনও প্রতিষ্ঠিত রাজনীতিক অতীতে এতটা নীচে নামেন নি। ভবিষ্যতেও কেউ নামবেন বলে মনে হয় না। এমনকি মিমের প্রধান আসাদউদ্দিন ওয়েইসিও মমতার তুলনায় অনেক বড় দেশপ্রেমিক। ওয়েইসি কখনও বিদেশিদের সামনে দেশকে নীচে করেন নি। আন্তর্জাতিক সম্মেলনে গিয়ে এমন কথা ওয়েইসি কখনও বলেন নি, যার ফলে দেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়।
ওসমান হাদি নামে এক মৌলবাদী জঙ্গি গত ডিসেম্বরে ঢাকার রাস্তায় দিনেদুপুরে খুন হয়। মুখে অনর্গল অশ্রাব্য গালিগালাজের কারণে এই হাদি জীবদ্দশায় বাংলাদেশে ‘শাউয়া হাদি’ নামে পরিচিত হয়েছিল। মরার পরেও তার এই নাম ঘোচে নি। নারীর জননাঙ্গ তুলে স্লোগান দেওয়া হাদির মৃত্যুর জন্য নাকি ভারত সরকার দায়ী। এমনই অভিযোগ বাংলাদেশের জামাত শিবিরের। ক্ষমতা হারানোর জ্বালায় মমতা আজকে বাংলাদেশের জঙ্গি মৌলবাদী শিবিরের হাতে জ্বালানি তুলে দিলেন। পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী আজকে বাংলাদেশের মৌলবাদীদের সুরে সুর মিলিয়ে হাদির খুনের জন্য ভারত সরকারের দিকে আঙুল তুলছেন! মমতার এই বক্তব্য বাংলাদেশ সরকারের সামনে ভারতকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলেছে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে যারা চরম ভারতবিরোধী, তাদের অক্সিজেন জোগানোর কাজটা কলকাতায় বসেই সেরে ফেললেন মমতা।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্তরে বাংলাদেশের মৌলবাদী শক্তি ও জঙ্গিদের প্রতি অঢেল প্রেম থাকতেই পারে। তাঁর ১৫ বছরের শাসনামলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুই হত্যাকারী সহ বাংলাদেশের একাধিক জঙ্গি কলকাতা থেকে ধরা পড়েছে। কিন্তু ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রদেশ পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তিনি যে গোপনীয়তা রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, তা তিনি ভঙ্গ করতে পারেন না। রাষ্ট্রের শাসন ও আইনশৃঙ্খলা পরিচালনার ব্যাপারে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে অমিত শাহ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যা শলাপরামর্শ করেছিলেন, ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর মমতা তা প্রকাশ করে দিতে পারেন না। মন্ত্রগুপ্তির ভঙ্গ রাষ্ট্রদ্রোহিতার তুল্য অপরাধ। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অবিলম্বে গ্রেফতার করা হোক।
Feature image is representational and AI generated.
