এই প্রথমবার একুশে জুলাই মমতা রাজনৈতিকভাবে সর্বহারা!

এই প্রথমবার একুশে জুলাই মমতা রাজনৈতিকভাবে সর্বহারা!


এমন বিষণ্ণ, নিঃসঙ্গ, রোদনভরা একুশে জুলাই মমতার রাজনৈতিক জীবনে আর আসে নি… লিখলেন উত্তম দেব

তৃণমূল কংগ্রেসের সবথেকে বড় বাৎসরিক মেগা ইভেন্টের নাম ধর্মতলায় একুশে জুলাইয়ের শহিদ তর্পণ। পোশাকি নাম যদিও শহিদ তর্পণ, মমতা ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ থেকে তা পরিণত হয়েছিল বিরাট মোচ্ছবে। গত ১৫ বছরে প্রত্যেকবার আগের বছরের একুশে জুলাইয়ের তুলনায় পরের বছরের একুশে জুলাইয়ের জেল্লা পাল্লা দিয়ে বেড়েছে।‌ ২০২৬-এও একুশে জুলাই দিনটা প্রকৃতির নিয়ম মেনে অনিবার্যভাবেই আসবে। কিন্তু ধর্মতলায় তৃণমূলের সভা হবে কিনা, তা এখনও নিশ্চিত নয়।

২০১০-এর ২১ জুলাইয়েও তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় ছিল না কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী ছিলেন। তার চেয়েও বড় কথা, ততদিনে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল পরের বছরে বাংলার রাজনীতিতে বিরাট পরিবর্তন আসন্ন। ২০০৯-এর লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল ও কংগ্রেস জোটের কাছে পর্যুদস্ত হয়েছিল শাসক বামফ্রন্ট। নাকে ক্ষমতার গন্ধ পেতে শুরু করেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সে’বার খুব জাঁক করে একুশে জুলাইয়ের অনুষ্ঠান হয়েছিল ধর্মতলায়। ২০১০-এর একুশে জুলাইয়ের আগে পুরভোটে জিতে কলকাতার ছোট লালবাড়ির দখল নেয় তৃণমূল কংগ্রেস। অর্থাৎ মমতার আত্মবিশ্বাস তখন তুঙ্গে। তৃণমূলের কর্মীরা সবাই চার্জড। ২০১১-র একুশে জুলাইয়ের আড়াই মাস আগেই বাংলায় ইতিহাস ঘটিয়ে তৃণমূল ক্ষমতায়, মমতা মুখ্যমন্ত্রী। সে’বার একুশে জুলাই বিজয়োৎসব পালন করেছিল তৃণমূল। সভা ধর্মতলায় নয়, হয়েছিল ব্রিগেডের মাঠে।

শ্রাবণের ঝড়-বৃষ্টি-রোদ যাই থাকুক একুশে জুলাই ধর্মতলায় মমতার সভায় হাজির না থাকলে সেলিব্রিটিদের গঞ্জনা স‌ইতে হত। ফাইল ফটো।

২০১১ থেকে ২০২৪- ১৪টি একুশে জুলাই ধর্মতলার (একবার ব্রিগেডে) মঞ্চে মমতা উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে। দিনে দিনে একুশে জুলাই রাজনৈতিক দলের সভা থেকে সরকারি অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল। শ্রাবণের ঝড়-বৃষ্টি-রোদ যাই থাকুক একুশে জুলাই ধর্মতলায় তৃণমূলের মঞ্চ আলো করে থাকতেন টলিউডের তাবড়  অভিনেতা-অভিনেত্রী থেকে সিরিয়ালের  চুনোপুঁটি সবাই। বুদ্ধিজীবী-বিদ্বজ্জন, কবি-সাহিত্যিক-সাংবাদিক এবং নর্তকী-গায়ক, একুশে জুলাইয়ের হাজিরা খাতায় যাঁদের নাম থাকত না, তাঁদের কমবেশি দুর্ভোগ পোহাতে হত। কারণ, একুশে জুলাই ধর্মতলায় গরহাজির থাকলে নেত্রীর বিরাগভাজন হতে হবে, এমন অলিখিত বিধান তৃণমূলের জামানায় চালু হয়েছিল।

২০২৬-এর একুশে জুলাই যখন আসবে, তখন আক্ষরিক অর্থেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রাজনৈতিক সর্বহারা! এমন বিষণ্ণ, নিঃসঙ্গ, রোদনভরা একুশে জুলাই ১৯৯৩ সালের একুশে জুলাইয়ের পর থেকে মমতার রাজনৈতিক জীবনে আর আসে নি। ২০১১-র আগেও মমতা মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন না, তৃণমূল‌ও রাজ্যে ক্ষমতায় ছিল না। কিন্তু মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নামটাই শাসক বামফ্রন্টের প্রতিস্পর্ধী শক্তি ছিল। সততার প্রতীক মমতা। লড়াকু নেত্রী মমতা। অগ্নিকন্যা মমতা। অপ্রতিরোধ্য মমতা। ২০২৬-এর একুশে জুলাই আসার আগেই মমতার গা থেকে সব বিশেষণ, সব ভূষণ খসে পড়েছে।

যে ভবানীপুরকে মমতার পাড়া বলা চলে, যে ভবানীপুরকে মমতা নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন, সেই ভবানীপুরে মমতা এমন একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বির কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছেন, যাঁর নাম শুনলেই মমতার শরীরে চিড়বিড়ানি ধরে। ২০২৬-এর একুশে জুলাই দুপুরে যদি শেষ পর্যন্ত মমতা ধর্মতলায় মঞ্চে ওঠার সুযোগ পান, মমতা উঠবেন স্রেফ প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল সুপ্রিমো পরিচয়ে। এই প্রথম মমতা না সাংসদ, না বিধায়ক। ভাগ্যদেবী মমতার ললাটে এই বছর এমন‌ই দুর্ভাগ্য লিখে রেখেছেন যে ২১ জুলাই মমতা ধর্মতলায় সভা করতে পারবেন কি পারবেন না, তা নির্ভর করছে তাঁর চরম রাজনৈতিক শত্রুর মর্জির উপর।

ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দাবি, আসল তৃণমূলের কপিরাইট তাদের হাতেই। ধর্মতলায় একুশে জুলাই সভা করতে চেয়ে ইতিমধ্যেই পুলিশের দ্বারস্থ ঋতপন্থী তৃণমূল। সংগৃহীত ফটো।

ইতিমধ্যেই ধর্মতলায় ২১ জুলাই সভা করতে চেয়ে পুলিশের কাছে দরখাস্ত পেশ করে বসেছে ঋতপন্থী তৃণমূল। কালীঘাট তৃণমূল‌ও সভা করার অনুমতি চেয়ে পুলিশকে চিঠি পাঠিয়েছে। মমতা বলেছেন, পাঁচজনকে নিয়ে হলেও একুশে জুলাই তিনি ধর্মতলায় সভা করবেন। আক্ষরিক অর্থেই পরিষদীয় রাজনীতিতে মমতার তৃণমূল এখন পাঁচ-সাতজনের দল। বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূলের ৮০ জন বিধায়ক জিতেছেন। কিন্তু মমতার সঙ্গে পাঁচ-সাতজনের বেশি বিধায়ক নেই। লোকসভায় তৃণমূলের প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত সাংসদের সংখ্যা ২৮। কিন্তু মমতার সাথে আছেন মাত্র ৮ জন। কলকাতা পুরসভা তৃণমূলের হাতছাড়া। প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিম‌‌‌ কালীঘাট শিবির ত্যাগ করার পর মমতা কর্তৃক বহিষ্কৃত। দলের প্রায় সব কাউন্সিলর নেত্রীকে ছেড়ে ভাগলবা। যাঁরা পালাতে পারেন নি, তাঁদের অনেকেই জেলে। কাউকে কাউকে ডিম থেরাপি দিয়েছেন জনগণ। ৪ মের আগে মমতা কি স্বপ্নেও ভেবেছিলেন এমন দুর্দিন তাঁকে চোখে দেখতে হবে!

আর নম নম করে নয়, ছাব্বিশে জোরেশোরে একুশে জুলাই পালন করার উদ্যোগ নিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস। সংগৃহীত ফটো।

১৯৯৩ সালের ২১ জুলাই ছিল প্রদেশ যুব কংগ্রেসের ডাকে মহাকরণ অভিযান। তৃণমূল কংগ্রেসের তখন নামগন্ধ ছিল না। মমতা ছিলেন প্রদেশ যুব কংগ্রেসের সভানেত্রী। রাজনৈতিকভাবে একুশে জুলাই উদযাপনের হকদার প্রদেশ কংগ্রেস ও প্রদেশ যুব কংগ্রেস। কিন্তু মমতার ১৫ বছরের রাজত্বে কংগ্রেস বড় করে একুশে জুলাই পালনের অনুমতি পায় নি। তাদের নম নম করে একুশে জুলাইয়ের শহিদ তর্পণ সারতে হত।‌ এ বছর কংগ্রেস তেড়েফুঁড়ে একুশে জুলাই পালন করতে নেমেছে। শহিদ মিনারে সভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রদেশ কংগ্রেস।

এবারের একুশে জুলাই কালীঘাট তৃণমূল ও ঋতপন্থী তৃণমূল মুখোমুখি। কংগ্রেস‌ও ময়দানে। সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারদের শিবির কী করবে এখনও জানা যায় নি। নবান্নে বসে হাসছেন যিনি, তাঁর নাম শুভেন্দু অধিকারী। সময়ের ঝড় কাউকে সিংহাসনে বসায়, কাউকে ধুলোয় আছড়ে ফেলে।

Feature image is representational and AI generated.

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।



Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *