ব্রিটিশরা যাকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলত, সেই ধারার সূচনাটা করেছিলেন এক মায়ের পেটের তিন ভাই। পুণের চিঞ্চওয়াড়ে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে এঁদের জন্ম। ব্রিটিশদের চোখে চাপেকর ভ্রাতৃত্রয় সন্ত্রাসবাদী হলেও আমরা তাঁদের বিপ্লবী বলব। লিখলেন উত্তম দেব—
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাস তো শুধু ঘরে বসে চরখা কাটা আর বিলিতি পণ্যের দোকানের দরজায় শুয়ে পড়ে পিকেটিংয়ের মধ্যেই শেষ হয় নি। ভারতমায়ের অনেক সন্তানই মাকে ইংরেজের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করার জন্য হাতে অস্ত্র ধরেছিলেন। তাঁদের আমরা বলি বিপ্লবী। কংগ্রেস যখন দিনের পর দিন ক্ষমতায়, তখন এই বিপ্লবীদের ইতিহাস ও আত্মত্যাগকে আড়ালে রাখার চেষ্টা করেছিল। ভারতের জাতীয়তাবাদী সশস্ত্র বিপ্লবী আন্দোলনের একটা দীর্ঘ ইতিহাস আছে। সেই ইতিহাসের সূচনা হয়েছিল একই মায়ের পেটের তিন ভাইয়ের আত্মবলিদানের মাধ্যমে। মহারাষ্ট্রের পুণের চাপেকর ভাইদের কথা হয়তো আপনারা ভুলে গেছেন এবং অনেকে হয়তো তাঁদের নামই শোনেন নি।
দামোদর হরি চাপেকর, বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর এবং বাসুদেব হরি চাপেকর— এই তিনভাই ফাঁসির মঞ্চে জীবন দিয়েছিলেন ক্ষুদিরাম বসুর ফাঁসির ৯-১০ বছর আগে। ব্রিটিশরা যাকে সন্ত্রাসবাদী আন্দোলন বলত, সেই ধারার সূচনাটা এই তিনভাই করেছিলেন বললে ভুল হয় না। পুণের চিঞ্চওয়াড়ে এক ব্রাহ্মণ পরিবারে এঁদের জন্ম। ব্রিটিশদের চোখে চাপেকর ভ্রাতৃত্রয় সন্ত্রাসবাদী হলেও আমরা তাঁদের সশস্ত্র বিপ্লবী বলব। সাহেব শাসকদের লক্ষ্য করে প্রথম গুলিটা করেছিলেন মধ্যমভ্রাতা বালকৃষ্ণ। কয়েক মিনিটের ব্যবধানে দ্বিতীয় গুলিটি করেছিলেন বড়ভাই দামোদর। পরাধীন হলেও তারা যে ক্লীব নয়, এটা প্রমাণ করার জন্য সে’দিন সাহেবদের গুপ্তহত্যা করা ছাড়া চাপেকর ভাইদের মতো সংবেদনশীল ভারতীয়দের সামনে দ্বিতীয় কোনও রাস্তা খোলা ছিল না। যদিও গান্ধী, নেহেরু, প্যাটেল— এঁরা কখনওই এই সশস্ত্র বিপ্লবীদের শ্রদ্ধার চোখে দেখেন নি।

দামোদর হরি চাপেকর ও বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর পুণের প্রধান প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ড ও তাঁর সহকারী চার্লস আয়ার্স্টকে গুলি করে মেরেছিলেন ১৮৯৭ সালের ২২ জুন। এই হত্যাকান্ডের প্রেক্ষাপট কেন, কীভাবে তৈরি হয়েছিল, এখন সেই গল্পেই আসব। সে’বার গরমে মহারাষ্ট্রের বিস্তীণ এলকায় ‘বিউবোনিক প্লেগ’ ছড়িয়ে পড়েছিল। পুণে শহর ও তার আশেপাশে মহামারি দেখা দিল। মহামারি দমন করতে ‘এপিডেমিক ডিজিজেস অ্যাক্ট’ বা মহামারি রোগ আইন প্রয়োগ করল ব্রিটিশ প্রশাসন। পরাধীন দেশে প্রশাসনের সঙ্গে জনগণের বন্ধুত্বমূলক সম্পর্ক ছিল না। বহিরাগত শ্বেতাঙ্গ শাসকেরা ব্ল্যাক নেটিভদের মানুষ বলেই মনে করত না। প্লেগ নিয়ন্ত্রণে আনতে প্লেগ কমিশন গঠন করল ব্রিটিশ সরকার। যার মাথায় বসলেন ওয়াল্টার র্যান্ড। ভারতীয়দের প্রতি দয়া-মায়া, সম্ভ্রম কোনওটাই ছিল না র্যান্ড সাহেবের।
প্লেগ দমন করতে বিরাট সৈন্যদলকে নামিয়ে দিলেন প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ড। ৯০০ গোরা অফিসারকে দিলেন সৈন্যদের পরিচালনার ভার। গোরা অফিসারদের নির্দেশে বাড়ি বাড়ি ঢুকে অত্যাচার শুরু করে দিল সিপাইরা। ইঁদুর খোঁজার নামে মানুষের ঘরদোর তছনছ করে দিতে থাকল প্রশাসনের লোকেরা। জিনিসপত্র রাস্তায় ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্তুপ করে জ্বালিয়ে দিল সৈন্যরা। যে ঘরে বিগ্রহ বিরাজ করে, সেই ঘরে প্রবেশের ব্যাপারে হিন্দু গৃহস্থেরা বরাবরই কঠোর। চামড়ার বুটজুতো পায়ে বিধর্মী গোরা অফিসারেরা ঠাকুরঘরে ঢুকে আসন থেকে আরাধ্য দেবদেবীদের মূর্তিগুলিকে তুলে ছুড়ে ফেলে দিত বাইরে। সিংহাসন উল্টে ফেলত লাথি মেরে।
প্লেগ আক্রান্তদের সঙ্গে পশুর মতো ব্যবহার করা হত। প্লেগ হাসপাতালগুলির পরিবেশ ছিল শুয়োরের খোয়াড়ের চেয়েও নিকৃষ্ট। রোগীদের জোর করে তুলে নিয়ে গিয়ে হাসপাতালে এনে ফেলত সৈন্যরা। পাড়ার পর পাড়া বাসিন্দারের বাড়িঘর থেকে তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রে আটকে রাখতে লাগল পুনের প্রশাসন। কোয়ারেন্টাইন কেন্দ্রগুলির পরিস্থিতি ছিল জেলখানার থেকেও খারাপ। ঘরের মা-বোনেদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটত অহরহ। সৈন্যরা পুরষদের তো পেটাতোই তাদের বউ-মেয়ের গায়েও হাত তুলত। মানুষ সব কষ্ট সইতে পারে কিন্তু ঘরের নারীদের অপমান ও আরাধ্য দেবতার পবিত্রতা নষ্ট হতে দেখলে ক্রোধে তাদের অন্তরাত্মা জ্বলে ওঠে। প্লেগ দমনের নামে পুনেতে দুটো পাপই করেছিল ব্রিটিশরা। প্লেগে নয়, প্লেগ দমনের নামে গোরাদের অত্যাচারে গ্রামের পর গ্রাম উজাড় হয়ে গেল মারাঠাদের মুলুকে।

মানুষের দুঃখ-দুর্দশা দেখে চুপ করে থাকলেন না বালগঙ্গাধর তিলক। তাঁর ‘কেশরী’ পত্রিকায় এই অত্যাচারের বিরুদ্ধে কলম ধরলেন তিলক। তিনি বললেন, “প্লেগ তবু সহ্য করা যায়। কিন্তু প্লেগ কমিশনের সাহেবদের অত্যাচার নয়।” কেশরীতে প্রকাশিত তিলকের আগুন ঝরানো প্রতিবেদন পড়তেন চাপেকর ভাইয়েরা। তাঁরা ছিলেন মারাঠা চিতপাবন ব্রাহ্মণ। ব্রহ্মতেজে জ্বলে উঠে শপথ নিলেন চাপেকর ভাইয়েরা— পাপের শাস্তি দিতেই হবে প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ডকে! বড়ভাই দামোদর হরি চাপেকরের বয়স তখন আটাশ। মেজ বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর দাদার চেয়ে চারবছরের ছোট। ছোটভাই বাসুদেব হরি চাপেকরের বয়স মাত্র সতেরো।
চাপেকর ভাইয়েরা ভগবানের কীর্তন গাইতেন। এটাই ছিল তাঁদের কৌলিক বৃত্তি। কিন্তু দামোদর ধীরে ধীরে দেশপ্রেমের মন্ত্রেও দীক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন, তোষামোদ করে ব্রিটিশের কাছ থেকে কিছু পাওয়া যাবে না। এদের উৎখাত করা উচিত। আর তার জন্য দরকার সশস্ত্র আন্দোলন। দামোদর চাপেকর কোনও বড় বিপ্লবী দলের সদস্য ছিলেন না। তিনি তাঁর দুই ভাইকে দেশের কাজে উদ্বুদ্ধ করেন এবং আশেপাশের আরও কয়েকজন দেশব্রতী তরুণকে নিয়ে নিজেই ছোট্ট একটি ক্লাব গঠন করেন। ক্লাবের সবাই মিলে প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ডকে হত্যার পরিকল্পনা রচনা করলেন।

মহারানি ভিক্টোরিয়ার রাজত্বের ডায়মন্ড জুবিলি উপলক্ষে পুণের গভর্নমেন্ট হাউসে সাড়ম্বরে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল ১৮৯৭ সালের ২২ জুন। রাতে অনুষ্ঠান শেষে র্যান্ড সাহেব যখন নির্জন গণেশখিন্ড রোড ধরে ঘোড়ার গাড়িতে চেপে ঘরে ফিরবেন, তখন তাঁকে বধ করা হবে বলে ঠিক করলেন চাপেকর ভাইয়েরা। রাতের অন্ধকারে রাস্তার পাশে ঝোঁপের আড়ালে লুকিয়ে থাকলেন দামোদর ও বালকৃষ্ণ। দূরে একটি সরকারি ঘোড়ার গাড়ি আসতে দেখেই প্রস্তুত হয়ে যান তাঁরা। গাড়িটি সামনে আসতেই ঝাঁপিয়ে গাড়ির উপর উঠে পড়েন বালকৃষ্ণ এবং সিটে বসে থাকা সাহেবকে খুব কাছ থেকে পর পর গুলি করেন। গুলি করার পরেই বালকৃষ্ণ বুঝে যান যাঁকে মেরেছেন, তিনি প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ড নন, তাঁর সহকারি লেফটেন্যান্ট চার্লস আয়ার্স্ট।
কিছুক্ষণ পর আরও একটি সরকারি ঘোড়ার গাড়ি আসতে দেখা গেল। গাড়িটি সামনে আসতেই ঝাঁপিয়ে পড়লেন বড়ভাই দামোদর। দেখেই চিনলেন, যিনি বসে আছেন তিনি অন্য কেউ নন, প্লেগ কমিশনার ওয়াল্টার র্যান্ড। র্যান্ড সাহেবের বুক লক্ষ্য করে কয়েকবার গুলি চালিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করলেন দামোদর ও বালকৃষ্ণ। ১১ দিন হাসপাতালে ভুগে ৩ জুলাই মারা গেলেন ওয়াল্টার র্যান্ড। মহারানি ভিক্টোরিয়ার অধীনস্থ ভারতে এর আগে পরিকল্পনা করে ব্রিটিশ প্রশাসককে খুন করার ঘটনা আর ঘটে নি। এক রাতে একই ঘটনাস্থলে দুই আধিকারিক খুন! ভয়ে ও ক্রোধে কেঁপে উঠল ঔপনিবেশিক প্রশাসন। ঘাতকদের ধরতে ২০ হাজার টাকার পুরষ্কার ঘোষণা করল ব্রিটিশ পুলিশ। চাপেকর ভাইদের দলেই ছিল দ্রাবিড় ভাইয়েরা। তারা সব ঘটনা জানত। টাকার লোভে বিশ্বাসঘাতকতা করে পুলিশকে সব তথ্য জানিয়ে দিল রামচন্দ্র দ্রাবিড় ও গণেশ শঙ্কর দ্রাবিড়।
দামোদর হরি চাপেকরকে প্রথমে গ্রেফতার করল পুলিশ। ১৮৯৮ খ্রিস্টাব্দের ১৮ এপ্রিল ভোরে পুণের ইয়েরাওয়াডা জেলে বিপ্লবী দামোদর হরি চাপেকরের ফাঁসি হয়। অনেক দিন আত্মগোপনে ছিলেন বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর। শেষ পর্যন্ত ১৮৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে তিনিও গ্রেফতার হলেন। ছোটভাই বাসুদেব হরি চাপেকর ভয় পেয়ে হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকলেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন বিদেশী গোরাদের মারার আগে স্বদেশী বিশ্বাসঘাতকদের বিনাশ করতে হবে। রামচন্দ্র দ্রাবিড় ও গণেশ শঙ্কর দ্রাবিড়— এই দুই ভাইয়ের বিশ্বাসঘাতকতার ফলেই পুলিশ দামোদর ও বালকৃষ্ণের নাম জানত পারে এবং তাঁরা ধরা পড়েন। মহাদেব বিনায়ক রানাডে এবং খান্ডো বিষ্ণু সাথেকে সঙ্গে নিয়ে ১৮৯৯ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সকালে দ্রাবিড় ভাইদের হত্যা করলেন বাসুদেব। একই দিন সন্ধ্যায় পুলিশের হাবিলদার রামা পান্ডেকে হত্যার চেষ্টা করার সময় তিনজনই ধরা পড়ে গেলেন।

১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৮ মে ভোরে ইয়েরাওয়াডা জেলে বিপ্লবী বাসুদেব হরি চাপেকরের ফাঁসি হয়, তখন তাঁর বয়স মাত্র উনিশ। ঠিক চারদিন পর ১২ মে ভোরে একই জেলে ফাঁসির দড়ি গলায় পরেন বিপ্লবী বালকৃষ্ণ হরি চাপেকর। বিপ্লবীদের কাছে দেশ ছিল গর্ভধারিণীর তুল্য। দেশমায়ের চরণে এইভাবেই জীবন উৎসর্গ করলেন তিন সহোদর বিপ্লবী। বিপ্লবী মহাদেব বিনায়ক রানাডের আত্মত্যাগের কথাও উল্লেখ করা দরকার। মহাদেব বিনায়ক ছিলেন চাপেকর ভাইদের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা। যে রাতে পুণের গণেশখিন্ড রোড দাঁড়িয়ে দামোদর ও বালকৃষ্ণ র্যান্ড ও আয়ার্স্ট সাহেবকে বধ করলেন, সেই রাতে দুই ভাইয়ের সঙ্গে ঘটনাস্থলে ছিলেন রানাডেও। ১০ মে ভোরে ইয়েরাওয়াডা জেলেই মহাদেব বিনায়ক রানাডেকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মারে ব্রিটিশ সরকার।
দামোদর হরি চাপেকরের ফাঁসির খবর জানতে পেরে নিজেদের পারিবারিক মন্দিরে ছুটে যায় নাসিক জেলার ভাগুর গ্রামের ১৫ বছরের এক কিশোর। দেবী ভবানীর বিগ্রহের সামনে কিশোরটি শপথ নেয়, দেশমাতৃকাকে বিদেশিদের কবল থেকে উদ্ধার করতে সেও একদিন নিজের জীবন উৎসর্গ করবে। কিশোরটির নাম বিনায়ক দামোদর সাভারকার।
ফিচার গ্রাফিক্স প্রতিনিধিত্বমূলক এবং এআই জেনারেটেড।
