আদিবাসী সমাজকে উন্নয়নের গ্রহীতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। বিশ্ব আদিবাসী দিবসে লিখলেন অরুণ কুমার—
প্রতি বছর ৯ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব আদিবাসী দিবস বা আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, মর্যাদা, ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর তাদের ঐতিহ্যগত অধিকার এবং আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নকে সামনে আনাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য।
জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৯৪ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৯ আগস্টকে আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্বের ৯০টি দেশে প্রায় ৪৭.৬ কোটি আদিবাসী মানুষ বসবাস করেন। তাঁরা ৫ হাজারেরও বেশি স্বতন্ত্র জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করেন এবং বিশ্বের প্রায় ৭ হাজার ভাষার বিপুল অংশের সঙ্গে তাঁদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি জড়িত।
২০২৬ সালের আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য— “Honouring Indigenous Midwives: Safeguarding Life and Well-being”। অর্থাৎ, আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান জানানো এবং তাঁদের ঐতিহ্যগত জ্ঞান ও স্বাস্থ্যসেবার ভূমিকার স্বীকৃতি দেওয়া। জাতিসংঘ মনে করছে, এই ঐতিহ্যগত জ্ঞান শুধু মাতৃ ও শিশুর স্বাস্থ্য রক্ষায় নয়, আদিবাসী সমাজের সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরবঙ্গের আদিবাসী সমাজ
উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্স ও সমতলজুড়ে বহু আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসবাস। সাঁওতাল, ওঁরাও, মুন্ডা, রাভা, টোটো, লেপচা, ভূমিজ, মাহালি, খারিয়া-সহ বিভিন্ন জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁদের নিজস্ব ভাষা, নৃত্য, গান, লোকাচার ও উৎসব উত্তরবঙ্গের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সোহরাই, বাহা, করম, সরহুল, দাসায় প্রভৃতি উৎসবের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে প্রকৃতি, কৃষি ও ঋতুচক্রের গভীর সম্পর্ক। তাই বিশ্ব আদিবাসী দিবসও উত্তরবঙ্গের বহু মানুষের কাছে শুধুমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি নিজেদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পরিচয়কে নতুন করে স্মরণ করার দিন।
এই উপলক্ষে আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং, কালিম্পং, কোচবিহারসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় শোভাযাত্রা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোচনা সভা ও সচেতনতামূলক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উঠে আসে ভাষা, সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, জীবিকা এবং জল-জঙ্গল-জমির অধিকারের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
উৎসবের পাশাপাশি বাস্তবতার প্রশ্ন
তবে উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি বাস্তবতাকেও দেখতে হবে। উত্তরবঙ্গের বহু আদিবাসী পরিবার এখনও দারিদ্র্য, বেকারত্ব, অনিশ্চিত কর্মসংস্থান, পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাব, শিক্ষার সীমাবদ্ধতা এবং যোগাযোগ ও পানীয় জলের সমস্যার মুখোমুখি।
বিশেষ করে চা-বাগান ও বনবস্তি-নির্ভর এলাকায় জীবিকার অনিশ্চয়তা বহু পরিবারকে সমস্যায় ফেলে। দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগের অভাবও একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ভূমির অধিকার। জমি হারানো মানে শুধু একটি সম্পত্তি হারানো নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে জীবিকা, সামাজিক নিরাপত্তা, সংস্কৃতি এবং প্রজন্মের সঙ্গে গড়ে ওঠা সম্পর্ক। জমির কাগজপত্র সম্পর্কে অজ্ঞতা, প্রতারণা, আর্থিক সংকট, বেআইনি হস্তান্তর কিংবা বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে কিছু আদিবাসী পরিবার জমির অধিকার হারানোর অভিযোগ করে থাকে।
বনও আদিবাসী জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। বন তাঁদের কাছে শুধু জীবিকার উৎস নয়, সংস্কৃতি ও বিশ্বাসেরও অংশ। বনাধিকার আইন, ২০০৬ ঐতিহ্যগতভাবে বনাঞ্চলে বসবাসকারী আদিবাসী ও অন্যান্য বনবাসী মানুষের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েছে। কিন্তু আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনও নানা সমস্যা ও ঘাটতির অভিযোগ রয়েছে।
ভাষা ও সংস্কৃতি রক্ষার লড়াই
আদিবাসী সমাজের আর একটি বড় সম্পদ তাঁদের ভাষা। সাঁওতালি, কুরুখ, মুন্ডারি, সাদরি-সহ বিভিন্ন ভাষা তাঁদের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সাঁওতালি ভাষা সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। কিন্তু বহু আদিবাসী ভাষার ক্ষেত্রে এখনও শিক্ষা ও প্রশাসনিক ব্যবহারের সুযোগ সীমিত।
আধুনিকতার দ্রুত বিস্তারের ফলে অনেক লোকভাষা, লোকগান, লোকাচার ও ঐতিহ্য হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে। তাই উন্নয়নের পাশাপাশি মাতৃভাষায় শিক্ষা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণেও গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
নারী, শিশু ও শিক্ষা
আদিবাসী নারী ও শিশুদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পুষ্টি ও নিরাপত্তার প্রশ্নটিও বিশেষ গুরুত্ব দাবি করে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দূরত্ব, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং সামাজিক নানা বাধা তাঁদের সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
শিক্ষার সুযোগ আগের তুলনায় বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা, উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ এবং মাতৃভাষায় শিক্ষার সুযোগ এখনও সর্বত্র সমান নয়। তাই শুধু বিদ্যালয়ে ভর্তি নয়, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
উত্তরবঙ্গের সামনে কী করণীয়?
আদিবাসী সমাজের উন্নয়নকে কেবল সরকারি প্রকল্পের সংখ্যায় বিচার করলে চলবে না। উন্নয়নের পরিকল্পনা তৈরির সময় যাঁদের জন্য পরিকল্পনা, তাঁদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার।
শিক্ষার প্রসার, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নতি, স্থানীয় কর্মসংস্থান, নিরাপদ পানীয় জল, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং ভূমির অধিকার সুরক্ষার পাশাপাশি আদিবাসী ভাষা ও সংস্কৃতি সংরক্ষণে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন।
পঞ্চায়েত থেকে বিধানসভা, লোকসভা থেকে প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে আদিবাসী মানুষের কার্যকর অংশগ্রহণও গুরুত্বপূর্ণ। সংবিধান যে অধিকার ও সুরক্ষা দিয়েছে, তা বাস্তবে কতটা পৌঁছাচ্ছে—এই প্রশ্নের নিয়মিত মূল্যায়ন দরকার।
শুধু উদ্যাপন নয়, দরকার আত্মসমালোচনাও
বিশ্ব আদিবাসী দিবস তাই শুধুমাত্র নাচ-গান, শোভাযাত্রা কিংবা অনুষ্ঠান করার দিন নয়। এটি আত্মসমালোচনারও দিন।
ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু একজন আদিবাসী নারী—এটি নিঃসন্দেহে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা। কিন্তু একজন আদিবাসী নারী দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদে পৌঁছেছেন বলেই দেশের প্রতিটি আদিবাসী পরিবারের জীবন বদলে গেছে—এমনটা ভাবার কারণ নেই। একইভাবে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প থাকলেও প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিটি পরিবার তার সুফল পাচ্ছে কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
উত্তরবঙ্গের চা-বাগান, বনবস্তি, পাহাড় ও তরাইয়ের বহু মানুষের জীবনে আজও শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, ভূমি ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রশ্ন রয়েছে। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে সমস্যাগুলির সমাধানে প্রশাসন, সরকার, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
আদিবাসী সমাজকে উন্নয়নের গ্রহীতা হিসেবে নয়, উন্নয়নের অংশীদার হিসেবে দেখতে হবে। তাঁদের হয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার বদলে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়াই হতে পারে প্রকৃত অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের পথ।
বিশ্ব আদিবাসী দিবসের প্রকৃত সার্থকতা তখনই, যখন এই দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেবে—আদিবাসী মানুষের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি, জীবিকা ও মর্যাদা রক্ষা করা শুধু তাঁদের অধিকার নয়; এটি আমাদের সমগ্র সমাজের দায়িত্ব।
উৎসব হোক, কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক অধিকার রক্ষার অঙ্গীকার। সংস্কৃতির উদ্যাপন হোক, কিন্তু তার সঙ্গে থাকুক উন্নয়নের সমান সুযোগ। আর বিশ্ব আদিবাসী দিবস হোক এমন এক ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি, যেখানে কেউ প্রান্তিক নয়, সবাই সমান মর্যাদার নাগরিক।
Feature graphic is representational and AI generated.
