অবহেলার মাছের এত গুণ! তেলাপিয়ার ছালেই সেরে‌ উঠছে আগুনে পোড়া ক্ষত

অবহেলার মাছের এত গুণ! তেলাপিয়ার ছালেই সেরে‌ উঠছে আগুনে পোড়া ক্ষত


অনেক প্রজাতির তেলাপিয়া মাছের মধ্যে ‘নাইল তেলাপিয়া’র ছাল দগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করে উল্লেখযোগ্য সাফল্য মিলেছে ব্রাজিলের হাসপাতালগুলিতে। গত এক দশক বছর ধরেই আগুনে পোড়া ক্ষতের ড্রেসিংয়ে তেলাপিয়া মাছের ছাল ব্যবহার করে আসছেন ব্রাজিলের চিকিৎসকেরা। পুড়ে যাওয়ার কষ্ট মারাত্মক! চামড়ার উপর পোড়া ক্ষতের চিকিৎসাও ডাক্তারদের কাছে চ্যালেঞ্জের। পোড়া ক্ষতের উপর সাধারণত যে ড্রেসিং করা হয়, তাতে জীবাণু সংক্রমণের বড় ঝুঁকি থাকে। এই কারণে ঘন ঘন ড্রেসিং পরিবর্তন করতে হয়। ব্রাজিলের চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা লক্ষ্য করেছেন, পোড়া ক্ষতের উপর তেলাপিয়া মাছের ছালের ড্রেসিংয়ে ঝুঁকি অনেক কম।

তেলাপিয়া মাছ: তেলাপিয়ার ছাল আগুনে পোড়া ক্ষত নিরাময়ে চমৎকার কাজ দিচ্ছে। প্রতীকি ফটো।

২০১৫ সালে ব্রাজিলের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিয়ারা রাজ্যের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের (ফেডারেল ইউনিভার্সিটি অফ সিয়ারা) গবেষণাগারে তেলাপিয়া মাছের ছাল দিয়ে পোড়া ক্ষতের চিকিৎসা পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম শুরু হয়েছিল। গবেষণার নেতৃত্ব দেন ব্রাজিলের প্রখ্যাত প্লাস্টিক সার্জেন ড. এডমার ম্যাসিয়েল লিমা জুনিয়র। ব্রাজিলের ফোর্তালেজার ড. জোসে ফ্রোতা বার্ন সেন্ট্রারে চিকিৎসার জন্য আসা পোড়া রোগীদের ক্ষতস্থানে তেলাপিয়া মাছের ছাল ব্যবহার করতে শুরু করেন ডাক্তারেরা।

ব্রাজিলের গবেষকদের মতে, তেলাপিয়া মাছের ছালে এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যা মানুষের ত্বকের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করে। এতে প্রচুর টাইপ-১ কোলাজেন থাকে, যা মানব ত্বকের পুড়ে যাওয়া কোষগুলির পুনর্গঠন ও দ্রুত ক্ষত নিরাময়ে সাহায্য করে। তেলাপিয়া মাছের ছাল পোড়া ক্ষতস্থানকে আর্দ্র রাখে এবং ক্ষতের সঙ্গে শক্তভাবে লেগে থাকে। ফলে বাইরের জীবাণু দ্বারা সংক্রমণের আশঙ্কা হ্রাস পায়। ক্ষতস্থানকে বারবার ড্রেসিংয়ের বিড়ম্বনা থেকে রেহাই মেলে।

ব্রাজিলের ড. জোসে ফ্রোতা বার্ন সেন্ট্রারে ফেজ-৩ র‌্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে ১১৫ জন রোগীর ওপর তেলাপিয়া মাছের ছাল দিয়ে গবেষণা চালিয়ে দেখা গেছে রোগীদের ক্ষত দ্রুত শুকিয়েছে। তেলাপিয়ার ছাল ব্যবহারের ফলে ড্রেসিং পরিবর্তনের সংখ্যা পাঁচ থেকে কমে দুইয়ে নেমেছে। ক্ষতের চিকিৎসায় তেলাপিয়ার ছাল ব্যবহারের কারণে রোগীদের ব্যথা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমেছে এবং রোগীদের ব্যথানাশক ওষুধ কম খেতে হয়েছে। চিকিৎসার সময় ও চিকিৎসাব্যয় হ্রাস পাওয়ায় পোড়া ক্ষতের চিকিৎসায় তেলাপিয়ার ছাল ব্যবহারে আরও বেশি উৎসাহী হয়ে ওঠেন চিকিৎসকেরা।

তেলাপিয়ার ছাল কখনোই সরাসরি ব্যবহার করা হয় না। মাছের দেহ থেকে ছাল সংগ্রহ করে বিশেষ রাসায়নিক প্রক্রিয়া দ্বারা ছাল জীবাণুমুক্ত করে এবং গামা বিকিরণ ও একাধিক মাইক্রোবায়োলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে ছালটি সম্পূর্ণ নিরাপদ করা হয়। এরপর ছালটি রোগীর ক্ষতস্থানে লাগিয়ে তার উপর ব্যান্ডেজ বেঁধে দেন চিকিৎসকরা।

অগ্নিদগ্ধদের ত্বকের কোষ স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে ক্ষতস্থানে স্কিন গ্রাফটিং বা দেহের সুস্থ জায়গা থেকে ত্বক এনে অথবা অন্যের দেহের ত্বক প্রতিস্থাপন করতে হয়। এটাকেই বলে প্লাস্টিক সার্জারি। তবে তেলাপিয়ার ছাল কোন‌ও স্কিন গ্রাফটিং নয়, এটা হল একটি জৈবিক ড্রেসিং বা বায়োলজিক্যাল ড্রেসিং বা জেনোগ্রাফট। তেলাপিয়ার ছাল আসলে দগ্ধ স্থানের ক্ষত দ্রুত নিরাময়ে সাহায্য করে। ক্ষত ভাল হয়ে গেলে ছালটি স্বাভাবিকভাবেই দেহ থেকে আলগা হয়ে যায়। বর্তমানে ব্রাজিলে প্রতিদিন শত শত দগ্ধ রোগীর চিকিৎসা চলছে তেলাপিয়ার ছাল ব্যবহার করে।

আগুনে পোড়া ক্ষতের চিকিৎসা অত্যন্ত ব্যয়বহুল ও চিকিৎসকদের জন্য চ্যালেঞ্জের। ব্রাজিলে ত্বক প্রতিস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মানবদেহের ত্বকের ঘাটতি আছে। শূকরের ত্বক এবং উন্নত কৃত্রিম ড্রেসিংয়ের সরঞ্জাম‌ও সুলভ নয়। দেশের স্কিন ব্যাংকগুলি মোট চাহিদার খুব সামান্য অংশ‌ই পূরণ করতে সক্ষম। অন্যদিকে ব্রাজিলে তেলাপিয়া মাছের উৎপাদন বিপুল। সহজলভ্য তেলাপিয়ার ছালকে পোড়ার চিকিৎসায় কাজে লাগিয়ে সাফল্য পেয়েছেন ব্রাজিলের চিকিৎসকেরা।

তেলাপিয়া মাছের ছাল দিয়ে আগুনে পোড়া ক্ষতের উপর ব্যান্ডেজ বেঁধে চমৎকার ফল পেয়েছেন ব্রাজিলের চিকিৎসকেরা। সংগৃহীত ফটো।

শুধু ব্রাজিল নয় ঘন বসতিপূর্ণ যে কোনও উন্নয়নশীল দেশে অগ্নিদগ্ধ রোগীদের চিকিৎসায় তেলাপিয়ার ছাল একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। যে সব দেশে মানব ত্বক ও উন্নত কৃত্রিম ড্রেসিংয়ের ঘাটতি রয়েছে, সেখানে এই জৈবিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে অত্যন্ত কম খরচে আগুনে পোড়া রোগীদের কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।

ফিচার গ্রাফিক্স প্রতিনিধিত্বমূলক ও এআই জেনারেটেড।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *