নেতাজি বিদ্বেষী নগেন্দ্র রায়! দলের সাংসদের ব্যাপারে তাদের অবস্থান কী, তা স্পষ্ট করতে হবে বিজেপিকে


নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের ব্যাপারে বিজেপি নেতৃত্ব যে মৌনব্রত পালন করে চলেছেন, তা ভাঙার সময় চলে এসেছে। নচেৎ বিজেপিকে বড় রাজনৈতিক মূল্য চোকাতে হবে। একটা প্রবাদ আছে— বোবার শত্রু নেই। কিন্তু রাজনীতিতে এবং রাজধর্ম পালন কালে এই নীতি খাটে না। রাজার চোখের সামনে খারাপ ঘটনা ঘটে চলেছে, আর রাজা চুপ মেরে বসে আছেন, এমন রাজাকে প্রজাকুল কোন‌ও কালেই পছন্দ করে না।

বিজেপি এখন পশ্চিমবঙ্গের শাসকদল। সেই দলের একজন নেতা দিনের দিন ধরে দেশনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে অত্যন্ত অবমাননাকর বক্তব্য দিয়ে চলেছেন, জাতিবিদ্বেষ ছড়াচ্ছেন। কিন্তু তাতে বিজেপি নেতৃত্বের কোন‌ও হেলদোল দেখা যাচ্ছে না! এটা বিজেপির রাজনৈতিক কৌশল হতেই পারে। কিন্তু এই কৌশল বিজেপিকে কোন‌ও সুবিধা ও স্বস্তি দেবে না।

নগেন্দ্র রায় রাজ্যসভার সাংসদ এবং ২০২৩ পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিজেপি তাঁকে সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠিয়েছে। বিজেপির একজন সাংসদ নেতাজিকে হেয় প্রতিপন্ন করে যাবেন আর বাঙালি তা চুপ করে শুনবে! এটা হতে‌ পারে? কোন‌ও জাতিই তার নায়কের অপমান সহ্য করে না। মহারাষ্ট্রে দাঁড়িয়ে কেউ ছত্রপতি শিবাজিকে অপমান করলে মারাঠিরা তাঁর ছাল ছাড়িয়ে নুন মাখাতো। রাজ্য বিজেপির নেতারা কি জানেন না, নেতাজির ব্যাপারে বাঙালি কতটা সংবেদনশীল? অনন্ত মহারাজের বাঁদরামি দেখার পরেও রাজ্য বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব যেভাবে চুপ করে আছেন, লোকে তা দেখে বলছেন “আরে এঁরা তো দেখছি ক্লীব!”

রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে অনেক সময়‌ই সরকারকে, শাসকদলকে‌ ধৈর্য্যের পরিচয় দিতে হয়, এটা ঠিক। কিন্তু ধৈর্য্যের পরীক্ষার একটা সময়সীমা আছে। অনন্ত মহারাজের ব্যাপারে সেটা অতিক্রান্ত হয়েছে। এবার যদি বিজেপির বড় বড় নেতারা মুখ না খোলেন, বিজেপি দলটাকেই যথা সময়ে সঠিক শিক্ষা দিয়ে দেবে জনগণ। রাজ্যের একটা ছোট অঞ্চলের বিশেষ জনগোষ্ঠীর ভোটব্যাঙ্ককে রক্ষা করতে গিয়ে বড় অঞ্চলের সর্ববৃহৎ জনগোষ্ঠীর ভোটব্যাঙ্ককে অবহেলা করা রাজনৈতিকভাবে মোটেই সঠিক কৌশল নয়‌, বরং অদূর ভবিষ্যতে তা আত্মঘাতী বলে প্রমাণিত হতে পারে। আর বিজেপি যদি নেতাজির চেয়ে নগেন্দ্র রায়কেই অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করে, তাহলে বিজেপি যেমনটি চালিয়ে যাচ্ছে, চালিয়ে যেতেই পারে।

দলীয় পলিটিক্সে শৃঙ্খলা বলে একটা কথা আছে। দল করলে সবাইকে তা মানতে হয়। দলের অভ্যন্তরে সেই শৃঙ্খলার কথা মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য‌ই পার্টিতে একজন করে ‘চিফ হুইপ’ বা মুখ্য সচেতক থাকেন। এখন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বকে সবার আগে এটা জানাতে হবে, এই নগেন্দ্র রায় নামে তাঁদের দলের যে রাজ্যসভা সাংসদ আছেন, তিনি কি আদৌ বিজেপির মতো একটা শৃঙ্খলাপরায়ণ, রেজিমেন্টেড দলের সদস্য? নাকি সদস্য নন? সদস্য হয়ে থাকলে তিনি বিজেপির দলীয় শৃঙ্খলার মধ্যে পড়েন কি পড়েন না? নগেন্দ্রর উপর কি বিজেপির দলীয় শৃঙ্খলা, নির্দেশ লাগু হয় না? তিনি কি দলের মধ্যে বিশেষ কোন‌ও ছাড় পান, যা বাকি সদস্যরা পান না? বিজেপির গঠনতন্ত্রে কি এমন কোন‌ও ছাড়ের বিধান আছে?

নগেন্দ্র রায় যদি বিজেপির সক্রিয় সদস্য হ‌ওয়ার পরেও দিনের পর দিন ধরে শৃঙ্খলাভঙ্গ করে থাকেন, তবে গঠনতন্ত্র মেনে তাঁর বিরুদ্ধে কেন পদক্ষেপ করছেন না দলের শীর্ষ নেতৃত্ব? নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর বিরুদ্ধে নগেন্দ্রর শ্রীমুখ দিয়ে যা অমৃত নিঃসৃত হচ্ছে, তাতে বিজেপির দলীয় শৃঙ্খলা ও নীতি ভঙ্গ হচ্ছে কি হচ্ছে না?

নগেন্দ্র রায় নিজে এমন পরিস্থিতি তৈরি করে চলেছেন, তাতে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব যদি অবিলম্বে মৌনতা ভঙ্গ করে এইসব অপ্রিয় প্রশ্নের উপযুক্ত জবাব না দেন, তবে অবশ্য‌ই বিজেপিকে খুব বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে। শমীকবাবুরা যদি তা আগাম আঁচ করতে ব্যর্থ হন, তবে তাঁদের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা নিয়েই সংশয় আছে।‌ পলিটিক্সে কোন‌ও অর্জন‌ই ‘টেকেন ফর গ্র্যান্টেড’ নয়। আমরা চাই বিজেপির নেতাজি বিদ্বেষী সাংসদ নগেন্দ্র রায়ের ব্যাপারে বিজেপির দলীয় অবস্থান কী, তা স্পষ্ট করে আমাদের জানাক দলটির শীর্ষ নেতৃত্ব।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com