মণীশকে বাঁচাতেই চেপে গিয়েছিলেন মমতা! জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট সামনে আনলেন শুভেন্দু

মণীশকে বাঁচাতেই চেপে গিয়েছিলেন মমতা! জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট সামনে আনলেন শুভেন্দু


বিচারবিভাগীয় কমিশনের রিপোর্ট পেশ করে সোমবার বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তৎকালীন ঘটনায় কমিশন রিপোর্ট জমা দেওয়া সত্ত্বেও দীর্ঘদিন বিধানসভার টেবিলে এনে সাধারণ মানুষের সামনে সত্য তুলে ধরা হয় নি।” তৃণমূলের জামানায় জনগণ সন্দেহ করত, জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টে এমন কিছুর উল্লেখ আছে, যা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রশাসনের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। এই জন্যই রিপোর্ট প্রকাশ করছেন না মমতা। কী আছে জাস্টিস চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট? এ’দিন বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, “সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের ‘ইনকোয়ারি রিপোর্ট’-এ বেশ কিছু বিস্ফোরক পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে।”

প্রয়াত জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়। ২০১৪ সালে ২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট জমা দেন তিনি। সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করেন নি মমতা। ফাইল ফটো।

রিপোর্ট পেশ করে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্তের নির্দেশেই সে দিন গুলি চলেছিল। পুলিশের গুলিতে মৃত্যুর যথার্থতা প্রমাণিত হয় নি।‌ যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একুশে জুলাইয়ের ঘটনার প্রধান সাক্ষী হ‌ওয়ার কথা, তাঁকেই ডাকে নি জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন!”

কমিশন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বামফ্রন্টের প্রাক্তন চেয়ারম্যান বিমান বসু, প্রাক্তন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি প্রদীপ ভট্টাচার্য, মদন মিত্র, সৌগত রায়, কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার তুষার তালুকদার, প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রসচিব ও মমতা সরকারের প্রাক্তন বিদ্যুৎমন্ত্রী মণীশ গুপ্ত সহ ৪৪ জনকে তলব করেছিল। ১৯৯৩ সালের একুশে জুলাইয়ের ঘটনার সময় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন জ্যোতি বসু। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। তখন রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন মণীশ গুপ্ত এবং কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন প্রয়াত তুষার তালুকদার। পরবর্তীকালে চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তৃণমূল কংগ্রেসে যোগদান করেন মণীশ গুপ্ত। ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে যাদবপুরে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যকে পরাজিত করেছিলেন মণীশ।

প্রয়াত তুষার তালুকদার। কলকাতার প্রাক্তন পুলিশ কমিশনার। একুশে জুলাইয়ের ঘটনার সময় সিপি ছিলেন তিনি। ফাইল ফটো।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রথম মন্ত্রিসভায় গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ মন্ত্রকের দায়িত্ব পান মণীশ গুপ্ত। জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টে মণীশ গুপ্তের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক অভিযোগ রয়েছে। মণীশকে আড়াল করতেই মমতা রিপোর্ট চেপে রেখেছিলেন- এই অভিযোগ এখন প্রমাণিত হচ্ছে। কমিশন জানিয়েছে, একুশে জুলাই পুলিশের গুলি চালানোর ঘটনার কোনও উপযুক্ত তদন্ত হয় নি। আইন অনুযায়ী যে একজিকিউটিভ ইনকোয়ারি হ‌ওয়া উচিত ছিল, তা ন্যায্য ও সরল বিশ্বাসে করা হয় নি। তৎকালীন পুলিশ কমিশনার তুষার তালুকদারের দিকে সন্দেহের আঙুল তোলা হয়েছে রিপোর্টে। বলা হয়েছে, তৎকালীন পুলিশ কমিশনারের জমা করা রিপোর্ট অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কার নির্দেশে সে দিন গুলি চলেছিল, তা তিনি গোপন করেছেন।

জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টে এমন‌ও উল্লেখ আছে, মণীশ গুপ্ত সহ আর কয়েকজনকে বাঁচাতে ফাইল ও নথি গায়েব করা হয়েছে! কমিশন স্পষ্ট ভাবে জানিয়েছে, মহাকরণ থেকে বহু দূরে মেয়ো রোড, রেড রোড, ডোরিনা ক্রসিং ও এসপ্ল্যানেডে আন্দোলনরত জনতার উপর গুলি চালনা সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, উস্কানিবিহীন ও অযৌক্তিক ছিল। ২০০১-২০০৬ রাজ্যের বিরোধী দলনেতা ছিলেন প্রয়াত পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়।‌ পরে কোন‌ও রহস্যজনক কারণে পঙ্কজবাবুকে দলের মধ্যে সাইডলাইন করে দেন মমতা। কমিশনে সাক্ষ্য দিতে এসে পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন, “আমার বিশ্বাস গুলি চালানোর জন্য একমাত্র দায়ী ব্যক্তি ছিলেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রসচিব মণীশ গুপ্ত।”

বিধানসভায় পঙ্কজ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাক্ষ্য উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “অভিযুক্ত মণীশ গুপ্তকেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মন্ত্রিসভায় স্থান দিয়েছিলেন। তাই কমিশন কেন তাঁর নাম উল্লেখ করে নি বা মণীশ গুপ্তকে দায়ী করে নি, তা খুব স্পষ্ট।” জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন নিহত ১৩ জন‌ শহিদের পরিবারকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। শুভেন্দু বলেন, “কিন্তু তৃণমূল সরকার নিহতদের পরিবারগুলিকে মাত্র ২ লক্ষ টাকা এবং আহতদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা দিয়ে প্রতারণা করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলি চাইলে এই ঘটনার বিরুদ্ধে নতুন করে এফ‌আইআর দায়ের করার সুযোগ বর্তমান সরকার দেবে।”

মণীশ গুপ্ত। একুশে জুলাইয়ের ঘটনার সময় রাজ্যের স্বরাষ্ট্রসচিব ছিলেন। পরে তৃণমূলে যোগ দিয়ে মমতার সরকারের মন্ত্রী হন। ফাইল ফটো।

কমিশনের সুপারিশ মেনে একুশে জুলাইয়ের নিহতদের পরিবারগুলিকে ২৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে প্রদান করা হবে বলে এ’দিন বিধানসভায় আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, একুশে জুলাইয়ের শহিদদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন বলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বলেন, “একুশে জুলাইয়ের আবেগ ও শহিদদের রক্তকে ব্যবহার করে অনেকেই নিজেদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও রাজনৈতিক আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। কিন্তু শহিদ পরিবারগুলি আজ চরম উপেক্ষিত।”

বিধানসভায় শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “আগামী কাল ২১ জুলাই। এই দিনটাকে ব্যবহার করে অনেকে অনেক কিছু করে নিয়ে গিয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক পদ বা সরকারি ক্ষমতা নয়, ব্যক্তিগত বিষয় সম্পত্তি, আমেরিকায় গিয়ে চোখের চিকিৎসা, চার্টার্ড ফ্লাইটে ঘোরা, হরিশ চ্যাটার্জি ও হরিশ মুখার্জি স্ট্রিটে ৩৮টা প্লটের মালিক হওয়া, অসংখ্য প্রাসাদের মতো বাড়ি তৈরি করা- অনেক অনেক কিছু করে নিয়ে গিয়েছেন।”

Feature graphic is representational and AI generated.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com