ডেস্ক রিপোর্ট: উজবেকিস্তানের জনসংখ্যার ৮৫ থেকে ৯০ শতাংশই মুসলমান। মুসলমানদের সংখ্যাগরিষ্ঠই আবার সুন্নি হানাফি মাজহাবের অন্তর্ভূক্ত। সেই উজবেকদের মন জয় করে নিলেন মোদী। দু’দিনের উজবেকিস্তান সফরে শনিবার তাসখন্দে পৌঁছান ভারতের প্রধানমন্ত্রী। বিমানবন্দরে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনা জানান উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ। রবিবার উজবেকিস্তানের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদী ইউরেনিয়াম চুক্তি সই করে ফেলল ভারত। ভারতের পারণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলির সক্ষমতা বাড়াতে নি:সন্দেহে এটা একটা উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ।
পৃথিবীর উল্লেখযোগ্য ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী দেশগুলির মধ্যে উজবেকিস্তান অন্যতম। পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত রাখতে একাধিক দেশ থেকে ইউরেনিয়াম আমদানি করতে হয় ভারতকে। সরবরাহ লাইন নির্বিঘ্ন রাখতে কোনও একটি দেশের উপর অধিক নির্ভরশীল থাকতে চায় না দিল্লি। উজবেকিস্তানের সঙ্গে ইউরেনিয়াম সরবরাহ সংক্রান্ত চুক্তি কার্যকর হলে পারমাণবিক বিদ্যুতের উৎপাদন নিয়ে অনেকটাই চিন্তামুক্ত থাকতে পারবে ভারত। রবিবার তাসখন্দে অনুষ্ঠিত দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে দুই দেশের মধ্যে আরও কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।

ভারত ও উজবেকিস্তানের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার লক্ষ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দুই দেশ। ইলেকট্রনিক্স, ইঞ্জিনিয়ারিং পণ্য, অটোমোবাইল, ওষুধ-সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারস্পরিক বাণিজ্য আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভারতীয় ও উজবেক বাণিজ্যিক সংস্থাগুলির মধ্যে সরাসরি ব্যবসায়িক যোগাযোগ বৃদ্ধির উপরও জোর দেওয়া হয়েছে।
সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে ভারত ও উজবেকিস্তান একমত। নিজেদের নিরাপত্তা ও ইন্টেলিজেন্স এজেন্সি গুলির মধ্যে সহযোগিতা ও তথ্যের আদানপ্রদান আরও বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত ও উজবেকিস্তান সরকার। দুই দেশই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়াতে ভারত ও উজবেকিস্তানের সেনাবাহিনীর মধ্যে যৌথ সামরিক মহড়া নিয়মিত অনুষ্ঠিত হতে থাকবে বলে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়েছে।
প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা AI, সাইবার নিরাপত্তা, ডিজিটাল রূপান্তর এবং মহাকাশ গবেষণায় পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত ও উজবেকিস্তান। উজবেকিস্তানে ভারতের প্রযুক্তিগত সহযোগিতায় গড়ে ওঠা আইটি পার্ক উজবেকদের মধ্যে ভাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। বৈঠকে এই সাফল্যের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দেশের স্টার্টআপ, প্রযুক্তি সংস্থা ও আইটি ইনস্টিটিউটগুলির মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারত-উজবেকিস্তানের সম্পর্ক শুধু অর্থনীতি বা কূটনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়। দুই প্রাচীন দেশের মধ্যে প্রাচীন সভ্যতা ও সংস্কৃতিগত যোগাযোগ বৃদ্ধির উপরেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে মোদী-শাভকাত বৈঠকে। উজবেকিস্তানের প্রাচীন বৌদ্ধ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন ফায়াজ তেপা ও কারা তেপা সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারে সহযোগিতা করবে ভারত। এই লক্ষ্যে দুই দেশের মধ্যে Letter of Intent স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তাসখন্দ স্টেট ইউনিভার্সিটি অব ওরিয়েন্টাল স্টাডিজে ‘আইসিসিআর সংস্কৃত চেয়ার’ প্রতিষ্ঠারও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ২০২৬-২০৩০ সময়কালের জন্য নতুন ‘সাংস্কৃতিক বিনিময় কর্মসূচি’ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দুটি দেশ।
মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হলেও উজবেকিস্তানে ভারতীয় সংস্কৃতির আরেকটি জনপ্রিয় মাধ্যম হয়ে উঠেছে যোগ। রবিবার তাসখন্দে উজবেকিস্তান যোগা ফেডারেশনের একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। দুই দেশ যোগ প্রশিক্ষণ ও বিশেষজ্ঞ বিনিময়ের ক্ষেত্রেও সহযোগিতা বাড়াবে মোদীর এই সফর।
ভারতীয় ভ্রমণপিপাসুদের জন্য সুখবর বয়ে এনেছে মোদীর উজবেকিস্তান সফর। উজবেকিস্তান সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে দেশে ভারতীয়দের ৩০ দিনের ভ্রমণে কোনও ভিসা লাগবে না। প্রেসিডেন্ট শাভকাত মনে করেন, তাঁর সরকারের এই পদক্ষেপ দেশটির পর্যটন শিল্পে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আনবে।

রবিবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান ‘ওলি দরাজলি দোস্তলিক’-এ ভূষিত করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়োয়েভ। সম্মান পেয়ে মোদী বলেন, “উজবেকিস্তানের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় সম্মান পাওয়া আমার কাছে গর্বের বিষয়।”
উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দের সঙ্গে জড়িয়ে আছে ভারতের আরেক প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর স্মৃতি। সেই স্মৃতি যদিও বেদনাবিধুর। ১৯৬৬ সালের ১০ জানুয়ারি বিকেলে সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রাত ১ টা ৩২ মিনিটে শাস্ত্রীজির আকস্মিক মৃত্যু ঘটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর জন্য হার্ট অ্যাটাককে দায়ী করা হলেও এই মৃত্যু ঘিরে সে সময় অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছিল।

তাসখন্দে শাস্ত্রীজির মৃত্যুর ৬০ বছর পূর্তি উপলক্ষে উজবেক শিক্ষার্থীদের জন্য ‘লালবাহাদুর শাস্ত্রী হিন্দি ভাষা বৃত্তি’ ঘোষণা করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদী। উজবেকিস্তানের রাজধানীতে লালবাহাদুরের আবক্ষ মূর্তিতে পুষ্পস্তবক দিয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করেন মোদী।
Feature image: collected.