বিশেষ প্রতিবেদন: নেপাল এবং তিব্বতে হড়পা বানে মৃত এবং নিখোঁজদের একটা বড় অংশ বিদেশি পর্যটক ও তীর্যযাত্রী। এঁদের সিংহভাগ আবার ভারতের নাগরিক ও পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী ভারতীয় বংশোদ্ভূত। কৈলাস ও মানস সরবোর দর্শনের উদ্দেশে ঘর ছেড়েছিলেন মানুষগুলি। ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন ৬ হাজার ৬৩৮ মিটার উঁচু কৈলাস পর্বতে ভগবান শিব ও দেবী পার্বতী অধিষ্ঠান করেন। কৈলাস পর্বতমালার দক্ষিণে সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৪ হাজার ৫৯০ মিটার উচ্চতায় রয়েছে মানস সরবোর— বিশ্বের উচ্চতম মিষ্টি জলের হ্রদ। মানস সরোবরের জলে একবার অবগাহন করলে নাকি পুনর্জন্ম হয় না!

হিমালয়ের দুর্গম সব গিরিপথ অতিক্রম করে পৃথিবীর ছাদ তিব্বত মালভূমিতে অক্ষত পৌঁছতে পারলে তবে কৈলাস-মানসের দর্শন মেলে। যাত্রাপথে পদে পদে বিপদ। তবুও প্রতি বছর জুন থেকে সেপ্টেম্বর— দলে দলে মানুষ কৈলাস পর্বত ও মানস সরোবর দর্শনে ছুটে যান! এই আগস্ট মাসেই কৈলাস-মানস সরোবরের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে পথেই হারিয়ে গিয়েছিলেন ৬০ জন তীর্যযাত্রী। যাঁদের একজন ছিলেন সেলিব্রেটি প্রতিমা বেদী। মডেল, চলচ্চিত্র অভিনেত্রী এবং ওডিশি নৃত্যশিল্পী প্রতিমা ছিলেন প্রখ্যাত অভিনেতা কবীর বেদীর স্ত্রী। তাঁদের দাম্পত্য সম্পর্ক অবশ্য বেশি দিন টেকে নি। এই দম্পতির দুই সন্তান পূজা ও সিদ্ধার্থ।

১৯৯৭ সালে সিদ্ধার্থের অকাল মৃত্যুর পর বিনোদনের রঙিন দুনিয়া ছেড়ে দিয়ে অন্তর্মুখী হয়েছিলেন এক সময়ের বিতর্কিত মডেল প্রতিমা। সংসার ও জনজীবন ত্যাগ করে সন্ন্যাসিনীর বেশে হিমালয়ের নির্জনে ঘুরতেন। আধ্যাত্মিকতায় মন দিয়েছিলেন তিনি, মস্তক মুন্ডন করে নাম নিয়েছিলেন গৌরী। ১৯৯৮ সালের আগস্টের মাঝামাঝি কৈলাস ও মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশে তীর্থযাত্রায় বেরিয়ে পড়েছিলেন প্রতিমা গৌরী। দলে ছিলেন আরও ৫৯ জন। উত্তরাখন্ডের (তখন উত্তরপ্রদেশ) লিপুলেখ পাস অতিক্রম করে তিব্বতে পৌঁছানোর কথা ছিল ৬০ জনের তীর্থযাত্রী দলটির। ১৮ আগস্ট ভারত-তিব্বত সীমান্তের পিথোরাগড় জেলার (যা তখন উত্তরপ্রদেশের অন্তর্গত ছিল) মালপা গ্রামে রাত্রিযাপন করতে থেমেছিলেন তীর্থযাত্রীরা।
রাত ১২টা ২৫ মিনিট থেকে ভোর ৩টার মধ্যে কোনও এক সময়ে পাহাড়ে বিরাট ধস নামে। বিশাল বিশাল পাথর-চাঁই গড়িয়ে পড়ে নিচের গ্রামে। মালপার গ্রামবাসীরা তখন গভীর ঘুমে। ছুটে নিরাপদ জায়গায় পালানোর আগেই ধসে চাপা পড়েন তাঁরা। গোটা গ্রামটাই নিশ্চিহ্ন হয়ে যায় পাথর-মাটির তলায় চাপা পড়ে। বলা যায়, সেই অভিশপ্ত রাতে মালপা গ্রামের মাথার উপর একটা আস্ত পাহাড় যেন ভেঙে পড়েছিল।
প্রথম দিকে প্রশাসন হিসেবই করতে পারে নি মালপা গ্রামে কত মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কেননা, গ্রামটি প্রায় ১৫ মিটার উঁচু পাথর-মাটির ধ্বংসস্তুপের নিচে চাপা পড়ে যায়। মাত্র কয়েকজনের দেহাবশেষ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিলেন উদ্ধারকর্মীরা। পরে অনেক সমীক্ষা করে, সরকারি নথিপত্র ঘেঁটে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছিল মৃতের সংখ্যা ২২১ জন। তাঁদের মধ্যে ৬০ জন ছিলেন কৈলাস-মানস সরোবরের তীর্থযাত্রী। এই তীর্থযাত্রীদের দলেই ছিলেন প্রতিমা বেদী। নিহতদের মধ্যে গ্রামের বাসিন্দা ও তীর্থযাত্রীরা ছাড়াও ছিলেন আইটিবিপির জওয়ানেরা, তীর্থযাত্রীদের মালবাহকেরা এবং সরকারি কর্মীরা।

কী কারণে ঘটেছিল এই দুর্যোগ? আসলে বিপদের সূত্রপাত হয়েছিল দু’দিন আগেই। ১৬ আগস্ট থেকেই উপরের পাহাড় থেকে পাথর গড়িয়ে পড়তে শুরু করে মালপা গাদের উপরে। তিনটি খচ্চর তাতে মারা যায়। কিন্তু সতর্ক হন নি গ্রামবাসীরা। গড়িয়ে আসা শিলাখন্ড পাহাড়ের উপর একটি জলাধারকে আটকে দেয়। তৈরি হয় একটি বিপজ্জনক ‘ল্যান্ডস্লাইড ড্যাম’। সঙ্গে চলছিল প্রবল বৃষ্টি। জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে গাড়োয়াল হিমালয়ের বেলে পাথরের ঢাল ও ভেতরের শিলাস্তরকে করে দেয় ক্ষয় ও দুর্বল। ১৭ আগস্ট রাতেই উপচে পড়া জলাধারের প্রাকৃতিক বাঁধে ফাটল ধরে। আটকে পড়া বিপুল জলরাশি, পাথর ও মাটি নিচের দিকে নামতে শুরু করে। এরপর ১৮ আগস্ট মাঝ রাত থেকে প্রকৃতির প্রলয়। আস্ত পাহাড়টাই টুকরো টুকরো হয়ে ধসে পড়ে মালপা গ্রামের উপর।
কৈলাস ও মানস সরোবর দর্শনের উদ্দেশে বেরিয়ে মালপা গ্রামে যখন প্রতিমা গৌরী বাকি ৫৯ জন তীর্যযাত্রীর সঙ্গে মাটি চাপা পড়ে চিরনিদ্রায় গেলেন, তখন তাঁর বয়স মাত্র ঊনপঞ্চাশ! শোনা যায়, ১৭ আগস্ট সন্ধ্যায় মালপার শিবিরে ‘শিব নৃত্য’ পরিবেশন করেছিলেন প্রতিমা। তীর্থযাত্রী ও স্থানীয় গ্রামবাসীরা গোল হয়ে বসে সেই নৃত্য উপভোগ করেছিলেন। শিবের টানে তিনি ছুটে চলেছিলেন দুর্গম কৈলাসে। কিন্তু তার আগেই প্রতিমার জীবনের যাত্রাপথ সমাপ্ত করে দিল প্রকৃতি।
Feature image is representational. Image source: collected.