বিশেষ প্রতিবেদন: নিউ ইয়র্কে মোহন ভাগবতের কর্মসূচি নিয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন খোদ শহরের ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র জোহরান মামদানি। ভাগবতকে নিউ ইয়র্কের মাটিতে পা রাখতে দেবেন না বলে শাসিয়েছিল আমেরিকার অনেক মুসলিম সংগঠনও। শনিবার ম্যানহাটনের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে পূর্ব নির্ধারিত অনুষ্ঠানে যথারীতি উপস্থিত থেকে দীর্ঘ বক্তৃতা করলেন সংঘপ্রধান। সংঘের শতবর্ষ উদযাপন চলছে। এই উপলক্ষে বিদেশে সফর শুরু করেছেন সরসংঘচালক। আমেরিকা দিয়ে তাঁর বিদেশ সফর শুরু। শনিবার নিউ ইয়র্কের ম্যানহাটনে প্রথম কর্মসূচি ছিল ভাগবতের। সেই অনুষ্ঠান পন্ড করার কম চেষ্টা করে নি একটি মহল। কিন্তু সংঘপ্রধানকে রোখা গেল না শেষ পর্যন্ত!
ম্যানহাটনের ম্যাডিসন স্কোয়ার গার্ডেনে ‘আমেরিকার হিন্দুস ফর এনগেজমেন্ট অ্যান্ড ডায়ালগ’ নামে একটি সংগঠন আয়োজিত অনুষ্ঠানটির নাম ছিল ‘ইউনিভার্সাল ওয়াননেস সেলিব্রেশন’। বিশাল হলে ৫ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে রীতিমতো জমকালো অনুষ্ঠান। মঞ্চে দাঁড়িয়ে মোহন ভাগবত বলেন, “ভারত সবাইকে আশ্রয় দিয়েছে। এটাই ভারতবর্ষের ঐতিহ্য। যাঁরা বিশ্বের কোথাও নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পান নি, তাঁরা ভারতে এসেছেন। এখানে তাঁরা নিজেদের জায়গা করে নিয়েছেন।” সংঘপ্রধান বলেন, “মুসলিম ভাইয়েরা আমাকে প্রশ্ন করেছিলেন— ‘আপনারা একটি হিন্দু সংগঠন, তাহলে আমাদের কী হবে? আপনারা কি আমাদের তাড়িয়ে দেবেন?’ আমি বলেছিলাম, না, হিন্দুত্ব তা নয়। কোনও হিন্দু যদি মনে করেন যে ভারতে মুসলমানদের থাকা উচিত নয়, তবে তিনি আর হিন্দু থাকলেন না।”

ভাগবত বলেন, “ভারতের ডিএনএ-তেই বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য আছে। ভারতীয় সভ্যতার বিশেষত্বই হল, বৈচিত্র্যের মধ্যেও অন্তর্নিহিত যে একত্ব, তাকে অনুভব করা। ভারত ও আমেরিকা দু’দেশেরই বৈশিষ্ট্য হল বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য।” তিনি বলেন, “বৈচিত্র্য প্রকৃতির নিয়ম, আর ঐক্য হল প্রকৃতির অন্তর্নিহিত সত্য। বৈচিত্র্য আমাদের একত্বকে আরও সুন্দর করে তোলে।” স্বামী বিবেকানন্দের শিকাগো বক্তৃতার উল্লেখ করে মোহন ভাগবত বলেন, “ভারতের ভাগ্যেই রয়েছে যে সে বিশ্বকে বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যকে উপলব্ধি করাবে। প্রত্যেকটি জাতিরই একটি বিশেষ ঐতিহাসিক বা সভ্যতাগত ভূমিকা আছে। আর ভারতের ক্ষেত্রে সেটা হল বসুধৈব কুটুম্বকম— সমগ্র বিশ্বই যে এক পরিবার, প্রাচীন যুগ থেকে শাশ্বত ভারত তা দুনিয়াকে শিখিয়ে আসছে।”
নিউ ইয়র্কে আরএসএস প্রধান বলেন, “হিন্দু দর্শন মূলগতভাবেই বহুত্ববাদী। যদি নিজেকে হিন্দু বলতে চান, আপনাকে বিশ্বাস করতে হবে, সব পথ একই ঈশ্বরের দিকে যায়।” ভাগবত আরও বলেন, “ধর্মে ধর্মে প্রভেদ থাকতে পারে। কারও ধর্ম আলাদা হতে পারে। কিন্তু মানবতা এক। ধর্মীয় পরিচয়ের বাহ্যিক পার্থক্যের আড়ালে মানবতার একত্ব মৌলিক।” তিনি বলেন, “ভারত শিখিয়েছে, সত্য এক। কিন্তু মানুষ তার নিজস্ব উপলব্ধি ও মানসিক কাঠামো অনুযায়ী সেই সত্যকে বিভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করে থাকে।”
আমেরিকায় প্রবাসী ভারতীয়দের এই সভায় রাজনীতি নিয়েও মুখ খোলেন মোহন ভাগবত। সংঘপ্রধান বলেন, “রাজনীতি এখন অনেকটাই স্বার্থের খেলায় পরিণত হয়েছে। আমার আমার বলে কোনও সমস্যার সমাধান আমরা করতে পারব না। সমাধান হল আমরা ও আমাদের। রাজনীতিতে আত্মকেন্দ্রিকতার পরিবর্তে সমষ্টিগত চিন্তার প্রয়োজন।” ভাগবত মনে করেন, শুধু রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানকে প্রভাবিত করার চেষ্টা না করে আগে সমাজের মধ্যে পরিবর্তন আনা দরকার।”
গণতন্ত্রে রাজনীতি জনমতের উপর নির্ভর করে। জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। সমাজে কোনও ইস্যুতে শক্তিশালী জনমত তৈরি হলে কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতা সহজে তার বিপরীতে যেতে পারবেন না।
ম্যানহাটনের সভায় রাজনীতি নিয়ে আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ মন্তব্য করেন মোহন ভাগবত। সরসংঘচালক বলেন, “গণতন্ত্রে রাজনীতি জনমতের উপর নির্ভর করে। জনমতকে উপেক্ষা করে রাজনীতি করা সম্ভব নয়। সমাজে কোনও ইস্যুতে শক্তিশালী জনমত তৈরি হলে কোনও রাজনৈতিক দল বা নেতা সহজে তার বিপরীতে যেতে পারবেন না।”
নিউ ইয়র্কে মোহন ভাগবত বলেন, “ভারতের মুসলমান ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের সঙ্গে আরএসএস-এর যোগাযোগ আছে। আলোচনা ও সেবার মধ্য দিয়ে দুই সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আরও নিবিড় করতে চায় আরএসএস।” সংঘপ্রধান সবশেষে বলেন, “বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়া তৈরির কাজ কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হলেও তা চালিয়ে যেতে হবে। ভাগবতের ভাষায়— এই কাজ অনন্তকাল চালিয়ে যেতে হবে, যাতে মানুষ অশুভের খাদে না পড়ে।
Feature image: collected.