'মৃত্যুর পরোয়া করি না, ছাব্বিশেই বাংলাদেশে ফিরব'! শেখ হাসিনার হুঙ্কার

‘মৃত্যুর পরোয়া করি না, ছাব্বিশেই বাংলাদেশে ফিরব’! শেখ হাসিনার হুঙ্কার


২০২৪-এর জুলাইয়ে কোটা বিরোধী ছাত্র আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বলপ্রয়োগ করতে বাধ্য হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আন্দোলন দমনে ব্যর্থ হয় আওয়ামি লিগ প্রশাসন। আন্দোলন গণ অভ্যুত্থানের রূপ নিলে সেনাবাহিনী হাসিনা সরকারের উপর থেকে সমর্থন তুলে নেয়। শেষে ৫ অগস্ট সকালে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ অভিমুখে উন্মত্ত জনতার স্রোত ধেয়ে আসতে শুরু করলে সেনা প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের হুমকির মুখে দেশত্যাগ করতে বাধ্য হন শেখ হাসিনা। সে’দিন বিকেলেই বোন রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একটি পরিবহণ বিমানে চড়ে ভারতে চলে আসেন হাসিনা। তখন থেকেই ভারত সরকারের অতিথি হয়ে দিল্লিতে বাস করছেন বাংলাদেশের চারবারের প্রধানমন্ত্রী।

শেখ হাসিনা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। ১৯৭৫ সালের ১৫ অগস্ট ভোরে শেখ মুজিবের ধানমন্ডি ৩২-এর বাসায় হামলা চালিয়ে তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে সেনাবাহিনীর পাকিস্তানপন্থী অফিসারেরা। ঘটনার সময় শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে থাকায় প্রাণে রক্ষা পান। চব্বিশের ৫ অগস্ট‌ও শেখ হাসিনাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল বাংলাদেশের পাকিস্তানপন্থী স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির। এমন‌ই অভিযোগ আওয়ামি লিগের।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে খুন করেছিল সামরিক বাহিনীর পাকিস্তানপন্থী অফিসারেরা।‌ ফটোর একদম ডানে শেখ হাসিনা। বাম দিক দ্বিতীয় শেখ রেহানা। বিদেশে থাকায় দুই বোন বেঁচে যান। ফাইল ফটো।

একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় থেকেই ভারত শেখ মুজিবুর রহমান ও আওয়ামি লিগের মিত্র। পঁচাত্তরে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু নিহত হ‌ওয়ার পরে তাঁর কন্যা দুই কন্যাকে রাজনৈতিক আশ্রয় দিতে দ্বিধা করে নি ভারত সরকার। শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামি লিগ সরকারের সঙ্গে অত্যন্ত সুসম্পর্ক ছিল দিল্লির। চব্বিশের ৫ অগস্ট শেখ হাসিনার জীবন যখন বিপন্ন, তখন তাঁকে সসম্মানে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। গণভবন থেকে হাসিনার রেসকিউ মিশন মোদীর নির্দেশে দিল্লিতে বসেই সরাসরি মনিটরিং করেন ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল।

ভারতে পা রাখার পর থেকেই শেখ হাসিনার একমাত্র লক্ষ্য, কীভাবে তিনি স্বদেশে ফিরে যাবেন। হাসিনা সরকারের পতনের পর বাংলাদেশে মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন। সেই নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসে বিএনপি। মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দায়ের করে প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। একটি মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদন্ড প্রদান করেছে।

মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে ফিরিয়ে আনতে ছাব্বিশেই দেশে ফিরতে চান শেখ হাসিনা। সংগৃহীত ফটো।

মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়েই দেশে ফিরতে চান বঙ্গবন্ধু কন্যা। এ নিয়ে এনডিটিভি প্রশ্ন করলে শেখ হাসিনা জানান, “আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই ও পরিবারের প্রায় সকলকে হারিয়েছি। কিন্তু এত চক্রান্তের পরেও আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশেই থেকেছি।” মৃত্যুদণ্ডের রায়কে গুরুত্ব‌ই দিতে নারাজ হাসিনা। তিনি বলেন, “এটা বিচার নয়। এটা অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত একটি ব্যবস্থার অংশ মাত্র। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্বদানকারী দল আওয়ামি লিগকে নেতৃত্বহীন করতেই বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ার করেছে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তি।”

আওয়ামি লিগ নিষিদ্ধ। শেখ হাসিনা সহ দলটির শীর্ষ নেতৃত্বের বড় অংশ ভারত সহ অন্যান্য দেশে আশ্রয় নিয়েছেন। যাঁরা দেশে, তাঁদের সবাই জেলে। আওয়ামি লিগের হাজার হাজার কর্মীও জেলে পচছেন। আওয়ামি লিগকে কোন‌ও রকম রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অনুমতি দিচ্ছে না পুলিশ। ঢাকর ৩২ নম্বর ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়ি ইউনূস জামানাতেই ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়েছে উন্মত্ত জনতা। ঘটনা যখন ঘটছে, তখন প্রশাসনকে নিষ্ক্রিয় রেখে মৌলবাদীদের মদত দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। এত দমনপীড়নের পরেও আওয়ামি লিগ জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আওয়ামি লিগ কোনও কাগুজে সংগঠন নয়। এই দলকে বহুবার বহু আঘাত করা হয়েছে। বহুবার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু প্রত্যেকবার মানুষের ভালবাসাকে সঙ্গী করে আওয়ামি লিগ ঘুরে দাঁড়িয়েছে।”

ভারত‌ও চায় শেখ হাসিনা সসম্মানে দেশে প্রত্যাবর্তন করুক এবং বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামি লিগকে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হোক। শেখ হাসিনার জীবনের নিরাপত্তা ও আওয়ামি লিগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের ব্যাপারে কোনও আপোস করবে না দিল্লি। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাতে হাসিনাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে উদ্যোগী হন, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের তরফ থেকে কূটনৈতিক স্তরে পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলে দুই দেশের রাজনৈতিক মহলের ধারণা। যদিও এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তারেক‌ রহমানের সরকারের সঙ্গে গোপন ‘বোঝাপড়ার তত্ত্ব’ খারিজ করে দিয়েছেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আওয়ামি লিগ কার‌ও রাজনৈতিক অনুগ্রহ চায় না।”

মুহাম্মদ ইউনূসের জামানায় বাংলাদেশে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, হিন্দু নির্যাতন, বাউল-ফকিরদের উপর আক্রমণ এবং মাজারে হামলা চরমে উঠেছিল। বিএনপি সরকারের আমলেও সংখ্যালঘু হিন্দুদের উপর নির্যাতন চলছে বলে অভিযোগ করেছেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। শেখ হাসিনা এনডিটিভি-কে বলেন, “ব্যক্তিগত কোনও আশা-আকাঙ্খার জন্য আমি দেশে ফিরতে চাইছি, বিষয়টি এমন নয়। এখানে প্রশ্নটা বাংলাদেশের গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাঁচিয়ে রাখার।”

Fearure graphic is representational and AI generated.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *