কলকাতা: এবার একুশে জুলাই ধর্মতলায় কোনও সমাবেশের অনুমতি দেবে না কলকাতা পুলিশ। প্রত্যেক বছর ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে একুশে জুলাইয়ের শহিদদের স্মরণে সভা করে তৃণমূল কংগ্রেস। কিন্তু ছাব্বিশের একুশে জুলাইয়ের পরিস্থিতি আলাদা। পনেরো বছর পর তৃণমূল রাজ্যের ক্ষমতা থেকে অপসারিত। খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ভবানীপুরে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে কার্যত ঘরে বসে গেছেন। তৃণমূল কংগ্রেস এখন কালীঘাট ও ঋতব্রত- এই দুই ভাগে বিভক্ত। দুই পক্ষই ২১ জুলাই ধর্মতলায় কর্মসূচি পালন করতে চেয়ে পুলিশের অনুমতি চেয়েছিল। মঙ্গলবার দুই পক্ষকেই না বলে দিল লালবাজার।
কলকাতা পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ধর্মতলার মতো শহরের ব্যস্ততম জায়গায় কাজের দিনে রাস্তা আটকে সভা-সমাবেশ হলে নাগরিকদের দুর্ভোগ চরমে ওঠে। তাই একুশে জুলাই সেখানে কোনও ধরণের রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের অনুমতি দেওয়া সম্ভব নয়। একুশে জুলাই ধর্মতলায় তৃণমূলের কর্মসূচির পোশাকি নাম ‘শহিদ তর্পণ’। যদিও তৃণমূলের জামানায় তা শাসকদলের বাৎসরিক মহোৎসবে পরিণত হয়েছিল। দলীয় কর্মসূচিকে ছাপিয়ে তা হয়ে উঠেছিল সরকারি অনুষ্ঠান। টালিগঞ্জের স্টুডিও পাড়া থেকে ঝাঁক ধরে নায়ক-নায়িকা, কলাকুশলীরা ধর্মতলার মঞ্চে হাজির থাকতেন। বাদ থাকতেন না কবি-সাহিত্যিক-লেখক ও গায়ক-নর্তকের দলও। একুশে জুলাই ধর্মতলায় হাজির না থাকলে সেলিব্রিটিদের মমতার রোষানলে পড়ে কাজ হারাতে হত।

পুলিশের অনুমতি পাওয়ার আগেই রবিবার দুপুরে ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে ফিতে নিয়ে মাপজোক করে এসেছেন কালীঘাট তৃণমূলের বেলেঘাটার বিধায়ক কুণাল ঘোষ, দোলা সেন ও বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়রা। সোমবার বিধানসভায় এ নিয়ে কুণাল ঘোষকে কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। কুণালকে উদ্দেশ্য করে শুভেন্দু বলেন, “ফিতে নিয়ে মাপতে চলে গিয়েছেন! কোথায় (সভা) করবেন বলে দেব। আপনাদের সভায় অনেক লোক হবে। ব্রিগেডে চলে যান! গিয়েছিলেন তো একবার!” বিধানসভায় মুখ্যমন্ত্রীর মুখ ঝামটাতেই কুণাল ঘোষদের রেহাই মেলে নি। ধর্মতলায় পুলিশের বিনা অনুমতিতে রাস্তা আটকে মাপজোকে নেমে যান চলাচলে বাধা সৃষ্টি করায় কুণাল সহ ঘটনাস্থলে উপস্থিত অন্যান্য তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে লালবাজার।
গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় রামমোহন হলে উত্তর কলকাতা তৃণমূল কংগ্রেস আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মোবাইলে ভাষণ দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেখানে মমতা বলেন, “একুশে জুলাই আশা করি অনুমতি পাব। আমরা একটা দিনই মিটিং করি। সেদিন বিস্তারিত বলব। পাঁচজন কর্মী থাকলেও সেই মিটিংয়ে থাকব। আপনারা ওই দিন সমবেত হোন।” এই বছরের একুশে জুলাই ধর্মতলায় সমাবেশ করতে চেয়ে কালীঘাট তৃণমূল ও ঋতব্রতপন্থী তৃণমূল- তৃণমূলের দুই গোষ্ঠীই পুলিশের কাছে আবেদন জানিয়েছে। লালবাজারের অবস্থান পরিষ্কার- কলকাতার ব্যস্ততম এলাকায় রাজপথ আটকে কাউকেই মিটিং করতে দেবে না তারা।
শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করা রাজনৈতিক দলগুলির সাংবিধানিক অধিকার। অন্যান্য বছর একুশে জুলাই ধর্মতলায় তৃণমূলের মেগা ইভেন্টে মানুষের ঢল নামত। এ বছর ধর্মতলায় কর্মসূচিতে পুলিশ না করে দেওয়ার পর কী করবেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? অন্যত্র কর্মসূচি পালন করবেন নাকি ধর্মতলাতেই সভা করার জন্য গোঁ ধরে বসে থাকবেন? চাইলে তৃণমূল নেতৃত্ব আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। তবে রাস্তা আটকে রাজনৈতিক সভা-সমাবেশের ব্যাপারে আদালতেরও ক্ষোভ আছে।
ছাব্বিশের একুশে জুলাইয়ের কর্মসূচিতে লোক জুটানোটাই তৃণমূল নেতৃত্বের জন্য সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ। ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভায় পুলিশ অনুমতি না দেওয়ায় একদিক দিয়ে বরং সুবিধাই হল তৃণমূলের। মুখ বাঁচানোর সুযোগ পেলেন তৃণমূল নেতৃত্ব। কালীঘাট তৃণমূলের এখন যা দৈন্যদশা, তাতে দেশপ্রিয় পার্ক কিম্বা পার্ক সার্কাসের মাঠ ভরানোটাও তাদের জন্য বিরাট চ্যালেঞ্জের।
Feature image is representational and AI generated.