লালবাহাদুর শাস্ত্রী: নিষ্কলঙ্ক নেতার রহস্যজনক মৃত্যু! যে রহস্যের কিনারা হয় নি


২ অক্টোবর ভারতের সেই প্রধানমন্ত্রীর‌ও জন্মদিন— যাঁর সততা, সরলতা, শুদ্ধতার কথা আজ‌ও লোকের মুখে মুখে ফেরে! বিদেশে তাঁর রহস্যমৃত্যুর নিষ্পত্তি হয় নি এবং কলঙ্কহীন এই নেতাকে তাঁর নিজের দল‌ই মনে রাখে নি। লিখলেন উত্তম দেব—

নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বাইরে কংগ্রেসের যে চার নেতা (গুলজারিলাল নন্দকে ধরে) দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন, তাঁদের তিনজনের সঙ্গেই নেহেরু-গান্ধী পরিবারের বিশেষ সদ্ভাব ছিল না। ব্যতিক্রম মনমোহন সিং। মনমোহন রাজনীতির লোক ছিলেন না। তিনি ঘটনাচক্রে প্রধানমন্ত্রী— দ্য অ্যাক্সিডেন্টাল প্রাইম মিনিস্টার! সোনিয়া-রাহুলের হয়ে প্রক্সি খেটেছেন বলে মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে মা-ছেলের সম্পর্ক ভাল ছিল। ভৃত্যের সঙ্গে প্রভুর সম্পর্ক এমনিতে খারাপ থাকে না।‌ আজ (২ অক্টোবর) ভারতবর্ষের সেই প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন, যিনি মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলে দেশের রাজনীতির গতিপথ অন্য খাতে ব‌ইতেই পারত।

এক নেতার রহস্যমৃত্যু, আরেক নেতার ভাগ্যোদয়

লালবাহাদুর শাস্ত্রী— ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রী। জ‌ওহরলাল নেহেরুর মৃত্যুর ১৩ দিন পর ১৯৬৪ সালের ৯ জুন‌ দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিয়েছিলেন শাস্ত্রীজি। মাত্র ১ বছর ৭ মাস ২ দিন প্রধানমন্ত্রী ছিলেন লালবাহাদুর। ১৯৬৬-র ১১ জানুয়ারি মধ্যরাতে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দে শাস্ত্রীর মৃত্যু শুধু আকস্মিক‌ই নয়, রহস্যের কুয়াশায়ও মোড়া! ৫ ফুট ২ ইঞ্চির মানুষটার ওজন ছিল মাত্র ৫৬ কেজি। ক্ষীণ তনু, হ্রস্বদেহী মানুষটার সততা ছিল তাঁর দেহের ওজন এবং উচ্চতার ঠিক বিপরীত। সততা, অনাড়ম্বর জীবনযাত্রা ও বিনম্রতার জন্য লালবাহাদুর শাস্ত্রী দলমত নির্বিশেষে সকলের শ্রদ্ধা কুড়িয়েছেন জীবদ্দশাতেই।

বিদেশের মাটিতে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর আকস্মিক, রহস্যজনক এবং বিতর্কিত মৃত্যুর ঠিক ১৩ দিন পর ১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি দলের ভেতরে মোরারজি দেশাইকে ধরাশায়ী করে দেশের প্রধানমন্ত্রী হন ইন্দিরা গান্ধী। মৃত্যুর সময় লালবাহাদুরের বয়স হয়েছিল মাত্র ৬১ বছর ৩ মাস ৯ দিন। কোন‌ও সন্দেহ নেই, কথাটা খারাপ শোনালেও তিক্ত সত্য, শাস্ত্রীজির অকাল মৃত্যুতে রাজনৈতিকভাবে সবথেকে বেশি লাভবান যদি কেউ হয়ে থাকেন, তবে তিনি ইন্দিরা। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর মৃত্যুর তিন বছরের মধ্যে কংগ্রেসে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়— সেই যুদ্ধে বাপের সতীর্থদের হারিয়ে শেষ পর্যন্ত ইন্দিরা বিজয়ী হন এবং কংগ্রেস তাঁর করতলগত হয়।

কংগ্রেসে যখন থেকে নেহেরু-গান্ধী পরিবারের একচ্ছত্রাধিপত্য কায়েম হয়েছে, তখন থেকেই এই পরিবারের বাইরে দলটির যত মহীরুহ নেতা ছিলেন, তাঁদের স্থান হয় ফুটনোটে। লালবাহাদুর শাস্ত্রী, নরসিমহা রাও— এঁরাও যে কংগ্রেসের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কংগ্রেস দলের আচরণে তা প্রতীয়মান হয় না। কংগ্রেসীদের কাছে আইকন মানেই নেহেরু-ইন্দিরা-সঞ্জয়-রাজীব। সোনিয়া-রাহুল-প্রিয়াঙ্কা এমনকি রাহুলের ভগ্নিপতি ররার্ট ভদোদরার পাদোদক পানেও বহু কংগ্রেস নেতার আপত্তি নেই।

তাসখন্দে শাস্ত্রীজির মৃত্যু না হলে যা ঘটতে পারত

জ‌ওহরলাল নেহেরুর মন্ত্রিসভায় রেল, বাণিজ্য ও শিল্প এবং স্বরাষ্ট্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ দফতর সামলেছেন লালবাহাদুর। মেয়েকে মন্ত্রিসভায় ঠাঁই দেন নি নেহেরু। তবে বাপের জীবদ্দশাতেই কংগ্রেসের সভাপতি পদে (১৯৫৯ সালে, দিল্লি অধিবেশনে) বসেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। লালবাহাদুর শাস্ত্রীর উপর নেহেরুর ভরসা থাকলেও শাস্ত্রীর সঙ্গে ইন্দিরার সম্পর্ক ছিল বরাবর‌ই শীতল। প্রচারবিমুখ ও অনভিজাত শাস্ত্রীর সাদামাটা জীবনযাপন, অনাড়ম্বর চালচলন ইন্দিরার পোষাত না। শাস্ত্রীও ইন্দিরার থেকে দূরে দূরে থাকতেন এবং ইন্দিরা তাঁর ক্যারিয়ারের ক্ষতি করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত বলে সন্দেহ করতেন।

নেহেরুর মৃত্যুতে দেশের প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ার পর নিজের ক্যাবিনেটে ইন্দিরা গান্ধীকে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রক দিয়েছিলেন লালবাহাদুর শাস্ত্রী। শাস্ত্রীর অধীনে কেন্দ্রীয় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী হয়ে খুঁতখুঁতে ইন্দিরা যে সুখী ছিলেন‌, তা নয়। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতার কারণে ইন্দিরাকে ক্যাবিনেটে নিতে বাধ্য হলেও শাস্ত্রী নিজেও ইন্দিরার ভূমিকায় খুশী ছিলেন না। এমনকি ৬৫-র ডিসেম্বরে বিরক্ত ইন্দিরা শাস্ত্রীর মন্ত্রিসভা থেকে ইস্তফা দিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাসের উদ্দেশে লন্ডনে পাড়ি দেওয়ার কথা ভেবেছিলেন!

এক ফ্রেমে নেহেরু, ইন্দিরা ও শাস্ত্রী। অনভিজাত, সাধাসিধা শাস্ত্রীজির সঙ্গে বরাবর‌ই ঠান্ডা সম্পর্ক ইন্দিরা গান্ধীর।‌ ছবি: সংগৃহীত।

ইন্দিরা গান্ধীকে নিয়ে লালবাহাদুর শাস্ত্রীর চিন্তাভাবনাও এক‌ই খাতে ব‌ইছিল। তাসখন্দ থেকে দেশে ফিরেই ইন্দিরাকে যুক্তরাজ্যে ভারতের রাষ্ট্রদূত করার প্রস্তাব দেবেন বলে মনস্থির করে ফেলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শাস্ত্রী। কিন্তু মানুষ ভাবে এক, ইতিহাস ঘটায় আরেক! সোভিয়েত রাশিয়ার মধ্যস্থতায় ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষর করতে তাসখন্দে গিয়ে আর ফিরলেন না লালবাহাদুর শাস্ত্রী। শাস্ত্রীজির মৃত্যুর কারণ ডেথ সার্টিফিকেটে উল্লেখিত ‘হার্ট অ্যাটাক’ নাকি তাঁকে ষড়যন্ত্র করে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল?

ললিতা শাস্ত্রী আমৃত্যু বিশ্বাস করেন নি, স্বামীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে

ললিতা শাস্ত্রী শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগের মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেন নি, তাঁর স্বামীর স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। শাস্ত্রীজির দেহ তাসখন্দ থেকে দিল্লিতে ফেরার পর ময়নাতদন্ত ছাড়াই তড়িঘড়ি সৎকার করা হয়েছিল। বিমানবন্দরে লালবাহাদুরের পুত্র-কন্যা-জামাতাদের দেহের কাছে ঘেঁষতে দেওয়া হয় নি। শাস্ত্রীর মৃতদেহ যখন প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে পরিবারের মাঝে আনা হয়েছিল, দেহটি দেখে তাঁর স্ত্রী-পুত্র-কন্যারা আঁতকে উঠেছিলেন। শাস্ত্রীজির মুখ ও দেহ নীল হয়ে গিয়েছিল। দেহটি ছিল অস্বাভাবিক রকমের ফোলা এবং প্রধানমন্ত্রীর ব্যবহৃত চাদর, বালিশ ও পোশাক— সব‌ই রক্তে ভেজা ছিল!

শেষ শয্যায় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী। স্বামীর নিথর দেহের সামনে নিশ্চল ললিতা শাস্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত।

লালবাহাদুর শাস্ত্রীর দেহের অবস্থা দেখার পর তাঁর পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠ অনুগামীরা দেহটি ময়নাতদন্তের দাবি তুলেছিলেন। কিন্তু মিত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক খারাপ হতে পারে, এই অজুহাতে সেই দাবি প্রত্যাখ্যান করে সরকার। স্বামীর মৃত্যুর চার বছর পর হিন্দি সাপ্তাহিক ‘ধর্মযুগ’-এ প্রথমবারের মতো মুখ খোলেন ললিতা শাস্ত্রী, ততদিনে লালবাহাদুরের মৃত্যু নিয়ে দেশের রাজনৈতিক মহল তোলপাড়— প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীর মৃত্যু রহস্য উদ্ঘাটনের দাবিতে সংসদের ভেতরে-বাইরে ইন্দিরা সরকারকে চেপে ধরেছে বিরোধীরা।

কী ঘটেছিল তাসখন্দে সেই রাতে?

১৯৬৬ সালের ১০-১১ জানুয়ারি রাতে ঠিক কী ঘটেছিল ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাগ্যে? ১০ জানুয়ারি বিকেল চারটেয় আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমের কয়েক শত প্রতিনিধি এবং দুই দেশের শীর্ষস্থানীয় মন্ত্রী-কূটনীতিক-আমলাদের উপস্থিতিতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে ‘তাসখন্দ চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। ঐতিহাসিক চুক্তিতে স্বাক্ষরের সময় প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রীর বিপরীতে ছিলেন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল আয়ুব খান, যাঁর দেহের উচ্চতা এবং ওজন‌ও ছিল শাস্ত্রীর ঠিক বিপরীত। দুই রাষ্ট্রনেতার মাঝে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিলুপ্ত সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী আলেক্সেই নিকোলায়েভিচ কোসিগিন।

তাসখন্ডে জেনারেল আয়ুব খান ও সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের মাঝখানে লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত।

ভারতের প্রধানমন্ত্রীর থাকার জন্য পৃথক সরকারি ‘দাচা’ বা ভিলার ব্যবস্থা করেছিল সোভিয়েত কর্তৃপক্ষ।‌ পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্বরণ সিং এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াইবি চ্যবন সহ ভারতীয় প্রতিনিধিদলের বাকি সদস্যরা ছিলেন হোটেলে। চুক্তি স্বাক্ষর শেষে দুই রাষ্ট্রপ্রধানের সম্মানে নৈশভোজ ও নাচ-গানের অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলেন কোসিগিন। ভোজসভায় শাস্ত্রীকে দেখে কার‌ও অসুস্থ বলে মনে হয় নি। রাত ন’টায় অনুষ্ঠানস্থল থেকে শাস্ত্রীজি র‌ওনা হয়ে দশটা নাগাদ ‘দাচা’য় পৌঁছে ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গ সেই অভিশপ্ত রাতে ‘দাচা’-য় ছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. আর‌এন চুঘ, নিরাপত্তা আধিকারিক আর কাপুর, ব্যক্তিগত সচিব জেএন সহায়, আপ্তসহায়ক এম‌এম‌এন শর্মা এবং ব্যক্তিগত পরিচারক রাম নাথ। আর‌ও একজন ছিলেন মহম্মদ জান, মস্কোয় ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের পাচক।

ভিলায় ফিরে সামান্য কিছু মুখে দিয়েছিলেন শাস্ত্রীজি। প্রধানমন্ত্রীর জন্য ‘দাচা’-র কিচেনে আলু-পালংশাক দিয়ে একটি পদ রেঁধে ছিলেন মহম্মদ জান, রান্নায় তাঁকে সাহায্য করেছিলেন রুশ পাচকেরা। প্রধানমন্ত্রী রাত সাড়ে-বারোটা পর্যন্ত সফরসঙ্গীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেছেন। হটলাইনে দিল্লিতে জরুরি কথা সেরেছেন। বাড়ি থেকে ফোন এলে পরিবারের সদস্যদের সাথেও বাতচিত করেছেন। এমনকি মধ্যরাতেই ইন্ডিয়ান ফিল্ম ডিভিশনের নিউজ রিলের জন্য ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে শট‌ও দিয়েছিলেন শাস্ত্রীজি! নিজের কক্ষে ঘুমোতে যাবার আগে পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে শারীরিক অসুস্থতার কোন‌ও লক্ষণ দেখতে পান নি ড. চুঘ সহ ‘দাচা’-য় থাকা সফরসঙ্গীরা।

শুয়ে পড়ার আগে ইসবগোল গুলানো‌ এক গ্লাস গরম দুধ পান করেছিলেন লালবাহাদুর। কিচেন থেকে দুধ গরম করে এনেছিলেন প্রধানমন্ত্রীর খাস পরিচারক রাম নাথ। কিছুক্ষণ পর শাস্ত্রীজি রাম নাথের কাছে জল খেতে চান। শোবার ঘরের সেন্টার টেবিলের মধ্যে একটি ফ্লাস্কের মধ্যে আগে থেকেই জল‌ ভরা ছিল। ফ্লাস্ক থেকে জল ঢেলে প্রধানমন্ত্রীকে খেতে দেন রাম নাথ। জলপানের পরেই শাস্ত্রীজি অসুস্থ হয়ে‌ পড়েন এবং কাশতে শুরু করেন। তাঁর শ্বাসকষ্ট শুরু হয়, ক্রমে তিনি চৈতন্য হারান। প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত চিকিৎসক ড. আর‌এন চুঘের চোখের সামনেই মাত্র তিন মিনিটের মধ্যে পুরো ঘটনাটি ঘটে যায়। খবর পেয়ে সোভিয়েত চিকিৎসক অধ্যাপক ইভজেনিয়া ইয়েরেমেঙ্কো যখন এসে পৌঁছলেন, তখন শাস্ত্রীর নাড়ির গতি-হৃদস্পন্দন স্তব্ধ হয়ে গেছে!

প্রধানমন্ত্রীর পানের জলেই ছিল বিষ!

হিন্দি সাপ্তাহিক ‘ধর্মযুগ’-কে ললিতা শাস্ত্রী বলেছিলেন, দুধে নয় বরং জলেই কিছু মেশানো ছিল। জলভর্তি ফ্লাস্কটি আগে থেকেই শাস্ত্রীজির ঘরে রাখা ছিল। শাস্ত্রীজি যখন কষ্টে হাঁসফাঁস করছিলেন, চেতনা লোপ পাওয়ার আগে তিনি নাকি ফ্লাস্কটির দিকেই হাতের ইশারা করেছিলেন— ধর্মযুগের সাংবাদিক প্রভাত মিত্তালকে এ কথা বলেছিলেন লালবাহাদুরের ধর্মপত্নী। লালবাহাদুর শাস্ত্রী সবসময় সঙ্গে ডায়েরি রাখতেন, তাতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার নোট রাখতেন তিনি। প্রয়াত স্বামীর ব্যক্তিগত ডায়েরি ও ফ্লাস্কটি ফেরত পান নি ললিতা শাস্ত্রী।

প্লেনেই দফতরের কাজ সামলাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী, পাশে স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী। শাস্ত্রীজিকে তাসখন্দে খুন করা হয়েছে, আমৃত্যু এই ধারণা থেকে সরেন নি ললিতাদেবী। ছবি: সংগৃহীত।

তাসখন্দে তাঁর স্বামীকে হত্যা করা হয়েছিল বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন ললিতাদেবী। কে হত্যা করেছে, খুঁজে বের করতে ভারত সরকারের কাছে অনেকবার তদন্ত দাবি করেছিলেন তিনি। শুধু ললিতা শাস্ত্রীই নয়, বল্লভভাই প্যাটেলের পুত্র দহ্যাভাই প্যাটেল, সমাজতান্ত্রিক নেতা রামমনোহর লোহিয়া, স্বতন্ত্র পার্টির সাংসদ পিলু মোদী, দিল্লি কংগ্রেসের প্রাক্তন সভাপতি জগদীশ কোদেসিয়া, প্রখ্যাত সাংসদ মধু লিমায়ে, অটলবিহারী বাজপেয়ী, লালকৃষ্ণ আদবানি এবং রাজ নারায়ণ সহ বিরোধীপক্ষের হেভিওয়েট সাংসদেরাও শাস্ত্রীর রহস্যমৃত্যুর পর এক‌ই দাবিতে সোচ্চার হয়েছিলেন।

মৃত্যুর পরেও শাস্ত্রীর প্রতি সহানুভূতি দেখান নি ইন্দিরা!

প্রয়াত লালবাহাদুরের বিধবা পত্নী এবং বিরোধী নেতাদের তদন্তের দাবিতে বিন্দুমাত্র কর্ণপাত করেন নি ইন্দিরা গান্ধী। এমনকি ইন্দিরা চান নি, শাস্ত্রীর অন্ত্যেষ্টিস্থল বিজয়ঘাটে কোন‌ও স্থায়ী স্মৃতিসৌধ তৈরি হোক। ললিতা শাস্ত্রী ধর্নায় বসার হুমকি দেওয়ার পর‌ সুর নরম করেন ইন্দিরা। প্রধানমন্ত্রী লালবাহাদুর শাস্ত্রী— যাঁর সততা, চারিত্রিক স্বচ্ছতার গল্প আজ‌ও লোকের মুখে মুখে ফেরে, তাঁর মৃত্যু ঘিরে অনেক রহস্য! কিন্তু আজ পর্যন্ত সেই রহস্যের কিনারা হয় নি।

কলঙ্কহীন শাস্ত্রীকে আজকের কংগ্রেস তার ইতিহাসের অংশ বলেই মনে করে না। সেই তিক্ত সত্যের আর‌ও একবার পুনরুক্তি করি— লালবাহাদুরের অকাল, আকস্মিক ও রহস্যজনক মৃত্যুতে যদি কেউ রাজনৈতিকভাবে সবথেকে বেশি লাভবান হয়ে থাকেন, তবে তিনি ইন্দিরা গান্ধী।

ডিসক্লেইমার: ফিচার ইমেজটি এআই জেনারেটেড এবং প্রতিনিধিত্বমূলক।

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:
প্রতিবেদনটি লিখতে অনুজ ধরের “ইয়োর প্রাইম মিনিস্টার ইজ ডেড’ গ্রন্থের সাহায্য নিতে হয়েছে।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com