বক্সায় বাঘের প্রত্যাবর্তনে মানুষের রুটি-রুজির সংকট! আন্দোলনে স্থানীয়রা


পর্যটন বন্ধের সময়সীমা ৩ অক্টোবর থেকে বাড়িয়ে ৯ অক্টোবর করা হয়েছে। পুজোর মরশুমে এই সিদ্ধান্তে হোমস্টে, গাড়ি, গাইড, সাফারি এবং ছোট ব্যবসার উপর বড় আর্থিক চাপ পড়েছে বলে পর্যটন মহলের দাবি। BHATO-র সদস্য এবং আলিপুরদুয়ার ডিস্ট্রিক্ট ট্যুরিজম অ্যাসোসিয়েশনের কো-অর্ডিনেটর তমাল গোস্বামী বলেন, “আমরা বাঘের বিরুদ্ধে নই। বন সংরক্ষণের বিরুদ্ধেও নই। কিন্তু বাঘকে বাঁচানোর নামে যদি বক্সার মানুষের রুটি-রুজি বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে সেই ব্যবস্থারও পর্যালোচনা দরকার।”

তমালের বক্তব্য, বড় ব্যবসা সাময়িক ক্ষতি সামলাতে পারলেও গাড়িচালক, গাইড, হোমস্টে মালিক কিংবা ছোট দোকানদারের কাছে প্রতিদিনের আয়ই সংসারের মূল ভরসা। তাই তাঁর দাবি, বক্সায় সংরক্ষণ ও পর্যটনকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে যাতে স্থানীয় মানুষ কেবল বিধিনিষেধের শিকার না হয়ে উন্নয়নের অংশীদার হন। “বাঘ বাঁচুক, বন বাঁচুক, মানুষও বাঁচুক—এই তিনটিকে আলাদা করে দেখলে বক্সার সমস্যার সমাধান হবে না,” বলেন তমাল।

আন্দোলনকারীদের মূল দাবিগুলি—

  • পর্যটন দ্রুত পুনরায় চালুর সুস্পষ্ট রোডম্যাপ প্রকাশ করতে হবে এবং বাঘের নিরাপত্তা বজায় রেখে নিয়ন্ত্রিত পর্যটনের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • ​পর্যটন বন্ধ থাকার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িচালক, গাইড, হোমস্টে মালিক, দোকানদার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জীবিকা সুরক্ষায় বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হবে।
  • ​ভবিষ্যতের ইকো-ট্যুরিজমে স্থানীয় মানুষকে অগ্রাধিকার ও অংশীদারিত্ব দিতে হবে।
  • ​বক্সা ও জয়ন্তীতে বাড়িঘর মেরামত বা নির্মাণসামগ্রী নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ নিয়ে অভিযোগ উঠেছে, তা বাস্তবসম্মত ও স্বচ্ছ নিয়মে পরিচালনা করতে হবে।
  • ​কোর এলাকা, বসতি, জমি ও সম্ভাব্য পুনর্বাসন নিয়ে কোনও পরিকল্পনা থাকলে তা প্রকাশ্যে জানাতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট মানুষের সঙ্গে আলোচনা করতে হবে।
  • ​বাঘ সংরক্ষণ ও পর্যটনের মধ্যে সংঘাত না তৈরি করে ‘কমিউনিটি বেসড সাসটেইনেবল টুরিজম মডেল’ তৈরি করতে হবে।
  • ​পর্যটন বন্ধ বা বিধিনিষেধের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী ও গ্রামবাসীদের সঙ্গে নিয়মিত পরামর্শের ব্যবস্থা করতে হবে।

বন দফতরের যুক্তি— নিরাপত্তা আগে, কিন্তু পর্যটনও বন্ধ করে রাখা লক্ষ্য নয়

বন দফতরের অবস্থানকে একেবারে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। সদ্য আনা বাঘিনীকে নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সময় দিতে হচ্ছে। তার চলাফেরা, স্বাস্থ্য, আচরণ, শিকার করার সক্ষমতা এবং অভিযোজন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সরকারি পরিকল্পনাতেও রেডিও-টেলিমেট্রি, ক্যামেরা ট্র্যাপ এবং মাঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে বাঘিনীর গতিবিধি নজরে রাখার কথা বলা হয়েছে।

বক্সায় বাঘ ফিরতেই পর্যটকদের বনে প্রবেশে লাগাম। পর্যটনব্যবসায়ীদের মাথায় হাত! ছবি: প্রতিবেদক।

বনকর্তাদের যুক্তি, পর্যটকদের আনাগোনা, সাফারি বা অতিরিক্ত শব্দ নতুন পরিবেশে থাকা বাঘিনীর উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। পাশাপাশি পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তাই সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বাঘিনীর নিরাপত্তা ও অভিযোজনের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে। একটি বন আধিকারিকের বক্তব্যও সংবাদমাধ্যমে এসেছে—বন দফতর পর্যটনের বিরোধী নয়, কিন্তু এই মুহূর্তে বাঘিনীর নিরাপত্তা ও সুস্থতাই অগ্রাধিকার।

অর্থাৎ বন দফতরের যুক্তি, “পর্যটন বন্ধ করাই লক্ষ্য” নয়, বরং নির্দিষ্ট সংরক্ষণ পরিস্থিতিতে সাময়িক নিয়ন্ত্রণ জরুরি”—এই অবস্থানেই দাঁড়িয়ে।

বাঘ‌ও বাঁচুক, মানুষ‌ও বাঁচুক

এই যুক্তি মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকেই যায়—সাময়িক বিধিনিষেধের অর্থনৈতিক অভিঘাতের দায় কে নেবে? বিশেষত যখন বক্সার পর্যটন ব্যবস্থা বর্ষাকালে দীর্ঘ সময় এমনিতেই বন্ধ থাকে, তখন পুজোর মরশুমে আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের উপর কতটা চাপ তৈরি করছে, তার মূল্যায়ন কি করা হয়েছে?

প্রকাশিত সরকারি সংরক্ষণ মূল্যায়নেও বক্সায় ‘কমিউনিটি পার্টিসিপেশন, ইকো-ডেভেলপমেন্ট এবং স্থানীয় অংশগ্রহণকে আরও শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত হয়েছে। সুতরাং বিতর্কটি হওয়া উচিত নয়—“বাঘ না মানুষ?” প্রকৃত প্রশ্ন হওয়া উচিত—“বাঘ এবং মানুষ—দুজনকেই কীভাবে বাঁচানো যায়?” প্রশাসনের সামনে এখন এটাই বড় পরীক্ষা।

আন্দোলনকারীদের অভিযোগের যেমন উত্তর প্রয়োজন, তেমনই বন দফতরের বৈজ্ঞানিক যুক্তিও সাধারণ মানুষের কাছে স্পষ্টভাবে পৌঁছনো দরকার। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধানের বার্তা এসেছে। কোর এলাকা থেকে পুনর্বাসনের প্রয়োজন হলে তা আলোচনার ভিত্তিতে এবং স্বেচ্ছাসম্মতভাবে করার কথাও প্রকাশ্যে এসেছে। তাই এখন দরকার মুখোমুখি সংঘাত নয়—টেবিলে বসে সমাধান।

বক্সায় বাঘ পুনঃপ্রবর্তন নিঃসন্দেহে একটি বড় সংরক্ষণ উদ্যোগ। কিন্তু এই প্রকল্পের সাফল্য শুধু জঙ্গলে বাঘের উপস্থিতি দিয়ে মাপা যাবে না। সাফল্য তখনই, যখন— বাঘ নিরাপদ থাকবে, বন সুরক্ষিত থাকবে, পর্যটন টেকসই হবে এবং বক্সার মানুষ নিজের ভিটে ও জীবিকার নিরাপত্তা নিয়ে বাঁচতে পারবেন। রাজাভাতখাওয়ার আন্দোলন তাই প্রশাসনের কাছে কেবল একটি প্রতিবাদ নয়—এটি একটি সতর্কবার্তা। বক্সায় বাঘ ফিরেছে। এবার মানুষের আস্থাটাও ফিরিয়ে আনার পালা।

Feature image: Arun Kumar.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com