বিশেষ প্রতিবেদন: বাংলাদেশের ইসলামিক জঙ্গিরা পশ্চিমবঙ্গ, অসম এবং ত্রিপুরাতে ফের নতুন করে নেটওয়ার্ক তৈরি করতে তৎপর। শেখ হাসিনার আমলে দুই দেশের গোয়েন্দাবাহিনীর মধ্যে সমন্বয় ও যৌথ নজরদারির কারণে জঙ্গিদের কার্যকলাপ নিয়ন্ত্রণে ছিল। চব্বিশের ৫ আগস্ট হাসিনা সরকারের পতনের পর বিভিন্ন মামলায় আটক জঙ্গিদের জেল থেকে ছেড়ে দেয় মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশাসন। এবং ইউনূস সরকারের আস্কারায় জামাত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকত-উল-মুজাহিদিন এবং আনসারুল্লাহ বাংলা সহ বিভিন্ন মৌলবাদী ও জঙ্গি সংগঠন ফের বাংলাদেশে গাঝাড়া দিয়ে ওঠার সুযোগ পায়।
৩ রাজ্যের ১৬ জায়গায় এনআইএ-র হানা
বাংলাদেশের পুনর্গঠিত জঙ্গিগোষ্ঠীগুলি যে অসম, বাংলা ও ত্রিপুরাতেও গোপনে জাল বিস্তারে ব্যস্ত, এই তথ্য হাতে আসার পরেই সক্রিয় হয়ে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা বা এনআইএ। মঙ্গলবার অসম, কেরলম এবং পশ্চিমবঙ্গের ১৬টি জায়গায় হানা দিয়ে মোট ১৩ জন জঙ্গিকে গ্রেফাতার করেছে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা। ধৃতদের মধ্যে রাজ্যের বাসিন্দা চারজন। মঙ্গলকোটের পালিশগ্রাম থেকে পিয়ার মহম্মদ শেখ, বছবজের মিঠাপুকুর থেকে জুম্মান শেখ, বলরামপুর থেকে শাহরুল পুরকায়েত এবং নরেন্দ্রপুরের কুসুম্বা থেকে আবদূল রফিককে গ্রেফতার করা হয়েছে।

যাদের গ্রেফতার করা হয়েছে, তারা বাংলাদেশে নবগঠিত জঙ্গি সংগঠন ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’-র সদস্য বলে এনআইএ সূত্রে জানা গেছে। গোষ্ঠীটির নেতার নাম জুয়েল মাহমুদ ওরফে জুয়েল আলি, অনুগামীদের কাছে তিনি ইমাম মাহমুদুর নামেও পরিচিত। ৩১ বছরের জুয়েল আলি মায়োপ্যাথি রোগে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বাংলাদেশের নাটোরের বাগাতিপাড়ার উত্তর গাঁওপাড়া গ্রামের এক অস্বচ্ছল পরিবারে জুয়েলের জন্ম। গ্রামের মাদ্রাসাতে প্রাথমিক শিক্ষা। যতদূর জানা যায়, এই জঙ্গিনেতার পড়ালেখা নাইন-টেনের বেশি এগোয় নি। সবথেকে উদ্বেগের বিষয়, এর সঙ্গে জামাতের যোগ রয়েছে। জামাতের ছাত্র সংগঠন ইসলামি ছাত্র শিবিরের সদস্যতা ছেড়ে পরবর্তীকালে জঙ্গি সংগঠন জেএমবি-তে যোগ দিয়েছিলেন তিনি।
জঙ্গিদের জেল থেকে ছাড়ার পিছনে আসিফ নজরুল!
জঙ্গি কার্যকলাপে যুক্ত থাকার অভিযোগে হাসিনার আমলে গ্রেফতার হয়ে জেলে ছিলেন জুয়েল মাহমুদ ওরফে জুয়েল আলি। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে কারাবন্দি অনেক জঙ্গিকে বাছবিচার না করেই জামিনে ছেড়ে দেয় মুহাম্মদ ইউনূসের সরকার। জুয়েল মাহমুদও জামিনে ছাড়া পেয়ে ফের জঙ্গি কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন। তার নতুন সংগঠনের নাম হয় ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’। ইউনূসের আমলে জেল থেকে জঙ্গিদের ছেড়ে দেওয়ার পিছনে সবথেকে বড় ভূমিকা ছিল আসিফ নজরুলের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনের অধ্যাপক আসিফ নজরুল ছিলেন ইউনূস সরকারের আইন উপদেষ্টা। কট্টর ভারতবিরোধী আসিফের পরামর্শেই ইউনূস জঙ্গিদের জেল থেকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে অভিযোগ।
বৈধ পথে বাংলাদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ জঙ্গিদের
জেএমবি-র সঙ্গে আল-কায়েদার একটা যোগাযোগ ছিল। জুয়েল ছিলেন জেএমবির সদস্য। জেল থেকে বেরিয়েই পুরোনো সংগঠনের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে নতুন করে নেটওয়ার্ক গড়ে তোলায় মনোযোগ দেন জুয়েল আলি। টেলিগ্রাম অ্যাপে ‘পূর্ব আকাশ’ নামে একটি গ্রুপ গঠন করে বাংলাদেশ এমনকি ভারত থেকে সদস্য সংগ্রহের কাজ শুরু করে এই জিহাদি সংগঠন। অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরলমের বিভিন্ন জায়গায় হানা দিয়ে যে ১৩ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে, তাদের জেরা করে বিস্ফোরক তথ্য হাতে পেয়েছেন এনআইএ-গোয়েন্দারা। ভারত থেকে যারা ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’-য় যোগ দিয়েছে, তাদের অনেকেই পাসপোর্ট বানিয়ে বৈধপথে ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে ফিরে এসেছে।

সিলেটের মৌলভীবাজারের পার্বত্য এলাকায় জঙ্গি গোষ্ঠীটির প্রশিক্ষণ শিবির রয়েছে। মেঘালয়ের তামাবিল স্থলসীমান্ত দিয়ে বৈধ পথে সিলেটে পৌঁছে তারা শিবিরটিতে প্রশিক্ষণ নিয়েছে বলে ধৃতদের কয়েকজন জেরায় স্বীকার করেছে। এনআইএ-র গোয়েন্দাদের সন্দেহ, ‘পূর্ব আকাশ’ টেলিগ্রাম গ্রুপের সদস্যরা ভারতে বড়সড় নাশকতার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত। ধৃতরা অস্ত্র ও বিস্ফোরক সংগ্রহের কাজে যু্ক্ত ছিল। ৯ জন বাংলাদেশী নাগরিকও ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে অনুপ্রবেশ করে নিষিদ্ধ সংগঠনের কাজ দেখভাল করছিল। ধরপাকড়ের সংবাদ কানে যাওয়া মাত্রই ৯ বাংলাদেশী জঙ্গি সহ ১০ জন গাঢাকা দিয়েছে বলে জানা গেছে।
তিন রাজ্য থেকে ধৃত সন্দেহভাজন জঙ্গিদের গুয়াহাটিতে এনে জেরা করা হবে। বজবজ থেকে ধৃত জুম্মান শেখ সহ চারজনকে কলকাতার এনআইএ আদালতে পেশ করার পর তাদের ট্রানজিট রিমান্ড মঞ্জুর করেন বিচারক। ধৃতদের আরও জেরা করার পর স্পষ্ট হবে, ভারতে ‘ইমাম মাহমুদুরের কাফেলা’-র জাল কতদূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে এবং আরও কতজন এই জঙ্গি গোষ্ঠীতে নাম লিখিয়েছে।
Disclaimer: AI generated graphic is representational.