বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে যেভাবে জেলেই চরম শাস্তি দিলেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু

বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে যেভাবে জেলেই চরম শাস্তি দিলেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু


রিভলবারের সবকটা গুলি নরেনের উপর খরচ করে বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু নিশ্চিত করে তবেই থামলেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত… সেই রোমহর্ষক কাহিনি শোনালেন উত্তম দেব

ছেলের মাত্র বিশ বছর বয়স! ইংরেজের আদালতে হুকুম হয়েছে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করতে হবে তাকে। কিন্তু ছেলের প্রাণে একরত্তি ভয় নেই। ফাঁসীর তিন দিন আগে আসামীর ওজন মাপতে এলেন জেলের ডাক্তারবাবু। তে রাত্তির গেলে যার ফাঁসি, তার ওজন বেড়েছে ১৬ পাউন্ড।‌ ডাক্তারবাবুর চোখ কপালে। কনডেম সেলের মৃত্যু পথযাত্রীর‌ও ওজন বাড়ে! বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত। আলিপুর বোমা মামলায় ধৃত ৩৭ জন বিপ্লবীর একজন।

১৯০৮ সালের মে মাসে ঐতিহাসিক আলিপুর বোমা মামলাতেই গ্রেফতার হয়েছিলেন ঋষি অরবিন্দ ঘোষ, বারীন্দ্রকুমার ঘোষ, উল্লাসকর দত্ত, উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, হেমচন্দ্র কানুনগো ও সত্যেন্দ্রনাথ বসুর মতো অগ্নিযুগের মহান বিপ্লবীরা। তাঁরা সবাই বন্দি ছিলেন আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। ইংরেজের দাসত্ব থেকে মুক্ত করতে হবে দেশমাকে। তাই অগ্নিযুগে হাতে অস্ত্র ধরেছিলেন অনুশীলন সমিতির এই বিপ্লবীরা।

বিপ্লবের পথে ফুল নয় কাঁটা বিছানো। বিপ্লবীর পাওনা জেল, ফাঁসি, দ্বীপান্তর। বিপ্লবীদের দলে যেমন কানাইলালের মতো‌ অগ্নিশুদ্ধ পুরুষ ছিলেন, তেমনি ছিল নরেন গোঁসাইয়ের মতো বিশ্বাসঘাতক‌ও। আর বিপ্লবীদের বিধানে বিশ্বাসঘাতকতার একটিই দন্ড- মৃত্যু! জেলের ভেতরেই নরেন গোঁসাইকে যমের দক্ষিণ দুয়ারে পাঠিয়েছিলেন দুই বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত এবং সত্যেন্দ্রনাথ বসু। সেই গল্প‌ই শোনাবো।

রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাইকে হত্যার পর ধৃত কানাইলাল দত্ত (বাম দিক থেকে দ্বিতীয়) ও সত্যেন্দ্রনাথ বসু (বাম দিক থেকে চতুর্থ)। সংগৃহীত ফটো।

শ্রীরামপুরের গোস্বামী বাড়ির ছেলে‌ নরেন গোস্বামী। নরেন‌ও নাম লিখিয়েছিল বিপ্লবীদের দলে। আলিপুর বোমা মামলায় তাকেও গ্রেফতার করেছিল পুলিশ। অরবিন্দ-বারীন-উল্লাসকরদের সঙ্গে সেও বন্দি ছিল আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে। কিন্তু সবাই কি আর জেলের যন্ত্রণা, পুলিশের অত্যাচার স‌ইতে পারে। একদিন ভেঙে পড়ল নরেন গোঁসাই। রাজসাক্ষী হয়ে গেল নরেন। রাজসাক্ষী হলে জেলখানা থেকে দ্রুত মুক্তি মিলবে, এই লোভে শপথ ও মন্ত্রগুপ্তি ভুলে দলের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করল সে।

ব্রিটিশ পুলিশের কাছে অনুশীলন সমিতির সব গোপন কথা ফাঁস করে দিল নরেন‌ গোঁসাই। ৩৭ জন জেলবন্দি বিপ্লবীর মধ্যে মাত্র একজন বিশ্বাসঘাতক! রাজসাক্ষী নরেনকে বাকি বিপ্লবীদের থেকে আলাদা করে দিল জেল কর্তৃপক্ষ। তার স্থান হল জেলের হাসপাতালে।‌ পাছে বিপ্লবীরা নরেনের ক্ষতি করে, এই ভয়ে তাকে পাহারা দিতে লাগল ইউরোপীয় প্রহরীরা।

কিন্তু বিশ্বাসঘাতক নরেনকে যে বধিবে বলে নীরবে সঙ্কল্প করেছে, সে বসে থাকল না। কানাইলাল দত্ত। চন্দননগরের ছেলে। হুগলি মহসিন কলেজ থেকে স্নাতক উত্তীর্ণ। দেশের জন্য প্রাণ বিসর্জন দেবো- এই প্রতিজ্ঞা করেই ঘরের সুখ ছেড়ে অনুশীলন সমিতিতে নাম লিখিয়ে ছিলেন কানাইলাল। কানাইলাল ঠিক করলেন, বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাইকে যে করেই হোক চরম শিক্ষা দিতে হবে। তাঁর সঙ্গে হাত মেলালেন আরেক অকুতোভয় বিপ্লবী মেদিনীপুরের ছেলে সত্যেন্দ্রনাথ বসু।

বিপ্লবী সত্যেন্দ্রনাথ বসু। ১৮৮২ সালের ৩০ জুলাই মেদিনীপুরে সত্যেন্দ্রনাথের জন্ম। সংগৃহীত ফটো।

আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি বাকি বিপ্লবী সহযোদ্ধাদের কাছে পরিকল্পনা গোপন রাখলেন কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ। গোপন ব্যাপারটি জানতেন কেবল আরেক দুর্ধর্ষ বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো- অনুশীলন সমিতির ছেলেদের প্রিয় হেমদা। রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাই জেলের হাসপাতাল শুয়ে বসে দিন কাটায়। ভালমন্দ খায়। তাকে পাহারা দেয় জেলের ইউরোপীয় রক্ষীরা। কানাইলাল বুঝলেন, নরেনকে যমের দুয়ারে পাঠাতে চাইলে যে করেই হোক জেলের হাসপাতালে জায়গা করে নিতে হবে। পেটের অসুখের বাহানা ধরলেন কানাইলাল। জেলের ডাক্তার তাকে হাসপাতালে পাঠিয়ে দিলেন।

সত্যেন্দ্রনাথের ছিল কাশরোগ। তিনি আগে থেকেই জেল হাসপাতালে ভর্তি ছিলেন। দু’জনে মিলে শলা করলেন, কীভাবে নরেন গোঁসাইকে হাতের নাগালে পাওয়া যায়। সত্যেন ও কানাইলাল একদিন জেলারকে বললেন, “আমরাও রাজসাক্ষী হতে চাই, সাহেব। নরেনের সঙ্গে দেখা করিয়ে দিন।” জেলার টোপ গিললেন। নরেন গোঁসাইয়ের সঙ্গে দু’জনের যোগাযোগ হল। চলল ঘন ঘন দেখাসাক্ষাৎ। কারারক্ষীরা ঘুণাক্ষরেও আঁচ‌ করতে পারল না, কী ভয়ঙ্কর কান্ড ঘটাতে চলেছেন কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ!

১৯০৮ সালের ৩১ অগস্ট সকালে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে সেই ভয়ঙ্কর ঘটনাটি ঘটেই গেল। জেল হাসপাতালে সত্যেন্দ্রনাথ বসুর বেডে গল্প করতে এল রাজসাক্ষী নরেন গোঁসাই। পাশে নজর রাখছে একজন ইউরোপীয় প্রহরী। কথা বলতে বলতেই তোষকের তলা থেকে রিভলবার বের করে নরেন গোঁসাইকে গুলি করে দিলেন সত্যেন। গুলি লাগল গিয়ে নরেনের বাম পায়ে। প্রাণ ভয়ে পালাচ্ছে নরেন গোঁসাই। কিন্তু বিশ্বাসঘাতক পালাবে কোথায়! কানাইলাল যে বাঘের মতোই হাসপাতালের নিচের তলায় ওত পেতে বসে আছেন।

খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নরেন গোঁসাই ছুটছে।‌ পেছনে ধাওয়া করছেন সাক্ষাৎ যমরূপী কানাইলাল। ডান হাতে তাঁর উদ্যত রিভলবার। নল থেকে ছুটছে তপ্ত বুলেট। দ্রিম দ্রিম দ্রিম! কানাইলালের রুদ্রমূর্তি দেখে সেপাই-সান্ত্রী থেকে জেলার- সবাই তখন চাচা আপন প্রাণ বাঁচা। গুলি খেতে খেতে নরেন গোঁসাই উপুড় হয়ে পড়ল গিয়ে জেল কারখানার গেটের ঠিক সামনে। রিভলবারের সবকটা গুলি নরেনের উপর খরচ করে বিশ্বাসঘাতকের মৃত্যু নিশ্চিত করে তবেই থামলেন বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত।

আলিপুর বোমার মামলার অন্যতম আসামী বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের চোখে ঘটনা যা দেখেছেন, ‘নির্বাসিতের আত্মকথা’-য় তা বর্ণনা করেছেন- “কানাই হাসপাতালে যাইবার তিন চারি দিন পরেই, একদিন সকালবেলা বিছানা হ‌ইতে উঠিয়া আমরা মুখ-হাত ধুইতেছি, এমন সময় হাসপাতালের দিক হ‌ইতে দুই একটা বন্দুকের মতো আওয়াজ শুনিলাম। কিছুক্ষণ পরে দেখিলাম, চারিদিক হ‌ইতে কয়েদী পাহারাওয়ালারা হাসপাতালের দিকে ছুটিতেছে। ব্যাপার কি? কেহ বলিল, বাহির হ‌ইতে হাসপাতালের উপর গোলা পড়িতেছে, কেহ বলিল, সিপাহিরা গুলি চালাইতেছে। হাসপাতালের একজন কম্পাউন্ডার ঘুরপাক খাইতে খাইতে ছুটিয়া আসিয়া জেলের অফিসের কাছে শুইয়া পড়িল। ভয়ে তাহার মুখ বিবর্ণ হ‌ইয়া গিয়াছে। যে সংবাদ দিবার জন্য সে ছুটিয়া আসিয়াছিল, তাহা তাহার পেটের মধ্যেই রহিয়া গেল। প্রায় দশ-পনের মিনিট এইরূপ উৎকণ্ঠায় কাটিল, শেষে একটা পুরানো চোর আসিয়া আমাদের সংবাদ দিল-
‘নরেন গোঁসাই ঠান্ডা হয়ে গেছে!’
‘ঠান্ডা হয়ে গেছে কি রে?’
‘আজ্ঞে হ্যাঁ বাবু; কানাইবাবু তাকে পিস্তল দিয়ে ঠান্ডা করে দিয়েছে। ঐ দেখুন গে না- কারখানার সুমুখে সে একদম লম্বা হয়ে পড়েছে। আর জেলার বাবুর‌ও আর একটু হলে হয়ে যেত। তিনি কারখানায় ঢুকে পড়ে বেঞ্চির তলায় লুকিয়ে খুব প্রাণটা বাঁচিয়েছেন।”

আলিপুর সেন্ট্রাল জেল। প্রহরীদের নজর এড়িয়ে জেলের ফটক পেরিয়ে পাখি গলার জো নেই। কিন্তু কীভাবে ঢুকল দু-দুটি লোডেড রিভলবার? আসলে জেলে‌ বসেই কলকাঠি নেড়েছিলেন হেমচন্দ্র কানুনগো। রক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে বাইরে থেকে গুলি ভরা দুটি রিভলবার জেলের ভেতরে পাচার করেছিলেন অনুশীলন সমিতির দুই বিপ্লবী শ্রীশচন্দ্র ঘোষ ও সুধাংশুজীবন রায়। ঘটনার তদন্তে নেমে তল পান নি ব্রিটিশ পুলিশের ঘাঘু গোয়েন্দারা।‌ হাজতে শত নিপীড়নেও মুখ খোলেন নি কানাইলাল ও সত্যেন্দ্রনাথ। আদালতে শ্বেতাঙ্গ বিচারক দু’জনকে প্রশ্ন করেন, কে দিয়েছিল তোমাদের আগ্নেয়াস্ত্র? কানাইলাল হেসে জবাব দেন, ক্ষুদিরামের ভূত!

বিপ্লবী কানাইলাল দত্ত। ১৮৮৮ সালের ৩০ অগস্ট চন্দননগরে জন্মাষ্টমী তিথিতে কানাইলালের জন্ম। সংগৃহীত ফটো।

জন্মাষ্টমীর দিন জন্ম কানাইলাল দত্তের। গীতা ছিল তাঁর কন্ঠস্থ। নরেন গোঁসাইকে হত্যা করার পর না ছিল তাঁর অনুতাপ, না ছিল তাঁর ভয়। মৃত্যু ভয়কে জয় করেই যেন ধরায় এসেছিলেন কানাইলাল। নিম্ন আদালতে ফাঁসির আদেশ হলে উচ্চ আদালতে আপিল করতে নিষেধ করেন আত্মীয়দের। ফাঁসির দিন যতই ঘনিয়ে আসতে লাগল, তত‌ই উৎফুল্ল হতে থাকল কানাইলালের মুখ। এক চিলতে কনডেম সেলের অন্ধকারে দিনরাত বন্দী। তারপরেও কানাইয়ের রুগ্ন স্বাস্থ্য ভাল হল। দেহের ওজন বাড়ল ১৬ পাউন্ড!

কীভাবে সম্ভব রক্তমাংসের শরীরে এমন অলৌকিক? জেলের ইউরোপীয় অফিসারেরা কানাইলালকে দেখে তাজ্জব বনে গেলেন। ইনি মানুষ না দেবতা! ১৯০৮ সালের ১০ নভেম্বর ভোরে আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের ফাঁসি হল।

বিপ্লবী কানাইলাল দত্তের মরদেহ। কানাইলালের শেষ যাত্রায় কলকাতায় মানুষের ঢল নেমেছিল। সংগৃহীত ফটো।

‘নির্বাসিতের আত্মকথা’-য় বিপ্লবী উপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় সে দিনের দৃশ্য লিপিবদ্ধ করেছেন, “তাহার পর একদিন প্রভাতে কানাইলালের ফাঁসি হ‌ইয়া গেল। ইংরেজশাসিত ভারতে তাহার স্থান হ‌ইল না। না হ‌ইবার‌ই কথা। কিন্তু ফাঁসির সময় তাহার নির্ভীক, প্রশান্ত ও হাস্যময় মুখশ্রী দেখিয়া জেলের কর্তৃপক্ষ বেশ একটু ভ্যাবাচ্যাকা হইয়া গেলেন। একজন ইউরোপীয় প্রহরী আসিয়া চুপি চুপি বারীনকে জিজ্ঞাসা করিল- ‘তোমাদের হাতে এ রকম ছেলে আর কতগুলি আছে?’ যে উন্মত্ত জনসঙ্ঘ কালীঘাটের শ্মশানে কানাইলালের চিতার উপর পুষ্পবৃষ্টি করিতে ছুটিয়া আসিল, তাহারাই প্রমাণ করিয়া দিল যে, কানাইলাল মরিয়াও মরে নাই।”

Feature graphic is representational and AI generated.

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *