উত্তরবঙ্গ মানেই বৈচিত্র্যময় প্রকৃতি ও বহু সংস্কৃতির মিলনমেলা। পরিবেশ ও স্থানীয় সংস্কৃতিকে আহত না করলেই বরং এখানে
পর্যটন শিল্পের আরও উন্নতি সম্ভব। লিখলেন অরুণ কুমার–
রাজ্যে নতুন সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভার সম্প্রসারণ হয়েছে। পর্যটন দফতরের দায়িত্ব পেয়েছেন উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার শিলিগুড়ির একজন প্রতিনিধি। ফলে উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বেড়েছে। কারণ, এই অঞ্চলের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক উন্নয়নের সঙ্গে পর্যটন শিল্প আজ ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে।
গত এক দশকে উত্তরবঙ্গ দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। মালদার ঐতিহাসিক গৌড়-আদিনা থেকে শুরু করে দার্জিলিংয়ের পাহাড়, ডুয়ার্সের জলদাপাড়া ও লাটাগুড়ি, কোচবিহার রাজবাড়ি কিংবা কালিম্পং—সব ক্ষেত্রেই পর্যটকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলির পাশাপাশি বহু অফবিট ডেস্টিনেশনও ধীরে ধীরে পর্যটকদের নজর কাড়তে শুরু করেছে।
তবে এই উজ্জ্বল ছবির আড়ালে কিছু বাস্তব সমস্যাও রয়েছে, যেগুলি সমাধান না হলে উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না।
সম্প্রতি উত্তরকন্যায় রাজ্যের অর্থমন্ত্রী, উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী, পর্যটন মন্ত্রীসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন মন্ত্রী এবং পর্যটন শিল্পের প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে উত্তরবঙ্গকে আরও পর্যটকবান্ধব করে তুলতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, আগামী উৎসব মরসুমে পর্যটকদের জন্য কীভাবে উন্নত পরিষেবা নিশ্চিত করা যায় এবং এই শিল্পের সামনে থাকা প্রতিবন্ধকতাগুলি কীভাবে দূর করা সম্ভব—সেসব বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।

পর্যটন বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরবঙ্গের পর্যটনের প্রধান সমস্যাগুলির মধ্যে অন্যতম হল অবকাঠামোগত ঘাটতি। এখনও অনেক পর্যটন কেন্দ্রে উন্নত রাস্তাঘাট, নির্ভরযোগ্য পরিবহণ, পর্যাপ্ত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার এবং মানসম্পন্ন আবাসনের অভাব রয়েছে। এসব কারণে অনেক পর্যটকের অভিজ্ঞতা প্রত্যাশামাফিক হয় না।
পরিবেশগত চ্যালেঞ্জও একটি বড় উদ্বেগের বিষয়। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেক এলাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বনাঞ্চল ও পাহাড়ি অঞ্চলে প্লাস্টিক, খাবারের প্যাকেট ও পানীয় জলের বোতল ফেলে রাখার প্রবণতা পরিবেশের ক্ষতি করছে। প্রকৃতি-নির্ভর পর্যটনের ভবিষ্যৎ রক্ষার জন্য এই প্রবণতা রোধ করা অত্যন্ত জরুরি।
উত্তরবঙ্গের আরেকটি বড় সম্পদ হল তার বহুমাত্রিক সংস্কৃতি। আটটি জেলার ভাষা, লোকসংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক-পরিচ্ছদ এবং ঐতিহ্য এই অঞ্চলকে অনন্য পরিচয় দিয়েছে। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, পর্যটকরা এই ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হবেন। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে পর্যটকদের অসচেতন আচরণ স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষের জন্ম দেয়, যা দীর্ঘমেয়াদে পর্যটনের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

পরিষেবা ব্যবস্থার উন্নয়নও সময়ের দাবি। পরিশ্রুত পানীয় জল, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং মানসম্পন্ন খাদ্য পরিষেবা এখনও অনেক ক্ষেত্রে নিশ্চিত করা যায়নি। একইসঙ্গে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত কর্মীদের প্রশিক্ষণ, আতিথেয়তা এবং পেশাদারিত্বের উন্নয়ন অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। পর্যটকবান্ধব মানসিকতা যেমন পরিষেবা প্রদানকারীদের মধ্যে গড়ে তুলতে হবে, তেমনি দায়িত্বশীল পর্যটক সংস্কৃতিও বিকশিত করতে হবে।
পর্যটন মরসুমে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ করাও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক জনপ্রিয় গন্তব্যে পর্যটকের চাপ এতটাই বেড়ে যায় যে স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হয় এবং পর্যটন অভিজ্ঞতার মান কমে যায়। তাই উন্নত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, ডিজিটাল বুকিং ব্যবস্থা, পর্যটক প্রবাহের সুষ্ঠু নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত পরিষেবা নিশ্চিত করার উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

উত্তরবঙ্গের ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও সবসময় বিদ্যমান। পাহাড়ে ভূমিধস, সমতলে বন্যা কিংবা নদীভাঙন পর্যটনকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই দুর্যোগ মোকাবিলায় আগাম প্রস্তুতি, দক্ষ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম গঠন এবং পর্যটক উদ্ধারকাজে নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও এনজিওগুলিকে সরকারি স্বীকৃতি ও সহায়তা দেওয়া সময়ের দাবি।
এই প্রসঙ্গে উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত সম্রাট সান্যাল, রাজ সপ্রতিম বসু, রামকুমার লামা, বিমল রাভা, পদম গুরুং, জাঙ্গু লেপচা, কেশর তামাং, রাজীব শাহী, কৌশিক রায়, নীলিমা তামাং, সুরেশ ঠাকুরী, সিবেস্টিয়ান প্রধান, রাজ সিং ভুজেল, সব্যসাচী রায়-সহ বহু অভিজ্ঞ পর্যটনকর্মীর মতামত ও পর্যবেক্ষণ এই আলোচনাকে সমৃদ্ধ করেছে। তাঁদের অভিজ্ঞতার সারাংশই মূলত এই নিবন্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
সবশেষে বলা যায়, উত্তরবঙ্গের পর্যটন শিল্পের সম্ভাবনা অপরিসীম। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক ঐতিহ্য, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং মানুষের আন্তরিকতা—সব মিলিয়ে এই অঞ্চল আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার যোগ্যতা রাখে। কিন্তু সেই লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে সরকার, বেসরকারি উদ্যোগ, স্থানীয় মানুষ এবং পর্যটকদের সমন্বিত প্রচেষ্টা অপরিহার্য।
নতুন সরকারের কাছে উত্তরবঙ্গের মানুষের প্রত্যাশা একটাই—পর্যটনকে শুধুমাত্র রাজস্ব আয়ের উৎস হিসেবে নয়, বরং টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবেশ সংরক্ষণের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তোলা হোক। তাহলেই উত্তরবঙ্গ সত্যিকার অর্থে দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।
Feature image and all other images were captured by the author.:
