অনন্ত মহারাজ থুরি নগেন্দ্র রায়ের অবাধ্যতায় আগে থেকেই অসন্তুষ্ট বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নেতাজিকে নিয়ে কুকথার পর দলে আরও একঘরে নগেন্দ্র। বিস্তারিত বিশেষ প্রতিবেদনে—
এই মুহূর্তে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে সবচেয়ে বিতর্কিত মুখ নিঃসন্দেহে অনন্ত মহারাজ। ৬৭ বছর বয়স্ক রাজবংশী সম্প্রদায়ের এই নেতা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত রাজ্যসভার সাংসদ। ২০২৩ সালের আগস্টে অনন্তকে রাজ্যসভায় পাঠায় বিজেপি। অনুগামীরা তাঁকে অনন্ত মহারাজ নামে ডাকলেও তাঁর আসল নাম নগেন্দ্র রায়। নগেন্দ্রই অনন্ত মহারাজের ‘অফিসিয়াল নেম’। কোচবিহারের সিতাই এলকার বাসিন্দা নগেন্দ্র রায়ের বাবার নাম গগেন্দ্র রায়। বিজেপিতে যোগ দিয়ে নগেন্দ্র সাংসদ পদ বাগিয়ে নিলেও তাঁর নিজের দলের নাম— গ্রেটার কোচবিহার ডেমোক্রেটিক পার্টি।
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু সম্পর্কে কুকথা বলে অনন্ত মহারাজ থুরি নগেন্দ্র রায় বাংলার রাজনীতিতে সম্প্রতি চাঞ্চল্য ফেলে দিয়েছেন। নেতাজিকে নিয়ে দলের সাংসদের চরম আপত্তিকর মন্তব্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই অস্বস্তিতে বিজেপি নেতৃত্ব। উত্তরবঙ্গের বিশেষ করে কোচবিহার জেলার রাজবংশী জনগোষ্ঠীর মধ্যে নগেন্দ্র রায়ের কিছুটা জনভিত্তি আছে। ২০১৯-এর লোকসভা নির্বাচন থেকেই উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের ভোট একচেটিয়া পদ্মের ঘরে পড়ছে। ভোটব্যাঙ্কের দিকে তাকিয়ে অনন্ত থুরি নগেন্দ্রর বিরুদ্ধে বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব কঠোর পদক্ষেপ করতে না পারলেও তাঁকে যে দলের ভেতরে একঘরে করে ফেলা হয়েছে সেটা পরিষ্কার।
বিজেপির সাংসদ হয়ে বিজেপির সঙ্গেই দুষমনি!
নেতাজিকে নিয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে কুরুচিকর মন্তব্য করার অনেক আগে থেকেই অবশ্য বিজেপির ভেতরে অনন্তের অবস্থা বেশ নড়বড়ে হয়ে পড়েছিল। রাজনীতিতে নগেন্দ্র রায় কখনওই বিশ্বস্ততার পরিচয় দেন নি। বিজেপি তাঁকে রাজ্যসভায় পাঠানোর পরেও অনন্ত মহারাজ মমতার সঙ্গে মাখামাখি বন্ধ করেন নি। ২০২৪-এর জুনে অনন্তের চকচকার প্রাসাদোপম বাসভবনে তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আমন্ত্রিত ছিলেন। মমতাকে রাজবংশীয় উত্তরীয় পরিয়ে স্বাগত জানিয়েছিলেন বিজেপির সাংসদ নগেন্দ্র রায়। একটা সময় কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের সঙ্গে যথেষ্ট হৃদ্যতাপূর্ণ সম্পর্ক ছিল অনন্ত মহারাজ থুরি নগেন্দ্র রায়ের। নগেন্দ্রর এই দোগলাবাজি ভালভাবে নেন নি শাহ।

২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের সময়েই দলের ভেতরে অন্তর্ঘাতের অভিযোগ উঠেছিল নগেন্দ্র রায়ের বিরুদ্ধে। এক দলে থেকেও বিজেপির আরেক রাজবংশী নেতা তথা রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিকের সঙ্গে নগেন্দ্রর মুখ দেখাদেখি প্রায় বন্ধ। কোচবিহার আসনে নিশীথকে হারাতে নেপথ্যে থেকে ষড়যন্ত্র করেছিলেন অনন্ত মহারাজ— এমনই অভিযোগ নিশীথ শিবিরের। অভিযোগের পক্ষে যথেষ্ট প্রমাণও ছিল তাদের হাতে। দলের সাংসদ হয়েও নির্বাচনে দলের প্রার্থীর বিরুদ্ধে নগেন্দ্রর এই অন্তর্ঘাতে চরম ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন অমিত শাহ সহ কেন্দ্রীয় বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। নগেন্দ্রর হাতে থাকা রাজবংশী ভোটের দিকে তাকিয়ে নগেন্দ্রর দলবিরোধী কাজ মুখ বুজে এতদিন সহ্য করেছেন বিজেপি নেতৃত্ব।
বিধানসভা ভোটের সময়ও দুই নৌকায় পা
বিজেপির মতো সংগঠিত দলে পার্টি লাইন ও পার্টির নির্দেশই শেষ কথা। বিজেপিতে যোগ দিয়ে সাংসদ হওয়ার পরেও পার্টির নির্দেশ ও পার্টির লাইনের প্রতি আনুগত্য দেখান নি ঘাড়ত্যাড়া নগেন্দ্র রায়। ২০২৩-এর আগস্টে রাজ্যসভার দ্বিবার্ষিক নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ থেকে একজনকে সংসদের উচ্চকক্ষে পাঠানোর মতো যথেষ্ট সংখ্যক বিধায়ক ছিল রাজ্য বিজেপির হাতে। বাংলায় দলের ভেতরে একাধিক যোগ্য মুখ ও দাবিদার থাকার পরেও রাজবংশী ভোটব্যাঙ্কের কথা মাথায় রেখে অনন্ত মহারাজকেই মনোননয়ন দিয়েছিলেন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। শোনা যায় যে রাজ্যসভার টিকিট নিশ্চিত করতে দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে চাপের মধ্যে রেখেছিলেন নগেন্দ্র রায়। অথচ রাজ্যসভার সাংসদ হওয়ার পরেও দল ও দলের নেতৃত্বের প্রতি কোনও কৃতজ্ঞতা দেখান নি অবাধ্য অনন্ত মহারাজ।

বিজেপির কর্মসূচি বাদ দিয়ে নিজের গ্রেটার কোচবিহার ডেমোক্রেটিক পার্টির কার্যক্রম নিয়েই বরাবর বেশি ব্যস্ত থাকেন নগেন্দ্র রায়। ২০২৬-এর ৪-মের আগের দিন পর্যন্ত মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলছিলেন অনন্ত মহারাজ— বিষয়টা বিজেপির ভেতরে ও বাইরে সবাই জানেন। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নগেন্দ্র রায়কে ‘বঙ্গবিভূষণ’ দিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। তাঁর হাতে পুরস্কার তুলে দিয়েছিলেন মমতা স্বয়ং। আসলে নিজের স্বার্থের জন্য তৃণমূল ও বিজেপি— দুই দলকেই যখন যেমন দরকার তেমন ব্যবহার করে নিয়েছেন অনন্ত মহারাজ। ভোটের ফল ঘোষণা পর্যন্ত অনন্তের অবাধ্যতা ও বেপরোয়া আচরণ সহ্য করে গেছেন বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব। আরএসএস-ও তাঁর উপর বিরক্ত। যতই দিন যাচ্ছে, নগেন্দ্রর সঙ্গে ততই দূরত্ব তৈরি করছে বিজেপি।
নগেন্দ্রকে আর পাত্তা দিচ্ছেন না অমিত শাহ
গত ১৭ জুলাই রাতে শিলিগুড়ি সফরে এসেছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। ১৮ জুলাই দিনভর একাধিক কর্মসূচি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন তিনি। অনন্ত মহারাজকে শাহের ধারেকাছে দেখা যায় নি। তিনি বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ। অথচ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ডাক পর্যন্ত নাকি পান নি! নগেন্দ্র রায়ের উপর এতটাই ক্ষুব্ধ অমিত শাহ। দলের মধ্যে তিনি একঘরে, শাহ আর পাত্তা দিচ্ছেন না, এটা বুঝতে পেরে আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন অনন্ত। অমিত শাহ ফিরতেই ক্ষেপে গিয়ে নগেন্দ্র সংবাদমাধ্যমের প্রতিনিধিদের বলেন, “বিজেপিকে তো পশ্চিমবঙ্গে আমি নিয়ে এসেছি। উত্তরবঙ্গেও আমি এনেছিলাম। এখন সরকার হয়েছে। কুত্তাকে পোছে, আমাকে পোছে না।”
নগেন্দ্রর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করেছেন রাজ্য বিজেপির নেতারা
উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী নিশীথ প্রামাণিক সাংবাদিকদের বলেছেন, “নেতাজিকে নিয়ে নগেন্দ্রর মন্তব্যের দায় নগেন্দ্রর নিজের, দলের সঙ্গে এই মন্তব্যের কোনও যোগ নেই।” নিশীথ আরও বলেন, “কর্ম অনুযায়ী যার যেটা ফল পাওয়ার সে সেটা পাবে।” অর্থাৎ নেতাজিকে নিয়ে করা নগেন্দ্রর মন্তব্যের ফল যে নগেন্দ্রকেই নিতে হবে, ইঙ্গিতে তা স্পষ্ট করে দেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী। নেতাজিকে নিয়ে নগেন্দ্রর কুকথার পর নগেন্দ্রর অনুগামীরা যে ভাষায় সামাজিক মাধ্যমে দেশনায়কের নামে কুৎসা করতে শুরু করেছে, তাতে রাজ্য বিজেপির নেতাদের ‘ধরণী দ্বিধা হও’ অবস্থা।

নেতাজির নামে সামান্য নেতিবাচক মন্তব্য শুনলেই বাঙালির পায়ের রক্ত মাথায় উঠে যায়। সেখানে অনন্ত মহারাজের সাঙ্গপাঙ্গরা যা শুরু করেছে, তাতে যে কোনও মুহূর্তে দাঙ্গা বেধে যাওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। নেতাজিকে নিয়ে অনন্ত মহারাজ যা কুৎসিত মন্তব্য করেছেন, তারপরে আর তাঁর সঙ্গে এক মঞ্চে বসা সম্ভব নয় বলে রাজ্য বিজেপির নেতারা একান্তে স্বীকার করেছেন।
এখন রাজ্যের সরকারটা বিজেপির। বিধানসভা কার্যত বিরোধীশূন্য। উত্তরবঙ্গ বিজেপির দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত। শুধু রাজবংশী জনগোষ্ঠীই নয় উত্তরবঙ্গের তরাই-ডুয়ার্সে এবং অন্যত্র সবকটি জনজাতি ঢেলে বিজেপিকে ভোট দিয়েছে। নেপালি জাতি অধ্যুষিত দার্জিলিং ও কালিম্পং পাহাড়ে বিজেপির সঙ্গে টক্কর দেওয়ার মতো কেউ নেই। উত্তরবঙ্গের বাঙালিহিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ৭০ শতাংশ ভোট পড়েছে পদ্ম প্রতীকে। নগেন্দ্র রায় ছাড়াও নিশীথ প্রামাণিক সহ একাধিক জনপ্রিয় রাজবংশী নেতা বিজেপির রয়েছে। তাঁরা বাস্তববাদী, দলের প্রতি অনুগত, সংগঠন গড়ায় দক্ষ এবং উচ্চশিক্ষিত।
বংশীবদন জেলে গেলেন আর নেতা হলেন নগেন্দ্র
কোচবিহারের রাজ পরিবারের সঙ্গে নগেন্দ্র রায়ের কোনও রক্তের সম্পর্ক নেই। ক্লাস এইটেই নগেন্দ্রর পড়ালেখায় ইতি। পেট চালাতে অসমের রিফাইনারিতে কাজ করতেন নগেন্দ্র। ১৯৯৪ সালে সিতাইয়ের বাড়িতে ফিরে তাঁর মহারাজ হওয়ার বাই ওঠে। নিজেকে পুরাণের মহারাজা নরক বা নরকাসুরের (ইনি পৌরাণিক কিংবদন্তি অনুযায়ী প্রাগজ্যোতিষ বা কামরূপ রাজ্যের ভৌম রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা) বংশধর দাবি করে ‘অনন্ত মহারাজ’ নাম গ্রহণ করে ১৯৪৯ সালে লুপ্ত কোচবিহার রাজ্যের স্বঘোষিত রাজা হয়ে ওঠেন নগেন্দ্র রায়।
বাম আমলে গ্রেটার কোচবিহার আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন রাজবংশী নেতা বংশীবদন বর্মন। দিনহাটার ভূমিপুত্র বংশীবদন উচ্চশিক্ষিত, দিনহাটা কলেজ থেকে বাংলায় অনার্স। ১৯৯৮ সালে ‘গ্রেটার কোচবিহার পিপলস অ্যাসোসিয়েশন’ বা জিসিপিএ গঠন করেছিলেন তিনি। ২০০৫-এর ২০ সেপ্টেম্বর জিসিপিএ-র আন্দোলন হিংসাত্মক হয়ে উঠলে তিনজন পুলিশ কর্মী সহ পাঁচজন নিহত হন। নিহত পুলিশ কর্মীদের একজন ছিলেন কোচবিহারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার। পুলিশ আন্দোলনের নেতা বংশীবদন বর্মন সহ জিসিপিএ-র অনেক কর্মী-সমর্থককে গ্রেফতার করে। ২০১১ সালে রাজ্যে পালা বদলের পর বংশীবদন জেল থেকে ছাড়া পান।
১৯৯৪ সালে নিজের রাজ্যাভিষেকের আয়োজন করে সিতাইয়ের নগেন্দ্র ‘অনন্ত মহারাজ’ নাম গ্রহণ করলেও ২০০৭-০৮-এর আগে কেউই তাঁকে চিনত না। বংশীবদন বর্মনের কারাবাসকালে জিসিপিএ-তে ভাঙন ধরে সংগঠনটি একাধিক গোষ্ঠীতে বিভক্ত হয়ে যায়। বংশীবদনের অবর্তমানে নেতৃত্বের শূন্যতার সুযোগটি কাজে লাগিয়ে গ্রেটার কোচবিহারের সমর্থকদের মধ্যে ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান শক্ত করেন নগেন্দ্র রায়।
মূলস্রোতের রাজনীতিতে অবাঞ্ছিত হওয়ার পথে নগেন্দ্র
চকচকার কালজানি গ্রামে অনন্ত মহারাজের প্রাসাদ দেখলে যে কারও চক্ষু বিস্ময়ে চড়কগাছ হয়ে যাবে। ২০২৩-এ রাজ্যসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কমিশনের কাছে পেশ করা হলফনামা অনুযায়ী নগেন্দ্র রায়ের মোট সম্পদের পরিমাণ দুই কোটি টাকা। পেট চালাতে যিনি অসমের রিফাইনারিতে শ্রমিকের কাজ করতেন, তাঁর এত বিত্ত-বৈভব হল কীভাবে, সেটাই একটা রহস্য।

নেতাজির বিরুদ্ধে অবমাননাকর মন্তব্য করার অভিযোগে ইতিমধ্যেই নগেন্দ্র রায় ওরফে অনন্ত মহারাজের বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ ও মামলা করেছে ফরওয়ার্ড ব্লক। নেতাজির প্রতি বিরূপ মন্তব্যের জেরে মূলস্রোতের রাজনীতিতে টিকে থাকা নগেন্দ্রর জন্য মুশকিল হয়ে উঠবে। নাকে খত দিয়ে ক্ষমা না চাইলে নগেন এবার টের পাবে, ভারতবর্ষের মাটিতে নেতাজি নামটার ওজন কতটা ভারী।
Feature image is representational.