আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা ৫৬ বছরের মোজতবা খামেনেই যে কোনও মুহূর্তে মারা যাবেন! এমনই দাবি করেছে ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম চ্যানেল-১৪’। চ্যানেলটি জানাচ্ছে, মোজতবার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয় এবং যে কোনও সময় বিশ্ববাসী শুনতে পাবেন, ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা মারা গেছেন। ইরানে ইজরায়েল-মার্কিন যৌথ সামরিক অভিযানের প্রথম দিনেই গত ২৮ ফেব্রুয়ারি সকালে তেহরানে নিজের অফিসিয়াল কম্পাউন্ডের বাঙ্কারে ইজরায়েলের ভয়ঙ্কর বিমান হামলায় মোজতবার বাবা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের মৃত্যু হয়েছিল।
হামলায় খামেনেইয়ের মেয়ে, মেয়েজামাই, নাতি এবং পুত্রবধূও ঘটনাস্থলেই মারা যান। ছেলে মোজতবাকে গুরুতর আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছিল। এরপর থেকে মোজতবা খামেনেইকে প্রকাশ্যে তো বটেই এমনকি টেলিভিশনের পর্দাতেও দেখা যায় নি। মোজতবার পরিণতি ঘিরে জল্পনার মধ্যেই গত ৮ মার্চ তাঁকে দেশের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা হিসেবে নির্বাচিত করে ৮৮ জন ধর্মীয় বিশেষজ্ঞকে নিয়ে গঠিত ‘অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস’। বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়ার পর থেকে এখনও পর্যন্ত মোজতবা খামেনেইকে টিভির পর্দায় পর্যন্ত দেখা যায় নি। মাঝেমধ্যে তাঁর নামে লিখিত বিবৃতি ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যমগুলিতে প্রচারিত হলেও মোজতবার শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে নানা গুঞ্জন খুব সঙ্গতকারণেই আন্তর্জাতিক মহলে ছড়িয়ে পড়েছে।
যে কোনও মুহূর্তে মোজতবার মৃত্যুসংবাদ ঘোষিত হবে?
ইজরায়েলের হামলায় প্রাণে বাঁচলেও মোজতবার চোট যে অত্যন্ত গুরুতর তাতে কোনও সন্দেহ নেই। রয়টার্স সহ একাধিক সূত্র দাবি করেছে, তাঁর দুই পাই সাংঘাতিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এমনকি বোমার আঘাতে মোজতবার মুখের আদল পাল্টে গিয়েছে বলে কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। সবথেকে বড় প্রশ্ন, মোজতবা খামেনেইয়ের মস্তিষ্ক কি আদৌ সচল আছে? জুলাই মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছিলেন, মোজতবা খামেনেই ৯০ শতাংশ গন কেস। ৪ থেকে ৯ জুলাই পর্যন্ত ইরানে নিহত সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেইয়ের শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। বাবার শেষকৃত্যানুষ্ঠানে মোজতবা উপস্থিত ছিলেন না। একই সময়ে মোজতবার নিহত স্ত্রী ও পুত্রের জানাজাও অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু মোজতবার দেখা মেলে নি। বাবা-ছেলে-স্ত্রীর শেষকৃত্যে মোজতবা খামেনেইয়ের অনুপস্থিতি তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে জল্পনাকে নিসন্দেহে আরও উস্কে দিয়েছে।
যদিও যতবার মোজতবা খামেনেইয়ের মৃত্যু অথবা সঙ্কটজনক পরিস্থিতির কথা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে এসেছে, ততবারই অস্বীকার করেছে তেহরান। ইরান সরকারের আধিকারিকেরা জানিয়েছেন, সর্বোচ্চ নেতার আঘাত গুরুতর নয় এবং তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন। ইরানের রেজিম অস্বীকার করলেও সর্বশেষ ৮ আগস্ট ইজরায়েলের সংবাদমাধ্যম ‘চ্যানেল-১৪’ জোরের সঙ্গেই দাবি করেছে, মোজতবার অবস্থা খুবই সঙ্কটজনক। ‘ইরানওয়্যার’ নামে একটি সংবাদমাধ্যমের সূত্র উদ্ধৃত করে চ্যানেল-১৪ জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের প্রশাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা আছে, এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলেই খবরটি পাওয়া গেছে।

উল্লেখ্য, ‘ইরানওয়্যার’ ইরানের সরকার বিরোধীদের দ্বারা পরিচালিত একটি মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম। তেহরানের প্রশাসনিক আধিকারিকদের মধ্যে দু’জনের সঙ্গে গোপনে কথা বলে ‘ইরানওয়্যার’ জেনেছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বিমান হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে সরকারের কোনও সদস্যের মুখোমুখি হন নি মোস্তাফা খামেনেই। ওই প্রশাসনিক আধিকারিকেরা স্বীকার করেছেন, মোজতবা যে কোনও মুহূর্তে মারা যেতে পারেন। সর্বোচ্চ নেতার স্বাস্থ্যের সঙ্কটজনক পরিস্থিতির কথা ইরানের রেজিমের শীর্ষ নেতৃত্বকেও জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের ক্যাবিনেটের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ একজন নাকি এমনও জানিয়েছেন, “যদি শীঘ্রই এমন সংবাদ শুনতে পাই যে সর্বোচ্চ নেতা শাহাদাত বরণ করেছেন, তবে আমরা অবাক হব না।”
অন্ধকারে কার সঙ্গে কথা বললেন পেজেশকিয়ান?
অন্যদিকে ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’ নামে অন্য একটি সংবাদমাধ্যম দাবি করেছে, সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানকে তেহরানের একটি গোপন স্থানে নিয়ে গিয়ে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের নামে পরিচয় করিয়ে দেওয়া এক ব্যক্তির সঙ্গে সংক্ষিপ্ত বৈঠক করানো হয়েছে। কিন্তু সর্বোচ্চ নেতার মুখ দেখতে পান নি প্রেসিডেন্ট। অন্ধকারে কেবল তাঁর কন্ঠস্বর শুনতে পেয়েছেন মাসউদ পেজেশকিয়ান। কন্ঠস্বরটি আদৌ মোজতবা খামেনেইয়ের কিনা, সাক্ষাৎ শেষে এই প্রশ্নও নাকি তুলেছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট।
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান নিজেই সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক পরিস্থিতির বিষয়ে অবগত নন। পেজেশকিয়ান সর্বোচ্চ নেতার সাক্ষাৎ চেয়ে গোঁ ধরলে অত্যন্ত গোপনীয়তার মধ্যে মোজতবার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে সর্বোচ্চ নেতার দফতর। সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে তাঁর মোলাকাতের ব্যবস্থা না করা হলে তিনি প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ইস্তফা দেবেন— পেজেশকিয়ান এমন হুমকিও দিয়েছিলেন বলে প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে।

কীভাবে প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনেইয়ের সাক্ষাৎ হয়েছে, তার বর্ণানাও দিয়েছে ‘ইরান ইন্টারন্যাশনাল’। পেজেশকিয়ানকে একটি গাঢ় লাল রঙের কালো কাচে ঢাকা গাড়ির পেছনের আসনে বসানো হয়। গাড়ির সামনের সিটে আগে থেকেই যে ব্যক্তিটি বসেছিলেন, তাঁকেই মোজতবা খামেনেই বলে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। গাড়ির ভেতর অন্ধকার ছিল। দেশের প্রেসডেন্ট ও দেশের সুপ্রিম লিডার— কেউ কাউকে দেখতে পান নি। এমনকি নিরাপত্তারক্ষীরা উভয়ের করমর্দনেও বাধা দেন! প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান মোজতবার গলার আওয়াজ শুনতে পান মাত্র। গাড়ির ভেতর অন্ধকারে দু’জনের মধ্যে বৈঠকটি মাত্র কয়েক মিনিট স্থায়ী হয়েছিল বলে জানা গেছে।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বৈঠক থেকে ফিরেই প্রেসিডেন্ট ইরানের থিয়োক্র্যাটিক রেজিমের শীর্ষ নেতৃত্বের কাছে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যে কন্ঠস্বর তিনি শুনেছেন, তা আদৌ মোজতবা খামেনেইয়ের কিনা? যদিও সাক্ষাৎকার শেষে প্রকাশ্যে পেজেশকিয়ান জানিয়েছিলেন, খুবই সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে সর্বোচ্চ নেতার সঙ্গে আড়াই ঘন্টা সময় কাটিয়েছেন তিনি। দেশটির বাণিজ্যিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সামনে এই দাবি করেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান।
ইরানের বাইরে সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা?
আবার সোদি আরবের সংবাদমাধ্যম ‘আল-হাদাথ’-কে উদ্ধৃত করে ইজরায়েলের একটি নিরাপত্তা সূত্র জানিয়েছে, মোজতবা খামেনেই ইরানেই নেই। ‘আল-হাদাথ’ দাবি করেছে, মোজতবা খামেনেইয়ের নামে জারি করা সরকারি বিবৃতিগুলি আসলে আইআরজিসি-র নতুন প্রধান আহমাদ ভাহিদি এবং সংগঠনটির অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় কমান্ডারদের দ্বারা তৈরি করা। উন্নত চিকিৎসার জন্য মুমূর্ষু মোজতবাকে গোপনে চিন অথবা রাশিয়ায় পাঠানো হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
কট্টরপন্থীদের সঙ্গে মধ্যপন্থীদের সংঘাত বাড়ছে
ইরানের মোল্লাতন্ত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা গৌণ। ‘ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস’ বা আইআরজিসি সরাসরি সর্বোচ্চ নেতার অধীন। সর্বোচ্চ নেতার শারীরিক অক্ষমতার কারণে আইআরজিসির নেতৃত্ব এখন পুরোপুরি কট্টরপন্থী নেতাদের হাতে বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা। সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেনেই নিহত। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খামেনেই পুত্র মোজতবা খামেনেই। কিন্তু ইজরায়েলের বিমান হামলায় গুরুতর আহত মোজতবাও অন্তরালে। মোজতবা যে রাষ্ট্রকে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো পরিস্থিতিতে নেই, এটা পরিষ্কার।

সুপ্রিম লিডার মোজতবার অক্ষমতার কারণে এই মুহূর্তে কোনও একক নেতার হাতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ নেই। আমেরিকার সঙ্গে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত আলোচনায় ইরানের তরফে প্রধান দায়িত্বপ্রাপ্ত মোহাম্মদ গালিবাফ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিচ্ছেন বলে আন্তর্জাতিক মহলের ধারনা। তবে ইরানে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ যে এখনও কট্টরপন্থীদের হাতে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। রাষ্ট্রীয় নানা সিদ্ধান্ত গ্রহণকে কেন্দ্র করে কট্টরপন্থীদের সঙ্গে মধ্যপন্থীদের সংঘাত বাড়ছে বলে তেহরান থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
Feature graphic is representational and AI generated.