International Tiger Day: ভারতে বাঘের সংখ্যা বাড়ছে কিন্তু বাঘের নিরাপদে আছে কি?


জিম করবেট ন্যাশনাল পার্কে ২৬০টি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রয়েছে বলে বন দফতর সূত্রে জানা গেছে। সংগৃহীত ফটো।

তবুও প্রশ্ন রয়ে গেছে—বাঘের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু তাদের থাকার মতো বন কি সেই হারে বেড়েছে?আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই আজ সবচেয়ে জরুরি।

বাঘ শুধু একটি বন্যপ্রাণী নয়, একটি সুস্থ বনভূমির প্রতীক। বাস্তুতন্ত্রের সর্বোচ্চ শিকারি বা অ্যাপেক্স প্রিডেটর হিসেবে বাঘ হরিণ, বুনো শূকরসহ তৃণভোজী প্রাণীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে বনভূমির প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় থাকে। বাঘ হারিয়ে গেলে ধীরে ধীরে ভেঙে পড়তে পারে পুরো বনজ পরিবেশ।

এই কারণেই বাঘকে বাঁচানো মানে শুধু একটি প্রাণীকে বাঁচানো নয়; বাঁচানো একটি সম্পূর্ণ বাস্তুতন্ত্রকে।

২০০৬ সালে ভারতে বন্য বাঘের সংখ্যা নেমে এসেছিল মাত্র ১,৪১১-এ। সেই সময় পরিস্থিতি ছিল উদ্বেগজনক। দীর্ঘদিনের পরিকল্পিত সংরক্ষণ, প্রজেক্ট টাইগার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বনরক্ষীদের নিরলস পরিশ্রম এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থার ফলে আজ পরিস্থিতি অনেকটাই বদলেছে।

১৬ বছরে ভারতে বাঘের সংখ্যা ১,৪১১ থেকে বেড়ে ৩,৬৮২ হয়েছে। সুন্দরবনের পৃথিবী বিখ্যাত ম্যানগ্রোভ অরণ্যে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার রাজার মতোই বিচরণ করে। সংগৃহীত ফটো।

২০২২ সালের সর্বশেষ সর্বভারতীয় ব্যাঘ্রশুমারি অনুযায়ী, বর্তমানে ভারতে বন্য বাঘের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩,৬৮২। বিশ্বের মোট বন্য বাঘের প্রায় ৭৫ শতাংশই এখন ভারতের বনাঞ্চলে বাস করে। সংরক্ষণের ক্ষেত্রে এটি নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক সাফল্য।

সংখ্যা বাড়া যেমন সুখবর, তেমনি তার সঙ্গে এসেছে নতুন উদ্বেগ। বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, ভারতের প্রায় ৩০ শতাংশ বাঘ এখন ঘোষিত টাইগার রিজার্ভের বাইরেও ঘোরাফেরা করছে। অর্থাৎ এক হাজারেরও বেশি বাঘ মানুষের বসতি, কৃষিজমি কিংবা বন সংলগ্ন এলাকায় চলে আসছে।

ফলে বাড়ছে মানুষ-বাঘ সংঘাত। প্রাণহানি ঘটছে মানুষ ও বাঘ—উভয়েরই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় রিজার্ভের বাইরের বাঘ সংরক্ষণের ওপরও এখন সমান গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

পশ্চিমবঙ্গের সুন্দরবন পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ অরণ্য, যেখানে বাস করে বিখ্যাত রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার। সর্বশেষ সরকারি শুমারি অনুযায়ী সুন্দরবনে রয়েছে ১০১টি বাঘ। বন দফতর ও বিশেষজ্ঞদের সাম্প্রতিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, রাজ্যে মোট বাঘের সংখ্যা প্রায় ১৩১।কিন্তু এই অঞ্চলই সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ।

সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের ভারতীয় অংশে বর্তমানে ১৩১টি বাঘ রয়েছে বলে বন দফতরের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণ থেকে জানা গেছে। সংগৃহীত ফটো।

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার বিস্তার, নদীভাঙন এবং মানুষের বসতি সম্প্রসারণ—সব মিলিয়ে বাঘের বাসস্থান ক্রমশ ছোট হয়ে আসছে। এর ফলে বাঘ লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে এবং সংঘাতের ঘটনাও বাড়ছে।

২০২৫ সালের গোড়ায় পুরুলিয়ার পাহাড়ি জঙ্গলে একটি ক্যামেরা ট্র্যাপে ধরা পড়ে একটি বাঘের ছবি। প্রথম দেখায় এটি হয়তো সাধারণ একটি ছবি। কিন্তু বন বিশেষজ্ঞদের কাছে এটি ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। কারণ, পুরুলিয়ায় এর আগে কখনও বাঘের উপস্থিতির নির্ভরযোগ্য প্রমাণ মেলেনি।

বন দফতরের ট্র্যাপ ক্যামেরায় ২০২৫ সালের গোড়ায় পুরুলিয়ার পাহাড়ি জঙ্গলে ধরা পড়েছে রয়্যাল বেঙ্গল বাঘের গতিবিধি। সংগৃহীত ফটো।

গবেষকদের মতে, বাঘটি ছত্তিশগড় থেকে ঝাড়খণ্ড হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ ভারতের বাঘের বিচরণভূমি এবং বন করিডরের মানচিত্র বদলাচ্ছে।

বাঘ একটি বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বিচরণ করে। তাই শুধু সংরক্ষিত বন থাকলেই হবে না, এক বন থেকে অন্য বনে নিরাপদে যাওয়ার জন্য ওয়াইল্ডলাইফ করিডর অত্যন্ত জরুরি। করিডর নষ্ট হয়ে গেলে বাঘ বাধ্য হয়ে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। তখন সংঘাত অনিবার্য হয়ে ওঠে।

ভবিষ্যতের সংরক্ষণ নীতিতে এই বিষয়টিই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

বাঘের চামড়া, হাড় ও অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আন্তর্জাতিক অবৈধ বাজার আজও সক্রিয়। তাই ক্যামেরা ট্র্যাপ, ড্রোন নজরদারি, রেডিও কলার, বিশেষ টহলদল এবং গোয়েন্দা নজরদারি—সবই এখন বাঘ সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

ন্যাশনাল টাইগার কনজারভেশন অথরিটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ১৬৬টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। আগের বছরের তুলনায় এই সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।

উদ্বেগের বিষয়, মৃত বাঘের মধ্যে ৩১টি ছিল শাবক। মানুষ-বাঘ সংঘাত, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হওয়া, ফাঁদে পড়া এবং আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া—এই মৃত্যুর প্রধান কারণগুলির মধ্যে অন্যতম।

বাঘ সংরক্ষণ মানে শুধু বাঘের সংখ্যা গোনা নয়।

এর অর্থ—

  • বনভূমি রক্ষা করা।
  • নতুন বন করিডর তৈরি করা।
  • চোরাশিকার সম্পূর্ণ বন্ধ করা।
  • লোকালয়ে ঢুকে পড়া বাঘকে নিরাপদে উদ্ধার করা।
  • আহত ও অসুস্থ বাঘের চিকিৎসার আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা।
  • বনসংলগ্ন মানুষের জীবন ও জীবিকাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া।

ভারত আজ বাঘ সংরক্ষণে বিশ্বকে পথ দেখাচ্ছে। কিন্তু এই সাফল্যকে ধরে রাখতে হলে শুধু পরিসংখ্যানের সাফল্যে আত্মতুষ্ট হলে চলবে না। প্রয়োজন আরও বন, আরও নিরাপদ করিডর, আরও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি মানুষের সচেতন অংশগ্রহণ।

মনে রাখতে হবে, বাঘ শুধু জঙ্গলের রাজা নয়, প্রকৃতির ভারসাম্যের রক্ষক। বাঘ বাঁচলে বন বাঁচবে, বন বাঁচলে প্রকৃতি বাঁচবে, আর প্রকৃতি বাঁচলে বাঁচবে মানুষও। আন্তর্জাতিক বাঘ দিবসে এই অঙ্গীকারই হোক আমাদের সকলের।

লেখক পরিচিতি: অরুণ কুমার। প্রবীণ সাংবাদিক। সাংবাদিকতা বিভাগে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত। ইকো ট্যুরিজম নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। উত্তরবঙ্গের পাহাড়, তরাই, ডুয়ার্সের আনাচকানাচে নিজের হাতের তালুর মতোই চেনেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com