আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সৌদি আরবের অধিকাংশ মুসলমান সুন্নি হাম্বলি মাজহাবের অনুসারী। সুন্নি সালাফি বা ওয়াহাবি মাজহাবের প্রভাবও আছে সৌদিতে। অন্যদিকে ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা শিয়া জায়দি মাজহাবের অনুসারী। হুথিদের পিছনে আছে শিয়া ইরানের মদত। সুন্নি সৌদি আরবের ‘আল সৌদ’ শাসকগোষ্ঠী আমেরিকার আশ্রিত। হুথি বিদ্রোহীদের আক্রমণে নাজেহাল পৃথিবীর অন্যতম ধনী রাষ্ট্র সৌদি আরব। হুথি বিদ্রোহীরা খালি পায়ে হাঁটে, ছেঁড়া জামা-কাপড় পরে। কিন্তু ইসলামের দুই মাজহাবের লড়াইয়ে সৌদি আরবকে রীতিমতো বিপর্যস্ত দেখাচ্ছে!
দরিদ্র হুথি বিদ্রোহীদের কাছে সৌদি আরব এতটাই অসহায় যে খোদ রাজধানী রিয়াধ নিরাপদ নয়। রিয়াধের কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দিনে-রাতে যখন-তখন ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় হুথিরা। শনিবারের হামলাটি ছিল সবথেকে মারাত্মক! হুথি বিদ্রোহীদের ছোঁড়া ক্ষেপণাস্ত্র স্থানীয় সময় দুপুর দু’টোয় বিমানবন্দরটির ৩ এবং ৪ নম্বর টার্মিনালে আঘাত করলে ১২ জন নিহত হন, আহতের সংখ্যা ৩০৯। আহতদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। তাই মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।
নিহতদের মধ্যে চারজন সৌদি আরবের, দু’জন বাংলাদেশের। আমেরিকা, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিশরের একজন করে নাগরিকও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় মারা গিয়েছেন। হামলায় কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এমনকি টারম্যাকে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজও ধ্বংস হয়ে গেছে।
শনিবারের ভয়াবহ হামলার পর রবিবারও রিয়াধের এই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে হুথিরা। গত সাতদিনে এই নিয়ে চারবার কিং খালেদ এয়ারপোর্টে হামলা চালালো ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা। হুথিদের এক সিনিয়র কমান্ডার মোহাম্মদ আল-বুখাইতি রিয়াধের বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করে নিয়ে জানিয়েছেন, ইয়েমেনের উপর সৌদি আরবের বিমান হামলার জবাব দিতে এই হামলা চালানো হয়েছে।
সৌদি আরবকে সামরিক প্রযুক্তি দিয়ে সাহায্য করে থাকে আমেরিকা। আমেরিকার দেওয়া সর্বাধুনিক আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থাকার পরেও সৌদি আরব কেন হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধ করতে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হচ্ছে, এই প্রশ্ন তুলেছেন মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক বিশেষজ্ঞরা। হুথিদের লাগাতার ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জেরে কিং খালেদের মতো গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের উড়ান পরিষেবা স্থবির হওয়ার মুখে। শুধু তাই নয়, সৌদি আরবের আকাশপথে ব্যবহার করে আন্তর্জাতিক অসামরিক বিমান চলাচলও বিঘ্নিত হচ্ছে। শনিবারের ঘটনার পর এয়ার ইন্ডিয়া, লুফথানসা, ফ্লাইদুবাই ও পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনার এয়ারলাইন্স সহ একাধিক আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক বিমান সংস্থা রিয়াধ সহ সৌদি আরবের বিভিন্ন শহরে উড়ান পরিষেবা বন্ধ রেখেছে।
সৌদি আরব আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অন্যতম প্রধান বিক্রেতা। ইয়েমেনের হুথিদের সঙ্গে যুদ্ধে নেমে সৌদি বাদশাহের রীতিমতো ল্যাজে-গোবরে অবস্থা। দেশের অর্থনীতি গভীর সংকটের মধ্যে পড়েছে। কয়েক মাস আগে অনেক ঢাকঢোল পিটিয়ে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে ‘মক্কা চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়েছে। এই সামরিক চুক্তির মূলকথা— এক দেশ আক্রান্ত হলে অন্য দুই দেশ পাশে দাঁড়াবে। দেখা যাচ্ছে, মক্কা চুক্তি সৌদি আরবকে গরীব হুথি বিদ্রোহীদের হাত থেকেও রক্ষা করতে অক্ষম। হুথি বিদ্রোহীদের ঘাঁটিতে বোমা ফেলতে অস্বীকার করেছে মক্কা চুক্তির অন্যতম অংশীদার পাকিস্তান। ইসলামাবাদ ভালোই জানে, হুথিদের সঙ্গে পায়ে পা লাগিয়ে সামরিক সংঘাতে জড়িয়ে পড়লে লোহিত সাগর দিয়ে পাকিস্তানি বাণিজ্যিক জাহাজের চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাবে।

সৌদি বাদশাহরা বরাবরই ওয়াশিংটন প্রশাসনের ভাল বন্ধু। ইরান সমর্থিত ইয়েমেনি হুথিরা ক্রমাগত সৌদিদের বেইজ্জতি করে যাওয়ায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বেজায় ক্ষুব্ধ। কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় নিহতদের মধ্যে একজন মার্কিন নাগরিকও আছেন। ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ট্রাম্প বলেছেন, “সৌদি আরবে যা ঘটেছে, তা কোনও ভাবেই বরদাস্ত করা যায় না। আমরা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছি এবং বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সৌদি বাহিনীকে সরাসরি সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখছি।”
সৌদি আরবকে রক্ষা করতে হুথি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে কি সরাসরি আক্রমণে নামবে ওয়াশিংটন? সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ট্রাম্পকে ফোন করে তেমন অনুরোধই করেছেন। কিন্তু ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেমে ইতিমধ্যেই নাক কাটা গেছে আমেরিকার। আমেরিকার জনগণও চান না, মধ্যপ্রাচ্যে দুই মুসলিম দেশের সংঘাতে জড়িয়ে তাদের সৈনিকদের প্রাণ বেঘোরে যাক।
‘মুসলিম উম্মাহ’ শব্দটি যে নিছকই ঢপের চপ, হুথি-সৌদি সংঘর্ষ তা আরও একবার প্রমাণ করল। সৌদি আরবকে রক্ষা করতে না এগিয়ে আসছে পরমাণু শক্তিধর সুন্নি পাকিস্তান, না এগিয়ে আসছেন দুনিয়ার সুন্নি মুসলমানদের প্রিয় নেতা তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেজেপ তাইয়িপ এরদোয়ান। শিয়া মুসলমান হুথিদের হাত থেকে বাঁচতে এখন অমুসলিম মিত্র আমেরিকার হাতে-পায়ে ধরছেন সৌদি বাদশাহ।
ফিচার ইমেজ: এনএনডিসি গ্রাফিক্স।