আর ছয় পেরোলেই দু’শো! পৃথিবীর প্রবীণতম স্থলচর প্রাণী ‘জোনাথন’


স্তন্যপায়ী প্রাণীদের মধ্যে সবথেকে বেশি দিন বাঁচে বোহেড তিমি। এরা ২০০ বছরের‌ও বেশি বেঁচে থাকতে পারে। মানুষ হলে বলা যেত, হেসেখেলে বাঁচে। তিমিরা হাসে বলে এখন‌ও জানা যায় নি। তবে খেলে মানে জলক্রীড়া করে তো বটেই। স্থলচর প্রাণীদের মধ্যে আয়ুর জোর সবথেকে বেশি স্থলকচ্ছপের। কথায় বলে কাঠঠার পরাণ! সরীসৃপ স্থলকচ্ছপ বা ‘টরটোয়েজ’ ১০০ থেকে ১৫০ বছর পার করে দিতে পারে। এমনকি কিছু কিছু অতিকায় স্থলকচ্ছপ দু’শোর বেশি বছর বেঁচে থাকার রেকর্ড করেছে।

জীবন যত‌ই যন্ত্রণার হোক না কেন, বাঁচতে কে না চায়। যেখানে শতায়ু হ‌ওয়াটাই মানুষের জন্য বিস্ময়ের, সেখানে এই‌ পৃথিবীতেই ১৯৪ বছর ধরে শ্বাস-প্রশ্বাস নিচ্ছেন জোনাথনবাবু! তিন দোপেয়ে মানুষ তো নন‌ই এমনকি স্তন্যপ্রায়ী বর্গের‌ও নন। জোনাথন একটি বিশালকায় পুরুষ স্থলকচ্ছপের নাম— আনুমানিক বয়স ১৯৪ বছর! ১৮৩২ সালে ‘সেশেলস জায়ান্ট টরটয়েজ’ প্রজাতির এই কচ্ছপটির জন্ম বলে জীববিজ্ঞানীরা মনে করছেন। জোনাথনকেই পৃথিবীর প্রবীণতম স্থলচর প্রাণীর (the oldest living land animal) মর্যাদা দিয়েছেন‌ বিজ্ঞানীরা। অনেক গবেষক মনে করেন, তাঁদের অনুমানের চাইতেও জোনাথনের প্রকৃত বয়স বেশি।

সেশেলস জায়ান্ট টরটয়েজ’ প্রজাতির পুরুষ স্থলকচ্ছপ ‘জোনাথন’। পৃথিবীর প্রবীণতম স্থলচর প্রাণী। জন্ম ১৮৩২ সালে। বয়স- ১৯৪ বছর। ফটো: সংগৃহীত।

জোনাথনের জন্ম হয়েছিল ভারত মহাসাগরের সেশেলস দ্বীপপুঞ্জে। ১৮৮২ সালে তাকে আদি নিবাস থেকে সরিয়ে দক্ষিণ আটলান্টিক মহাসাগরের সেন্ট হেলেনা দ্বীপে নিয়ে আসা হয়। স্থানীয় গভর্নরের বাসভবনের বাগানে তাকে আশ্রয় দেওয়া হয়েছিল। সেই থেকে এখানেই তিনি বিরাজ করছেন। মানুষের প্রাণবায়ুর আয়ু কচ্ছপের থেকে ঢের কম, তা তিনি দুনিয়ার যত বড় গভর্নর‌ই হোন না কেন। গভর্নরদের পদের আয়ু তো আর‌‌ও কম। জোনাথনের চোখের সামনে দিয়ে কত গভর্নর এলেন-গেলেন, কেউ কেউ পদে থাকাকালীন মরেও গেলেন। কিন্তু জোনাথনের উইকেট পড়ে না— জীবনের পিচে টুক টুক করে রান তুলতে তুলতে তিনি আজ ডবল সেঞ্চুরির দোরগোড়ায়।

দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ, হিটলারের উত্থান-পতন, সোভিয়েত ইউনিয়নের জন্ম-মৃত্যু, উড়োজাহাজের আবিষ্কার থেকে চাঁদে মানুষের অবতরণ, টেলিগ্রাফের উদ্ভাবন থেকে ইন্টারনেটের দুনিয়া— কত পরিবর্তনের সাক্ষী এই কূর্ম! জোনাথনের ওজন ১৫০-২০০ কেজি। বাগানের ঘাস ও উদ্ভিদ তার স্বাভাবিক খাবার। তবে সেন্ট হেলেনার গভর্নরের বাগানে যাঁরা জোনাথনের দেখভালের দায়িত্বে, তাঁরা তাকে খেতে দেন কলা, আপেল, বাঁধাকপি, শসা, গাজর এবং লেটুস পাতাও। ইনি নিয়ম করে খান-দান, ঘুমোন, রোদ তাপান আর স্বভাবসুলভ ধীরেসুস্থে হাঁটেন।

সেন্ট হেলেনা দ্বীপের গভর্নরের বাসভবনের বাগান ১৪৪ বছর ধরে জোনাথনের স্থায়ী ঠিকানা। ফটো: সংগৃহীত।

বয়স হলে শরীরে একটু সমস্যা হয়‌ই। জোনাথনের দুই চোখেই ছানি পড়েছে। তাই চোখে খুব কম দেখে। ঘ্রাণশক্তিও পড়তির দিকে তবে শ্রবণশক্তি এখন‌ও‌ যথেষ্ট ভাল বলে পরিচর্যাকারীরা জানিয়েছেন। জোনাথনের চিকিৎসার দায়িত্বে আছেন পশুচিকিৎসক জো হলিন্স। মাঝে কয়েকবার জোনাথন অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তবে নিজের জীবনীশক্তির জোরে আর চিকিৎসার গুণে সেরে উঠেছে।

১৯৪৭ সালে সেন্ট হেলেনা দ্বীপপুঞ্জের গভর্নরের বাগানে জোনাথনের সঙ্গে ব্রিটিশ সম্রাট ষষ্ঠ জর্জ, রাজকুমারী এলিজাবেথ ও মার্গারেট। ফটো: সংগৃহীত।

জীবের মৃত্যু অনিবার্য। কিন্তু বেঁচে থাকাটা রহস্য। বিজ্ঞানীরা জোনাথনের দীর্ঘায়ুর রহস্য জানতে চান। এমনিতেই সেশেলস ও অ্যালডাব্রা প্রজাতির বিশালকায় স্থলচর কচ্ছপেরা উপযুক্ত পরিবেশ পেলে একশত থেকে দেড়শত বছর বাঁচতে পারে। তবে জোনাথনের বয়স এই দুই প্রজাতির কচ্ছপের সর্বোচ্চ আয়ুষ্কালকেও ছাড়িয়ে গেছে। জোনাথনের জিনোম ও এপিজেনোম নিয়ে গবেষণা হয়েছে। কচ্ছপটির দেহে এমন ২৮৭টি বিশেষ জিনগত বৈচিত্র শনাক্ত করা হয়েছে, যেগুলি তার দীর্ঘায়ুর সঙ্গে সম্পর্কিত নানা জৈবিক প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করে থাকতে পারে।

জিনেই জীবনের যত রহস্য। রাখে জিন তো মারে কে!

Feature image: AI modified.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com