মোহাম্মদ আজিজ: ব‌ই বেচতে বেচতেই ৪ হাজার ব‌ই পড়ে ফেলেছেন যে ব‌ই বিক্রেতা!


ব‌ইয়ে ঠাসা নিজের এক চিলতে দোকানে প্রতিদিন ১২ ঘন্টা কাজ করেন তিনি। এর মধ্যে ৮ ঘন্টাই তাঁর কাটে ব‌ই পড়ে। ছোট্ট দোকান। ঘরভর্তি নতুন-পুরোনো ব‌ই। দোকানের ভেতরে জায়গার বড় অভাব। বাইরে রাস্তার উপরেই ব‌ইয়ের ঢিপ করে রাখতে হয় মোহাম্মদ আজিজকে। ব‌ই বেচে মোহাম্মদ আজিজ মোটেই কোন‌ও ধনী কেউকেটা হন নি। বরং ব‌ইয়ের ব্যবসা তাঁর সংসারের অভাব ঘোচায় নি। কিন্তু ব‌ই বেচতে বেচতেই ৪ হাজারের বেশি ব‌ই পড়ে ফেলেছেন তিনি!

মরক্কোর রাজধানী রাবাত শহরের ব‌ইয়ের দোকানদার মোহাম্মদ আজিজ। ৫০ বছর ধরে ব‌ইয়ের দোকানদারি করতে করতে ৪ হাজার ব‌ই পড়ে ফেলেছেন ৭৩ বছরের আজিজ। সংগৃহীত ফটো।

মাত্র ছয় বছর বয়সে মা-বাবাকে হারিয়েছেন মোহাম্মদ আজিজ। ব‌ই কেনার টাকা ছিল না বলে ১৫ বছর বয়সেই ছেড়েছেন পড়ালেখা। ১৮ বছর বয়সে মরক্কোর রাবাত শহরের সবথেকে বড় বাজার এলাকায় একটি গাছের তলায় গালিচা পেতে ব‌ইয়ের ব্যবসা শুরু করেন তিনি। ২৩ বছর বয়সে পাঁচ বাই পাঁচ ফুটের একটি দোকান কেনেন। ৫০ বছর ধরে সেই দোকানেই ব‌ই বেচে চলেছেন মোহাম্মদ আজিজ।

মোহাম্মদ আজিজের ছোট্ট দোকানটিতে উপচে পড়া ব‌ই। সব ধরণের ব‌ই রাখেন দোকানে। কিন্তু ক্রেতার বড্ড অভাব। উত্তর-পশ্চিম আফ্রিকার দরিদ্র দেশ মরক্কোয় আজ‌ও প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৩ জন নিরক্ষর। অর্থের অভাবে শিশুদের স্কুল থেকে ছাড়িয়ে কাজে লাগিয়ে দেন অভিভাবকেরা। ফলে মরক্কোর ব‌ইয়ের দোকানগুলিতে ক্রেতার অভাবে ধুঁকতে থাকে। যদিও মোহাম্মদ আজিজের বিষয়টি আলাদা। দিনে একটি কিম্বা দুটি ব‌ই বিক্রি হলেও আক্ষেপ নেই তাঁর। ৭৩ বছরের ব‌ই পাগল ব‌ই ব্যবসায়ী দোকান খুলে ব‌ইয়ের ভিড়ে ব‌ইয়ের পাতাতেই ডুবে থাকেন।

ধ্রুপদী সাহিত্য থেকে বিজ্ঞান, ফিকশন থেকে নন-ফিকশান— সব ধরণের ব‌ইয়ের একনিষ্ঠ পাঠক মরক্কোর এই ব‌ইয়ের দোকানদার। দারিদ্রের কারণে মোহাম্মদ আজিজ প্রথাগত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। কিন্তু অভাব তাঁর শেখার আগ্রহকে চাপা দিতে পারে নি। নিজের চেষ্টায় স্প্যানিশ ও ফরাসি রপ্ত করেছেন এমনকি জার্মান এবং ইতালিয়ান ভাষাও খানিকটা শিখেছেন। আরবি, ফরাসি, স্প্যানিশ এবং ইংরেজি- এই চার ভাষায় প্রকাশিত ৪ হাজার ব‌ই আজিজের পড়া শেষ।

দোকানে কোন‌ও নতুন ব‌ই এলেই আগে পড়ে ফেলেন মোহাম্মদ আজিজ।‌ দোকানে বসে ব‌ই বেচেন কম, পড়েন বেশি আজিজ। সংগৃহীত ফটো।

দোকানে নতুন কোন‌ও ব‌ই এলেই বেচার আগে পড়ে ফেলেন তিনি। ব‌ইয়ের ব্যবসা মোহাম্মদ আজিজকে বড়লোক বানায় নি। কিন্তু ব‌ই পড়ার নেশা ধরিয়েছে। যে নেশা তাঁর মনটাকে আকাশের মতোই বিরাট করে দিয়েছে। মোহাম্মদ আজিজের ছোট্ট দোকানটি যেন একটি ব‌ইয়ের অরণ্য। সেই অরণ্যে সাধকের একাগ্রতা নিয়েই গ্রন্থপাঠে নিমগ্ন থাকেন বৃদ্ধ। দোকানের দরজায় বসে তাকিয়ায় পিঠ ঠেকিয়ে পা দুটি ছড়িয়ে ব‌ইয়ের স্তূপে ব‌ই পড়ায় মগ্ন মোহাম্মদ আজিজ- এই ছবি বিশ্বময় ছড়িয়ে পড়েছে।

৭৩ বছরের মোহাম্মদ আজিজ ব‌ই পড়তে ভালবাসেন। পড়াতেও।‌ তাঁর দোকান থেকে খালি হাতে ফেরেন না কেউ। ক্রেতার পকেটে টান থাকলে দামি ব‌ইয়ের দাম‌ও যথেষ্ট কমিয়ে রাখেন তিনি। ব‌ই বেচা মোহাম্মদ আজিজের যতটা না পেশা, তার চেয়েও অনেক বেশি ভালবাসা। “যত দিন না দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক পড়তে শিখবে, তত দিন এই দোকান থেকে সরব না আমি”- ব‌ইয়ের জগতের প্রতি কতটা ভালবাসা থাকলে এমন প্রতিজ্ঞা করতে পারেন ৭৩ বছরের এক বৃদ্ধ! পৃথিবীর সবথেকে ধনী পুস্তকবিক্রেতা মোহাম্মদ আজিজ নয় তো আর কে!

Feature image is AI generated sketch.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com