অবশেষে ‘ফোল্ডেবল’ আইফোন বাজারে আনল অ্যাপল! ভারতে কিনতে‌ হলে গুণতে হবে কত টাকা?


গত বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) ক্যালিফোর্নিয়ার কুপার্টিনোতে অ্যাপলের সদর দফতরে সংস্থার নতুন সিইও জন টার্নাস উন্মোচন করেছেন সংস্থাটির তৈরি প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন—আইফোন ডুও। অ্যাপলের দাবি, এটি শুধু নতুন একটি আইফোন-ই নয়; অরিজিনাল আইফোন বাজারে আনার পর থেকে ব্র্যান্ডটির স্মার্টফোন ডিজাইনে সবথেকে বড় পরিবর্তন!

৯ সেপ্টেম্বর আইফোন ডুও-কে জনসমক্ষে আনা হল মাত্র। খোদ আমেরিকার বাজারেই এর বিক্রি শুরু হয় নি। অ্যাপল ঘোষণা করেছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ফোনটির প্রারম্ভিক দাম ১,৯৯৯ ডলার।

প্রথমবারের মতো ফোল্ডেবল ফোন বাজারে আনল অ্যাপল। সংস্থার সিইও জন টার্নাসের হাতে ফোল্ডেবল আইফোন ডুও। ফটো: সংগৃহীত।

অ্যাপলের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী ১৬ অক্টোবর থেকে আইফোন ডুও-র প্রি-অর্ডার বা বুকিং শুরু হবে। ২৩ অক্টৌবর থেকে বিক্রি। বিশ্বের প্রথম পর্যায়ের বাজারের তালিকার মধ্যেই রয়েছে ভারতের নাম। অর্থাৎ এক‌ই দিন থেকেই ভারতেও ফোনটির প্রি-অর্ডার ও সেল শুরু হবে। ভারতের অ্যাপল স্টোর এবং নির্বাচিত অনুমোদিত বিক্রয়কেন্দ্রে ফোনটি বিক্রি করা হবে।

ভারতের বাজারে আইফোন ডুও-র দাম শুরু হচ্ছে ২ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকা অর্থাৎ ৩ লক্ষ টাকা থেকে।

  • ২৫৬ জিবি মডেলের দাম ২,৯৯,৯০০ টাকা।
  • ৫১২ জিবি মডেলের দাম ৩,২৪,৯০০ টাকা।
  • ১ টেরাবাইট মডেলের দাম ৩,৭৪,৯০০ টাকা।
  • ২ টেরাবাইট মডেলের দাম ৪,৪৯,৯০০ টাকা।

অর্থাৎ, সর্বোচ্চ ২ টেরাবাইট স্টোরেজের আইফোন ডুও কিনতে একজন ভারতীয় ক্রেতাকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা গুণতে হবে!

আইফোন ডুও-র অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য তার ফোল্ডেবল ডিজাইন। বন্ধ অবস্থায় ফোনটিতে রয়েছে ৫.৪ ইঞ্চির বাইরের ডিসপ্লে। ফোনটি খুললে পাওয়া যাবে বিশাল ৭.৬ ইঞ্চির ইনার ডিসপ্লে! ভাঁজ করা অবস্থায় ফোনটি দেখতে একটি পাসপোর্টের মতো। একে ব‌ইয়ের মতো খোলা যায়, বন্ধ করা যায়। পকেটে রাখা অবস্থায় এটি একটি সাধারণ স্মার্টফোনের মতোই ব্যবহার করা যাবে। আবার প্রয়োজন হলে খুলে অনেক বড় স্ক্রিনে কাজ করা যাবে।

ভিডিয়ো: অ্যাপলের ভাঁজযোগ্য ফোন আইফোন ডুও। ১৬ অক্টোবর থেকে ভারতে প্রোডাক্টির প্রি-অর্ডার শুরু। ২৩ অক্টোবর থেকে বিক্রি। সংগৃহীত ক্লিপ।

অ্যাপল জানাচ্ছে, খোলা অবস্থায় আইফোন ডুও-র ডিসপ্লে এরিয়া আইফোন ১৮ প্রো ম্যাক্সের তুলনায় প্রায় ৫০ শতাংশ বড়।

আইফোন ডুও-র বড় স্ক্রিন শুধু ভিডিয়ো দেখা বা ছবি দেখার জন্য‌ই নয়। নতুন iOS 27-কে ফোল্ডেবল ডিসপ্লের কথা মাথায় রেখেই সাজিয়েছে অ্যাপল।

আইফোন ডুও-র সবথেকে বড় সুবিধে, স্প্লিট ভিউর মাধ্যমে একই সময়ে দুটি অ্যাপ পাশাপাশি চালাতে পারবেন ব‌্যবহারকারী।

যেমন, একদিকে ইউটিউব বা নেটফ্লিক্স চালিয়ে অন্যদিকে সাফারি ব্যবহার করা সম্ভব এই ফোনটিতে। আবার একদিকে ভিডিয়ো কনফারেন্স চালিয়ে অন্যদিকে নোট‌ও নেওয়া যাবে।

একইভাবে সাফারির দুটি উইন্ডো পাশাপাশি খুলে দুটি তথ্যের মধ্যে তুলনাও করতে পারবেন আপনি। ফলে আইফোন ডুও-কে স্মার্টফোন এবং ছোট ট্যাবলেটের মাঝামাঝি একটি ডিভাইস হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

আইফোন ডুও-তে থাকছে ৭.৬ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর ফোল্ডিং ডিসপ্লে এবং ৫.৪ ইঞ্চির সুপার রেটিনা এক্সডিআর আউটার ডিসপ্লে।

আইফোন ডুও। ফোনটির ভাঁজ খুললে পাওয়া যাবে ৭.৬ ইঞ্চির বিশাল ইনার ডিসপ্লে! ফটো: সংগৃহীত।

দুটি ডিসপ্লেতেই রয়েছে প্রো-মোশান প্রযুক্তি এবং এবং অল‌ওয়েস-অন ডিসপ্লে। বাইরে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ৩০০০ নিটস উজ্জ্বলতা পাওয়া যাবে। এছাড়াও রয়েছে বিশেষ ন্যানো-টেক্সার ফিনিশ! এর ফলে ডিসপ্লেতে আলোর প্রতিফলন এবং ঝলকানি কমানোর পাশাপাশি ফোল্ডেবল ডিসপ্লের মাঝের ভাঁজও তুলনামূলক কম দৃশ্যমান হবে।

অ্যাপল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আইনফোন ডুও-র ফোল্ডিং ডিসপ্লে তৈরিতে একাধিক বিশেষ কাঠামোগত স্তর ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে দীর্ঘদিন ব্যবহারের পরেও ডিসপ্লের স্থায়িত্ব বজায় থাকে।

আইফোন ডুও-র বডি তৈরি হয়েছে গ্রেড ফাইভ টাইটানিয়াম দিয়ে। এর কব্জায় রয়েছে ১০০টিরও বেশি উপাদান। বারবার ফোন খোলা ও বন্ধ করার পরেও কব্জা যাতে মসৃণভাবে কাজ করে, সে বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন অ্যাপলের নির্মাতারা।

ফোনটিতে রয়েছে সিরামিক শিল্ড এবং সিরামিক শিল্ড টু। পাশাপাশি রয়েছে জল এবং ধুলোবালির থেকেও সুরক্ষা। অ্যাপলের দাবি, আইফোন ডুও-র সামনের সিরামিক শিল্ড-টু আগের প্রজন্মের আইফোনগুলির তুলনায় তিন গুণ বেশি আঁচড় প্রতিরোধী!

আইফোন ডুও-তে আর‌ও একটি বড় পরিবর্তন এনেছে অ্যাপল। ডিভাইসটিতে প্রচলিত ফেস আইডি নেই। পরিবর্তে সাইড বাটনের মধ্যেই থাকছে টাচ আইডি। ফোনটি খোলা কিংবা বন্ধ—দুই অবস্থাতেই টাচ আইডি ব্যবহার করে নিজের মালিকানার প্রমাণীকরণ করতে পারবেন ব্যবহারকারী ।

আইফোন ডুও-তে রয়েছে নতুন A20 Pro চিপ। এর প্রসেসরে রয়েছে ৬-কোটি সিপিইউ, ৭-কোটি জিপিইউ এবং ১৬-কোটি নিউরাল ইঞ্জিন। এ ছাড়াও রয়েছে হার্ড‌ওয়্যার-অ্যাক্সিলেরেটেড রে ট্রেসিং এবং উন্নত অন-ডিভাইস এআই প্রসেসিং।

আইফোন ডুও সহজে গরম হবে না। তাপ নিয়ন্ত্রণের জন্য এতে রয়েছে বিশেষ থার্মাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম। ফটো: সংগৃহীত।

আইফোন ডুও-র বড় ফোল্ডিং ডিসপ্লেতে গেমিং মাল্টিটাস্কিংয়ের পাশাপাশি এআই এর মতো জনপ্রিয় কাজগুলি করার সময় তাপ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তাপ শোষণের জন্য ফোনটিতে যুক্ত করা হয়েছে থার্মাল ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম এবং কাস্টম ভেপার চেম্বার।

ক্যামেরার ক্ষেত্রেও আইফোন ডুও যথেষ্ট শক্তিশালী। ডিভাইসটির পেছনে রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেল ফিউশন মেইন ক্যামেরা এবং ৪৮ মেগাপিক্সেল ফিউশন আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরা। মেইন ক্যামেরাতে রয়েছে অপটিক্যাল কোয়ালিটি ২x টেলিফটো ক্যাপাবিলিটি। এছাড়াও রয়েছে উচ্চ রেজোলিউশনের ফটোগ্রাফি ও আর‌ও উন্নত ভিডিয়ো রেকর্ডিংয়ের সুবিধা।

ভিডিয়োর ক্ষেত্রে ফোরকে ১২০এফপিএস ডলবি ভিশন রেকর্ডিংয়ের সুবিধা পাবেন ব‌্যবহারকারীরা। এছাড়াও ডিভাইসটিতে সিনেমাটিক ভিডিয়ো, অডিও মিক্স এবং ফোরকে ডলবি ভিশন, এইচডিআর টাইম ল্যাপস-এর মতো আকর্ষণীয় ফিচার রয়েছে।

আইফোন ডুও-তে রয়েছে ৪৮ মেগাপিক্সেল ফিউশন মেইন ক্যামেরা এবং ৪৮ মেগাপিক্সেল ফিউশন আল্ট্রা ওয়াইড ক্যামেরা। ফটো: সংগৃহীত।

ফোল্ডেবল ডিজাইনটির একটি বিশেষ সুবিধা হল, ফোনটিকে বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলে ভাঁজ করে ট্রাইপড ছাড়াই ছবি ও ভিডিয়ো ধারণ করা যাবে। পেশাদার কন্টেন্ট ক্রিয়েটর এবং ভ্লগারদের কাছে এই ফিচারগুলো যথেষ্ট আকর্ষণীয় মনে হতে পারে।

ফোল্ডেবল ডিজাইনের কারণে আইফোন ডুও-তে ব্যাটারির সেটিং‌ও আলাদা। ফোনের দুই অংশেই রয়ছে ডুয়েল ব্যাটারি আর্কিটেকচার। দুটি ব্যাটারি সিস্টেম একসঙ্গে কাজ করে একটি সমন্বিত শক্তি ব্যবস্থা গঠন করে।

অ্যাপেলের দাবি, ফোনটির ইনার ডিসপ্লে ব্যবহার করে সর্বোচ্চ ৩১ ঘন্টা পর্যন্ত ভিডিয়ো প্লেব্যাক পাওয়া যাবে। আউটার ডিসপ্লে ব্যবহার করলে তা বেড়ে ৪৪ ঘণ্টা পর্যন্ত হতে পারে।

দুই ডিসপ্লে মিলিয়ে ব্যবহারের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ প্রায় ২৪ ঘণ্টার ইউসেজ পাওয়া যেতে পারে। দ্রুত চার্জিংয়ের মাধ্যমে ২০ মিনিটে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যাটারি চার্জ করা সম্ভব।

অ্যাপলের ফোল্ডেবল হ্যান্ডসেটটিতে কোন‌ও ফিজিক্যাল সিমের গল্প নেই। ফোনটিতে সচল থাকবে ই সিমে। বিশ্বের যে প্রান্তেই আপনি আইফোন ডুও নিয়ে যান, ই-সিমে ডিভাইসটি চালাতে হবে।

ফিজিক্যাল সিম ট্রে বাদ দেওয়ায় ফোনটির ভেতরে ব্যাটারি ও অন্যান্য হার্ড‌ওয়্যার প্রতিস্থাপনের জন্য অতিরিক্ত জায়গা পাওয়া গেছে বলে অ্যাপল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

আইফোন ডুও-র জন্য আইওএস ২৭-কে এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে ফোনটি ভাঁজ করে বা খুলে—দু’ভাবেই সহজে ব্যবহার করা যায়।

ফোনটি খুলে বড় ৭.৬ ইঞ্চির পর্দায় কাজ করার সময় একসঙ্গে একাধিক কাজ করা যাবে। যেমন, পর্দার একদিকে কোনও ওয়েবসাইট বা নথি খুলে রেখে অন্যদিকে নোট লেখা যাবে। আবার একদিকে ভিডিও দেখা বা ভিডিও কলে কথা বলার সময় অন্যদিকে অন্য কোনও অ্যাপ ব্যবহার করা যাবে।

এই বড় পর্দায় একই সঙ্গে দুটি অ্যাপ পাশাপাশি ব্যবহার করার সুবিধা থাকছে। ফলে বারবার একটি অ্যাপ বন্ধ করে অন্য অ্যাপ খুলতে হবে না।

এছাড়া অ্যাপলের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের সুবিধাও থাকবে। বড় পর্দায় কোনও নথি, ছবি বা ওয়েবপেজ দেখার সময় Siri-কে ব্যবহার করে বিভিন্ন কাজ করা যাবে।

অর্থাৎ আইফোন ডুও শুধু বড় পর্দার একটি ভাঁজযোগ্য ফোন নয়। ফোনটি খুললে সেটিকে অনেকটা ছোট ট্যাবলেটের মতো ব্যবহার করে একই সঙ্গে পড়াশোনা, কাজ, ভিডিও দেখা, নোট নেওয়া কিংবা তথ্য খোঁজার মতো একাধিক কাজ করা যাবে।

আইফোন ডুও-র আর‌ও একটি আরেকটি আকর্ষণীয় ফিচার হল অ্যাপল পেন্সিল সাপোর্ট।

অ্যাপল জানিয়েছে, ২০২৬ সালের শেষের দিকে অ্যাপল পেন্সিল উইদ ইউএসবি-সি ব্যবহার করে ভেতর এবং বাইরে—দুই ডিসপ্লেতেই নোট নেওয়া, ড্রয়িং করা এবং তথ্য মার্ক করার সুবিধা মিলবে। এর ফলে আইফোন ডুও শুধু স্মার্ট ফোন হিসেবেই নয় একটি উৎপাদনশীল ডিভাইস হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে।

আইফোন ডুও অ্যাপলের ইকোসিস্টেমের বাইরে নয়। ডিভাইসটি অ্যাপেল ইকোসিস্টেমের সঙ্গে যুক্ত থাকায় ম্যাক, অ্যাপল ওয়াচ, এয়ারপড, আইক্লাউড এবং অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের ব্যবহার আর‌ও সহজ হবে।

স্যামসাং, হুয়াওয়েই এবং মোটোরোলা একাধিক স্মার্টফোন নির্মাতা বহু আগেই ফোল্ডেবল স্মার্টফোনের জগতে প্রবেশ করেছে। এখন এই কোম্পানিগুলি একাধিক প্রজন্মের ফোল্ডেবল হ্যান্ডসেট‌ও বাজারে এনে ফেলেছে। অ্যাপলের মতো সুপার জায়েন্ট কোম্পানি ফোল্ডেবল আইফোন বাজারে আনতে অনেকটা সময় ব্যয় করল।

কথায় আছে, ওস্তাদের‌ মাইর শেষ রাতে। অ্যাপলের তুখোড় প্রযুক্তিবিদেরা হয়তো ফোল্ডেবল মোবাইল ফোনকে উৎকর্ষের শিখরে নিয়ে যাওয়ার জন্য‌ই ধৈর্য্য ধরে তাঁদের ল্যাবে এতদিন ধরে পরীক্ষানিরীক্ষা চালিয়ে এসেছেন। অবশেষে আত্মপ্রকাশ করল সেই ডিভাইস। অ্যাপলের ফোল্ডেবল স্মার্টফোন বলে কথা! স্মার্টফোন টেকনোলজির দুনিয়ায় আলোড়ন তো উঠবেই।

তবে দাম আকাশছোঁয়া বললেও ভুল‌ হবে। বরং বলা ভাল এই দামে চাঁদ ছুঁয়ে আসা যায়। ভারতের বাজারে ২ লক্ষ ৯৯ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে এর দামের শুরুয়াত। ২৩ অক্টোবর থেকে বিক্রি শুরু হ‌ওয়ার পর বোঝা যাবে, ভারতের বাজারে আইফোন ডুও ক্রেতাদের মধ্যে কতটা চাহিদা তৈরি করতে পারল।

Feature image is representational and collected.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com