ডেস্ক রিপোর্ট: রামপুরহাটের প্রাক্তন বিধায়ক ও রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু! রামপুরহাট শহরের পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের হাটতলায় আশিসবাবুর বাড়ি। রবিবার সকালে বাড়ি লাগোয়া তৃণমূলের দলীয় দফতর থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়। ২০০১-২০২১— রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়ক তিনি। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দ্বিতীয় মন্ত্রিসভায় ১৭ থেকে ২১ পর্যন্ত কৃষি দফতরের দায়িত্ব সামলেছেন আশিসবাবু। তার আগে প্রতিমন্ত্রীও ছিলেন। একুশের নির্বাচনে বিরাট সংখ্যাধিক্যে তৃণমূল নবান্নে ফিরলে তাঁকে বিধানসভার উপাধ্যক্ষ বানিয়ে দেন মমতা।
রামপুরহাট কলেজে অধ্যাপনা করতেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। পঁচাত্তর বছরের এই বর্ষীয়ান রাজনীতিকের দেহের পাশ থেকে একটি সুইসাইড নোটও উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটিকে প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যা বলেই মনে হচ্ছে। রাজ্য বিধানসভার প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকারের দেহ ময়াতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের অস্বাভাবিক মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক মহলে চাঞ্চল্য ছড়িয়েছে। একজন প্রাক্তন ডেপুটি স্পিকার এবং রাজ্যের প্রাক্তন ক্যাবিনেট মন্ত্রী গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলছেন— পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এমন ঘটনা আগে কখনও ঘটে নি।
২০২২ সালের ২১ মার্চ রাতে রামপুরহাটের বগটুই গ্রামে তৃণমূলের পঞ্চায়েত উপপ্রধান ভাদু শেখের খুনের বদলা নিতে ১১ জনকে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। সেই ঘটনায় বেশ অস্বস্তিতে পড়তে হয়েছিল আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়কে। ২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির ধ্রুব সাহার কাছে ২৪ হাজারের বেশি ভোটে হেরে যান আশিস। মমতার জামানায় তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদের চেয়ারম্যান ছিলেন আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। পালা বদলের পর রাজ্য জুড়েই তৃণমূলের নেতা-মন্ত্রী-বিধায়কেরা জনরোষের শিকার হন। আশিসের বিরুদ্ধেও অনেক অভিযোগ ছিল। সে’সবের তদন্ত দাবি করে বিজেপি। তারাপীঠ-রামপুরহাট উন্নয়ন পর্ষদে সরকারের বরাদ্দকৃত ৫০০ কোটি টাকার ফান্ডের একটি বড় অংশ নয়ছয় হয়েছে বলে অভিযোগ। রামপুরহাট পুরসভার দুর্নীতি নিয়েও আশিস ব্যানার্জির দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছে বিজেপি।

উন্নয়ন পর্ষদ ও পুরসভায় দুর্নীতি হয়েছে, তদন্ত হলেই বিপদে পড়বেন— এই চাপেই কি চরম সিদ্ধান্ত নিলেন রামপুরহাটের পাঁচ বারের বিধায়ক? ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া ‘সুইসাইড নোটে’ আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় যা লিখেছেন, তা মিডিয়ার হাতে এসেছে। “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়”— এটা লিখে গিয়েছেন তিনি। তিনি কোনও দুর্নীতিতে জড়িত নন, সুইসাইড নোটে তাও উল্লেখ করেছেন আশিসবাবু। তিনি লিখেছেন, “ছাত্রাবস্থা থেকেই রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। কোনও দিনই কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক হয়েছি বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানেও কোনও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হইনি। রাজনৈতিক বাগ্বিতণ্ডা হয়েছে। কখনও শত্রুতার রূপ নেয়নি। সর্বদা সব দলীয় অন্যায়কে মেনে নিতে না পারলেও প্রতিবাদ করতে পারিনি। সারাজীবন এক পয়সা কোনও কাজের বিনিময়ে নিইনি।’’
সুইসাইড নোটে তারাপীঠ-রামপুরহাট ডেভেলপমেন্ট অথরিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করে আশিস বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, “টিআরডিএ-তে জেনারেট মিটিং পরিচালনা করা ছড়া আমার আর কোনও দায়িত্ব ছিল না। আমি টেন্ডার কমিটিতে ছিলাম না। আমার চেকে সই করার ক্ষমতা ছিল না। আমি প্ল্যান পাস বা নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ইস্যুর ব্যাপারেও ছিলাম না। আমার সঙ্গে এ বিষয়ে কেউ কোনও দিন আলোচনা করেন নি।” তিনি আরও লিখেছেন— “আমাকে ম্যালাইন করার জন্য যা সব করা হল, তাকে ধিক্কার জানাই। আজ তাই মনে হচ্ছে, রাজনীতিতে আসাটাই ভুল হয়েছে। আমার বংশের ছেলেদের রাজনীতি না করার পরামর্শ দিচ্ছি। ওরা ওদের নিজ নিজ কাজের মধ্যে থাক।”
সুইসাইড নোটে কাউকে দায়ী করেন নি আশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। কোনও রাজনৈতিক নেতার নাম উল্লেখ করেন নি। যারা তাকে ম্যালাইন করেছে, তাদের ধিক্কার জানালেও সরাসরি কারও নাম সুইসাইড নোটে লিখে রেখে যান নি প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ। তিনি লিখেছেন— “আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।” সুইসাইড নোটে নিজের শিক্ষকতা জীবনের উল্লেখ করে প্রাক্তন অধ্যাপক লিখেছেন, “সারা জীবন শিক্ষকতা করেছি। কোনও দিন ক্লাস ফাঁকি দিইনি। স্পেশাল ক্লাস নিয়েছি। ছাত্রদের অনেককে বিনা পয়সায় পড়িয়েছি। ওদের প্রচুর ভালবাসা পেয়েছি।’’
Feature graphic is representational and designed by NNDC.