কলকাতা: ২১ জুলাইয়ের চেনা ছবি উধাও! ধর্মতলায় ভিক্টোরিয়া হাউসের সামনে সভা করার অনুমতিই পান নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে মঙ্গলবার কালীঘাট তৃণমূলকে সভা করতে হল বিড়লা তারামন্ডলের সামনে ক্যাথিড্রাল রোডে। ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলের সভা হয়েছে মেয়ো রোডে গান্ধী মূর্তির পাদদেশে। হাতে গোনা পাঁচ-ছয়জন বাদে তৃণমূলের বিধায়কদের প্রায় সবাই ঋতব্রত শিবিরে ঢুকে পড়েছেন। তবে একুশে জুলাইয়ের সভায় ভিড়ের নিরিখে ঋতব্রতপন্থী তৃণমূলকে হেসেখেলেই টেক্কা দিল কালীঘাট তৃণমূল।
২১ জুলাইয়ের সভায় মমতা কী বলেন, সে দিকে নজর ছিল রাজনৈতিক মহলের। মমতা অনেক কথাই বললেন কিন্তু জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্ট নিয়ে রাটি কাড়লেন না! ঠান্ডাঘর থেকে বের করে এনে কমিশনের রিপোর্ট সোমবার বিকেলে বিধানসভায় পেশ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। মঙ্গলবার দুপুরে একুশে জুলাইয়ের শহিদদের শ্রদ্ধা অর্পণ করতে গিয়ে একবারও তদন্ত কমিশনের রিপোর্টের কথা তুললেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০১৪ সালে তদন্তের রিপোর্ট সরকারের কাছে জমা দেন বিচারপতি সুশান্ত চট্টোপাধ্যায়। কিন্তু সেই রিপোর্ট জনসমক্ষে আনে নি মমতার সরকার। বিধানসভায় রিপোর্ট পেশের সময় শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, শহিদদের রক্তের সঙ্গে বেইমানি করে অনেকেই সম্পত্তির পাহাড় বানিয়েছেন। সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন ২১ জুলাই পুলিশের গুলিতে নিহতদের পরিবারগুলিকে ২৫ লক্ষ এবং আহতদের ৫ লক্ষ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সুপারিশ করেছিল। মমতার সরকার ১৩ জন শহিদের পরিবারকে মাত্র ৫ লক্ষ টাকা এবং আহতদের মাত্র ১৫ হাজার টাকা করে দিয়েছিল। এই নিয়েও বিধানসভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারকে তীব্র কটাক্ষ করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। মঙ্গলবার ক্যাথিড্রাল রোডের সভায় দাঁড়িয়ে শুভেন্দুর সমালোচনার কোনও জবাব দেন নি মমতা।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মমতা জবাব দেবেন কী! তাঁর জবাব দেওয়ার মুখ আছে? শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেছেন, মণীশ গুপ্তকে আড়াল করতেই ২১ জুলাই কমিশনের রিপোর্ট প্রকাশ করেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একই অভিযোগ ঋতব্রত শিবির ও প্রদেশ কংগ্রেসের। কংগ্রেস নেতৃত্ব তো মণীশ গুপ্তের বিচার দাবি করেছে সরকারের কাছে। মমতার সরকার কী কারণে তদন্ত কমিশনের রিপোর্ট চেপে রেখেছিল, তা নিয়েও শহিদ মিনারের সভা থেকে তদন্ত দাবি করেছেন প্রদেশ কংগ্রেসের নেতারা। একুশে জুলাইয়ের মঞ্চে দাঁড়িয়ে মণীশ নিয়েও মৌন মমতা।

তাঁদের সঙ্গে যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় প্রতারণা করেছেন, একুশে জুলাইয়ের শহিদদের পরিবারের সদস্যরাও তা বুঝে গেছেন। এবার অনেকেই তাই আমন্ত্রণ পেয়েও মমতার সভায় যান নি। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভায় বলেছেন, শহিদদের পরিবারের লোকেরা নতুন করে এফআইআর করলেই কমিশনের রিপোর্টের ভিত্তিতে পদক্ষেপ করবে সরকার। শহিদদের পরিবারের কেউ কেউ এফআইআর করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
জাস্টিস সুশান্ত চট্টোপাধ্যায় কমিশন নিয়ে শুভেন্দুর প্রশ্নের জবাব না দিয়ে মঙ্গলবার মমতা ব্যস্ত রইলেন ঋতব্রত শিবিরকে নিয়ে। ক্যাথিড্রাল রোডের সভায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “সব চোর চলে গিয়েছে। বেঁচে গিয়েছি।” ঋতব্রত শিবিরের উদ্দেশে মমতা বলেন, “ক্ষমা করুন। আপনাদের আর প্রয়োজন নেই। ধনে-মানে-প্রাণে ভাল থাকুন। নতুনরা সোনার খনি। তাদের নিয়ে নতুন করে সব শুরু করব।” মমতা আরও বলেন, “ইডি-সিবিআইয়ের ভয় দেখানো হচ্ছে। ভয় দেখিয়ে কিছু মানুষকে কিছুক্ষণের জন্য চুপ রাখা যায়। বিজেপির বি টিম দ্রুত ভেঙে যাবে। এরপর আমি জেলায় জেলায় বেরোব। আটকানোর ক্ষমতা কত আছে দেখতে চাই।”

ঋতব্রত গোষ্ঠীকে নিশানা করে মমতা বলেন, “প্রতীক যদি যায়, যাক। প্রতীক ওরা নিয়ে যদি বিজেপির সঙ্গে মিলেও যায়, মানুষের প্রতীক নিয়ে আমি লড়াই করব।” আগামী দিনে নির্বাচনে যে তিনি কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে প্রস্তুত, সেই ইঙ্গিত দিয়ে মমতা সভায় জানান, “আগামী দিনে বাংলায় জোট করব। ইন্ডিয়া জোটকে নিয়ে একসঙ্গে চলব। শুরু করলে শেষ করব না।” রাজনৈতিক মহল বলছে, মমতা কংগ্রেসের সঙ্গে জোট করতে চাইলেও কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে দুর্বল মমতার সঙ্গে জোট করবে তো? প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের এখন লক্ষ্য, নিচুতলায় তৃণমূলের সংগঠন ভেঙে নিজেদের সংগঠন মজবুত করা।