হেল্থ ডেস্ক: মানবদেহে শূকরের কিডনি কতদিন সচল থাকতে পারে? টিম অ্যান্ড্রুজের শরীরে শূকরের কিডনি ২৭১ দিন সচল ছিল। কিন্তু সেই রেকর্ডও ভেঙে গেছে বলে জানাচ্ছে বিশ্ববিখ্যাত হেল্থ জার্নাল ‘দ্য ল্যানসেট’। গত ৩ সেপ্টেম্বর ল্যানসেটে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র থেকে জানা যাচ্ছে যে একজন মার্কিন মহিলার শরীরে প্রতিস্থাপিত শূকরের কিডনি ২৮৫ দিন পর্যন্ত কাজ করেছে! ২০২৫ সালের ২২ নভেম্বর আমেরিকার ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালে ওই মহিলার শরীরে শূকরের কিডনি প্রতিস্থাপন করেছিলেন চিকিৎসকেরা। ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কিডনিটি সচল ছিল এবং ডায়ালিসিস ছাড়াই রোগিনী সুস্থ ছিলেন।
রোগিনীর পরিচয় গোপন রাখা হয়েছে ল্যানসেটের প্রতিবেদনটিতে। প্রকাশিত গবেষণাপত্রে দাবি করা হয়েছে, টিম অ্যান্ড্রুজ এবং অজ্ঞাত পরিচয় এই মহিলার শরীরে শূকরের কিডনির দীর্ঘ কার্যকারিতা এই সম্ভাবনাকে জোরালো করে তুলছে যে, ভবিষ্যতে ‘জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড পিগ কিডনি’ মানব কিডনি না পাওয়া পর্যন্ত ‘এনড স্টেজ রেনাল ডিজিস’ বা শেষ পর্যায়ের কিডনি বিকলের রোগীদের জন্য একটি ‘ব্রিজ’ হিসেবে ভাল কাজ করবে।

শূকরের অঙ্গ মানবদেহে প্রতিস্থাপনের কাজটি নিঃসন্দেহে খুব জটিল। প্রতিস্থাপনের আগে শূকরের জিনোমে একাধিক পরিবর্তন আনতে হয় বায়োটেক বিজ্ঞানীদের। মার্কিন মহিলার দেহে শূকরের যে কিডনিটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, তা তৈরি করেছে মার্কিন বায়োটেক সংস্থা ই-জেনেসিস। CRISPR gene-editing প্রযুক্তির সহায়তায় শূকরের জিনোমে এমনভাবে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে যাতে অঙ্গটি মানবদেহে প্রতিস্থাপিত হওয়ার পর প্রত্যাখ্যাত হওয়ার ঝুঁকি হ্রাস পায় এবং জুনোটিক ইনফেকশন-এর আশঙ্কা দূর হয়।
মানব দেহে কোনও পশুর অঙ্গ বা কোষ প্রতিস্থাপন করার প্রযুক্তিকে বলা হয় ‘জেনোট্রান্সপ্ল্যান্ট’। ‘জেনোট্রান্সপ্ল্যান্ট’ নিয়ে যে গবেষক ও বিজ্ঞানীরা কাজ করে চলেছেন, তাঁদের সামনে সবথেকে বড় চ্যালেঞ্জ হল, মানুষের শরীর কতদিন পর্যন্ত কোনও প্রাণীর অঙ্গকে সহ্য করতে সক্ষম? ২৭১ দিনের পর ২৮৫ দিনের ফল তাঁদের সন্তুষ্ট ও আশাবাদী করতে পেরেছে।
দ্য ল্যানসেটের গবেষণাপত্রে টিম অ্যান্ড্রুজের ঘটনাটিকে একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা বলে বর্ণনা করা হয়েছে। ৬৬ বছর বয়সি অ্যান্ড্রুজ শেষ পর্যায়ের কিডনি রোগী ছিলেন। তাঁর দুটি কিডনিই কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছিল। মানবদাতার কাছ থেকে কিডনি পাওয়ার প্রতীক্ষা ক্রমেই দীর্ঘতর হতে থাকায় ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে অ্যান্ড্রুজের শরীরে ‘জেনেটিক্যালি ইঞ্জিনিয়ার্ড পিগ কিডনি’ প্রতিস্থাপন করার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা।
২৭১ দিন কাজ করার পর প্রতিস্থাপিত কিডনিটি অচল হয়ে পড়ে। কিন্তু ২৭১ দিন ডায়ালিসিস থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন টিম অ্যান্ড্রুজ। ২০২৬-এর জানুয়ারিতে তাঁর শরীরে মানবদাতার কাছ থেকে সংগৃহীত কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয়।
শূকরের কিডনিই কেন?
বিশ্বজুড়ে কিডনি প্রতিস্থাপনের চাহিদা বিপুল। কিন্তু মানবদাতাদের কাছ থেকে কিডনি পাওয়ার প্রক্রিয়া খুব জটিল এবং এই কারণেই ডোনারের সংখ্যা সীমিত। ফলে অনেক রোগীকে বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়। এই সময় তাঁদের ডায়ালিসিসের ওপর নির্ভর করা ছাড়া উপায় থাকে না। যদি এমন একটি অঙ্গ আগে থেকেই তৈরি রাখা যায়, যা মানুষের শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব, তাহলে ডোনারের প্রত্যাশায় রোগীর পরিজনদের বসে থাকতে হবে না।

প্রাণীকুলের ক্ষেত্রে শূকরের অঙ্গই মানবদেহের জন্য সবথেকে উপযোগী বলে মনে করেন জৈবপ্রযুক্তিবিদেরা। কারণ, শূকরের কিডনির আকার ও কিছু শারীরবৃত্তীয় বৈশিষ্ট্য মানুষের কিডনির সঙ্গে তুলনামূলকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কিন্তু তা বলে সাধারণ শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে বসিয়ে দেওয়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন ‘জিন এডিটেড পিগ কিডনি’।
শূকরের কিডনিকে কীভাবে মানবদেহের উপযোগী করে তোলা হয়?
মানুষের প্রতিরোধ ব্যবস্থা শূকরের অঙ্গকে অচেনা বস্তু হিসেবেই চিহ্নিত করে। তাই বিজ্ঞানীরা শূকরের জিনোমেই পরিবর্তন আনছেন। ‘ই-জেনেসিস’-এর EGEN-2784-এর গবেষণায় তিন ধাপে শূকরের দেহে গুরুত্বপূর্ণ জিনগত পরিবর্তন করা হয়ে থাকে।
- মানুষের প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে তীব্রভাবে বিক্ষুব্ধ করতে পারে, এমন কিছু পিগ অ্যান্টিজেনকে প্রথমেই সরিয়ে দেওয়া হয়।
- দ্বিতীয় ধাপে শূকরের শরীরে সাতটি হিউম্যান ট্রান্সজিন যুক্ত করা হয়, যাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থা, প্রদাহ এবং রক্ত জমাট বাঁধার মতো গুরুতর বিষয়কে যথাযথ মোকাবিলা করা যায়।
- তৃতীয় ধাপে শূকরের অন্তঃজাত রেট্রোভাইরাস (porcine endogenous retrovirus) বা PERV নিষ্ক্রিয় করা হয়, যাতে রোগীর দেহে সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
অর্থাৎ বিজ্ঞানীরা শূকর থেকে কিডনি নিচ্ছেন না। তাঁরা বরং শূকরের কিডনি মানুষের শরীরে বসানোর উপযুক্ত করতে শূকরকেই জেনেটিক ইঞ্জেনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে পরিবর্তন করছেন।
আরও অনেক পথ দিতে হবে পাড়ি
২৮৫ দিন কি প্রমাণ করে যে সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে? না। নিঃসন্দেহে মানবদেহে প্রাণীর অঙ্গ প্রতিস্থাপনের গবেষণায় এটি একটি বিরাট অগ্রগতি। কিন্তু চূড়ান্ত সাফল্য এসেছে, এখনও এমন দাবি করা চলে না। কারণ, ৯ মাস কোনও অঙ্গ সচল থাকা আর অঙ্গটিকে ৫, ১০ কিম্বা ২০ বছর সচল রাখা—এক কথা নয়।

টিম অ্যান্ড্রুজের ক্ষেত্রে প্রতিস্থাপিত শূকরের কিডনিটি শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র রক্তনালীর আঘাতের কারণে ব্যর্থ হয়েছিল। অর্থাৎ অতি-তীব্র প্রত্যাখ্যান বা hyperacute rejection ঠেকানো গেলেও শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থা এবং ক্ষুদ্র রক্তনালির জটিল প্রতিক্রিয়া এখনও বড় সমস্যা।
ভবিষ্যতের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এবং জৈব প্রযুক্তি সংক্রান্ত গবেষণার অন্যতম লক্ষ্য হবে, কীভাবে শূকরের থেকে নেওয়া জেনোকিডনিকে আরও দীর্ঘদিন সচল রাখা যায়। শূকর বা অন্য কোনও প্রাণীর অঙ্গ মানুষের শরীরে বসানোর পর কোনও অজানা রোগজীবাণু বা ‘জুনোটিক ইনফেকশন’ মানব জাতির মধ্যে চলে আসে কিনা, এই দিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে বিজ্ঞানীদের।
AI generated feature image is representational.