কোনও বহিঃশক্তির প্ররোচনায় তারেক রহমান ২০০১-০৬ জামানার মতোই ভারত বিরোধিতার রাস্তা নিলে দিল্লি তাঁকে বেশি দিন সহ্য করবে না। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে আমাদের বিশেষ প্রতিবেদন—
ভারতের বিশ্বাসের জায়গা থেকে বিএনপির যে নাম কাটা গিয়েছিল, তার জন্য সবথেকে বেশি যদি কেউ দায়ী হয়ে থাকেন, তবে তিনি তারেক রহমান। ২০০১ থেকে ২০০৬— তারেকের কারণে কীভাবে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বিষিয়ে উঠেছিল, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক মহলের কাছে তা অজানা বিষয় নয়। তারেকের অবিমৃশ্যকারিতার খেসারত তাঁর মা খালেদাকে দিতে হয়েছে,দল হিসেবে বিএনপিকে দিতে হয়েছে আর তারেক রহমানকে তো দিতে হয়েছেই।
বাংলাদেশকে প্রায় জঙ্গিরাষ্ট্র বানিয়ে দিয়েছিলেন হাওয়া ভবনের তারেক
২০০১ থেকে ২০০৬ ছিল প্রয়াত খালেদা জিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্বের তৃতীয় (যদিও দ্বিতীয় বলাই যুক্তিসঙ্গত) মেয়াদ। জামায়াতে ইসলামিকে সঙ্গে নিয়ে সরকার চালিয়েছিলেন খালেদা। যদিও মায়ের হাত থেকে সরকারের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কার্যত কেড়ে নিয়েছিলেন তারেক। কুখ্যাত হাওয়া ভবনে বসে তারেক যা ঠিক করে দিতেন, প্রশাসন সেই ভাবে চলত। তারকে রহমান বিদ্যুতের খুঁটি বা খাম্বা সারা বাংলাদেশের জেলায়-উপজেলায়, গ্রামেগঞ্জে পুঁতে দিয়ে খাম্বা নির্মাণকারী সংস্থার কাছ থেকে মোটা টাকা কমিশন আদায় করেছিলেন বলে অভিযোগ। খাম্বাগুলির মাথায় আর বিদ্যুতের তারের লাইন বসানো হয় নি। তারবিহীন খালি খাম্বাগুলিকে পথের পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লোকে বলত খাম্বা তারেক।
ওই পাঁচ বছরে শুধু বিদ্যুতের খাম্বা থেকেই নয়, বাংলাদেশে এমন কোনও সেক্টর ছিল না, যেখান থেকে কমিশন কামান নি তারেক! শোনা যায়, ভারতে রতন টাটার সঙ্গে বিনিয়োগ নিয়ে বৈঠকে বসে নিজের ভাগা নিয়ে জানতে চেয়েছিলেন খালেদার বড় ছেলে। ২০০১-২০০৬, হাওয়া ভবনে বসে তারেক শুধু দুর্নীতিতেই ডুবে যান নি, তিনি বাংলাদেশকে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-য়ের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। অনুপ চেতিয়া, পরেশ বড়ুয়া, জীবন সিংহ সহ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জঙ্গি নেতারা বাংলাদেশে নিরাপদে আশ্রয় পেয়েছিলেন। উলফা সহ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন এবং আইএসআই স্পনসর্ড ভারত বিরোধী বিভিন্ন ইসলামিক জঙ্গি নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের ভেতর একাধিক শিবির স্থাপন করেছিল।

সেভেন সিস্টার্সে পাচারের উদ্দেশে চট্টগ্রাম বন্দরে আইএসআই এত আগ্নেয়াস্ত্র পাঠিয়েছিল, যা বহন করতে দশটি ট্রাক লেগেছিল! দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার মামলায় খালেদা সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফর রহমান বাবরের নাম পর্যন্ত জড়িয়ে যায়। কুখ্যাত বাবর ছিলেন খালেদার মন্ত্রিসভায় তারেকের সবথেকে বিশ্বস্ত আড়কাঠি। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে দশ ট্রাক অস্ত্র পাচার মামলায় বাবর আদালতে দোষী সাব্যস্ত হন এবং তাঁর যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। তারেক রহমান যে গোখরা সাপের লেজ দিয়ে কান চুলকোচ্ছেন, সে সময় বিএনপির অনেক সিনিয়র নেতা খালেদাকে সতর্ক করেছিলেন। কিন্তু ছেলেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন নি খালেদা।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক অবনতির ঝুঁকি কি আবার নেবেন তারেক?
২০০৬ পরবর্তী বাংলাদেশের ইতিহাস সবার জানা। তারেক রহমানকে নির্মম পরিণতি বরণ করতে হয়। এবং একদিক দিয়ে এটা ছিল তাঁর প্রাপ্য। দিল্লি নিঃসন্দেহে শেখ হাসিনার উপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল এমনকি হাসিনার রেজিমকে অন্ধভাবে মদত দিয়েছিল। কারণ একটাই— ২০০১ থেকে ০৬ বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটেছিল, ভারত যার পুনরাবৃত্তি চায় নি। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর পদ্মা-গঙ্গা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। সময় সব তিক্ততা ভুলিয়ে দেয়। সময় সবথেকে বড় শিক্ষাও দেয় মানুষকে। ইউনূস জামানায় ভারত এবং বিএনপি উভয়েই সম্পর্ক মেরামত করার কারণ খুঁজে পায়। গত ডিসেম্বরে খালেদা জিয়ার প্রয়াণের পর ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর তড়িঘড়ি ঢাকায় উড়ে গিয়ে তারেক রহমানকে মোদীর হয়ে সমবেদনা জানান।

ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জিতে বাংলাদেশে সরকার গঠন করে বিএনপি। তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হন। তারেক ক্ষমতায় বসার সময় মনে হয়েছিল, দুই প্রতিবেশীর মধ্যে তলানিতে যাওয়া সম্পর্কের সূচক ফের উপরে উঠতে শুরু করবে। কিন্তু সাত মাস পর মনে হচ্ছে, সম্পর্ক ইউনূসের সময়ের থেকে খুব বেশি অগ্রগতি হয় নি, বরং আরও অবনতি হওয়ার ঝুঁকির মধ্যে আছে। এখন তারেক রহমানকেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, তিনি ঝুঁকি কমিয়ে আনবেন নাকি আরও বাড়িয়ে তুলবেন।
নাকানিচুবানি খাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার
এমনিতেই ঘরের ভেতরে তারেকের অবস্থা ভাল নয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিষেবা শোচনীয়। রাজধানী ঢাকা বাদে দেশের বাকি অঞ্চলে দিনে সাত-আট ঘন্টা করে লোডশেডিং। জ্বালানি সংকট দূর হওয়ার কোনও আশু সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। গ্যাসের অভাবে গৃহস্থের হেঁসেলে রোজই রান্নাবান্না ব্যাহত হচ্ছে। বাংলাদেশে মোট রফতানি আয়ের ৮২ শতাংশ তৈরি পোশাক শিল্প থেকে আসে— গ্যাসের অভাবে সেই গার্মেন্টস সেক্টরে একের পর এক কারখানা বন্ধ হচ্ছে।
শেখ হাসিনার পতনের পর থেকে আর বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা যায় নি। শ্রমবাজারের অবস্থা খারাপ। মানুষের হাতে কাজ নেই। জিনিসপত্রের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। সমাজে অপরাধ বাড়ছে। বিএনপির পুরোন রোগ চাঁদাবাজি-জুলুম পুরোদমে ফিরে এসেছে। সংখ্যালঘুদের উপরে অত্যাচার বাড়ছে। বিএনপি সরকারের উপর নাগরিকদের ক্ষোভের পারদ কিন্তু চড়ছে।
আমন্ত্রণ অস্বীকার করার অর্থ অপমান
দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের পথে শেখ হাসিনা বড় কাঁটা নিঃসন্দেহে। ভারত শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের কাছে প্রত্যর্পণ করবে, এই আশা পরিত্যাগ করেই তারেক রহমানকে দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক মেরামতির পথে এগোতে হবে। তারেক প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থেকেই তাঁকে ভারত সফরে আনতে দিল্লি উদগ্রীব। কিন্তু তারেক সাড়া দিচ্ছেন না। তিনি মালয়েশিয়া ও চিন সফর করে এসেছেন। অথচ সবার আগে আমন্ত্রণ ছিল ভারতের। ব্রিকস সম্মেলনের আউটরিচ সেশনে যোগদান করতে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে ভারত। সেই আমন্ত্রণও শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেন নি তারেক!

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবীর অভিযোগ করেছেন, ভারতের আমন্ত্রণে আন্তরিকতার অভাব রয়েছে। একটি স্বাধীন-সার্বভৌম দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানায় নি ভারত, বিমস্টেকের প্রধান হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এটা আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যানের একটা উছিলা হল! বাংলাদেশের এই আচরণকে কী চোখে দেখবে দিল্লি? আমন্ত্রণ অস্বীকার করার আরেক অর্থ অপমান!
দিল্লি কিন্তু অপমানের শোধ তোলে
এই ধরনের অশিষ্টাচারকে ভারতের কূটনীতিক মহল ভাল চোখে দেখে না। শেখ হাসিনার আমলে ২০১৩ সালে রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখোপাধ্যায় বাংলাদেশ সফরে গেলে ভারতের দিক থেকে আমন্ত্রণ থাকার পরেও প্রণবের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন নি বেগম খালেদা জিয়া। এই ঘটনা বিএনপির সঙ্গে ভারতের দূরত্ব আরও বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ বলে মনে করেন দুই দেশের রাজনৈতিক মহল। তারেক রহমান আর যাই হোন, খুব চৌকস ও বাস্তব বুদ্ধিসম্পন্ন রাজনীতিক নন। তিনি কোনও বহিঃশক্তির প্ররোচনায় ২০০১-০৬ জামানার মতোই ভারত বিরোধিতার রাস্তা নিলে দিল্লি তাঁকে বেশি দিন সহ্য করবে না।
মোদী যদি মনে করেন তারেক রহমানের গদি টলিয়ে দেওয়া দরকার, এরদোয়ান, শাহবাজ শরিফ এমনকি শি জিনপিং— কেউই তাঁকে রক্ষা করতে পারবেন না। এটাই বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক নিয়তি!
AI generated feature image is representational.