ডেস্ক রিপোর্ট: অভয়া কান্ডে বড় পদক্ষেপ রাজ্যের বিজেপি সরকারের। আরজি করে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের তদন্তে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগে রাজ্যের তিন আইপিএস আধিকারিককে সাসপেন্ড করল সরকার। শুক্রবার নবান্নে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এ কথা ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। সাসপেন্ড হওয়া তিন আইপিএসের নাম বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ও অভিষেক গুপ্তা। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, আরজি করে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের মামলার ফাইল আবার খোলা হচ্ছে। এই ঘটনায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভূমিকাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন শুভেন্দু অধিকারী।
২০২৪ সালের ৮ আগস্ট রাতে আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের জরুরি বিভাগের চার তলার সেমিনার হলে ৩১ বছরের তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ করে খুন করা হয়। এই ঘটনায় তোলপাড় হয়ে যায় রাজ্য। স্তম্ভিত হয়ে পড়ে গোটা দেশ এমনকি বিদেশেও পশ্চিমবঙ্গের ভাবমূর্তি কলঙ্কিত হয়। তখন কলকাতার পুলিশ কমিশনার ছিলেন বিনীত গোয়েল। ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ছিলেন কলকাতা পুলিশের ডিসি (সেন্ট্রাল) পদে আর অভিষেক গুপ্তা সামলাচ্ছিলেন ডিসি-নর্থের দায়িত্ব। মমতা ঘনিষ্ঠ এই তিন অফিসার তদন্তকে প্রভাবিত করেছিলেন বলে অভিযোগ। এমনও অভিযোগ সে সময় উঠেছিল, খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশেই নাকি প্রকৃত ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করেছিলেন কলকাতা পুলিশের এই তিন আধিকারিক।
অভয়া কান্ডের বিচার চেয়ে আন্দোলনে উত্তাল হয়ে উঠেছিল রাজধানী কলকাতা সহ গোটা রাজ্য। জনগণের ক্ষোভ সামাল দিতে বিনীত গোয়েলকে কলকাতার পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে সরিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বিনীতকে এসটিএফ-এর এডিজি পদে বদলি করে দেয় নবান্ন। শুক্রবার নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “ওই সময়ে বিনীত গোয়েল, ইন্দিরা মুখোপাধ্যায় ও অভিষেক গুপ্তার ভূমিকা কী ছিল, জানতে তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত শুরু হবে। আপাতত তিনজনকেই সাসপেন্ড করা হচ্ছে।” বর্তমানে বিনীত রাজ্য পুলিশের ডিজি (আইবি) পদে রয়েছেন। অভিষেক গুপ্তা ইএফআর-এর কমান্ডেন্ট পদে দায়িত্ব পালন করছেন। আর ইন্দিরা সিআইডি-র স্পেশাল সুপারিনটেনডেন্ট পদে আছেন। তবে সরকার বরখাস্তের আদেশ দেওয়া মাত্রই তা কার্যকর হওয়ায় তিনজন আইপিএসই এখন পদ থেকে অপসৃত।
তিন আইসিএস-এর সাসপেনশন প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, “অ্যাজ আ হোম মিনিস্টার, আমি চার্জ নেওয়ার পর মাননীয় চিফ সেক্রেটারি ও মাননীয় হোম সেক্রেটারির কাছে লিখিত জানতে চেয়েছিলাম, আরজি করের ঘটনা এবং তার পরবর্তী কিছু বিষয় নিয়ে। কীভাবে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ আধিকারিকেরা ঘটনাটা হ্যান্ডেল করেছিলেন, তা জানতে চেয়েছিলাম। তথ্য অনুসন্ধানের পর আপাতত একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিলাম।” মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, “রাজ্যের পুলিশমন্ত্রী হিসেবে আমি ঘোষণা করছি, ওই সময়ে যা ঘটেছিল, তা মিসহ্যান্ডলিং করা, যথাযথভাবে এফআইআর করে পদক্ষেপ করার মতো প্রাথমিক যে বিষয়গুলো ছিল, সেখানে সবথেকে বড় অভিযোগ ছিল দু’জন পুলিশ অফিসারের বিরুদ্ধে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম থেকে পাওয়া খবরের ভিত্তিতে আমরা জানতে পারি, তাঁরা নির্যাতিতার পরিবারকে রাজ্য সরকারের হয়ে টাকা দিতে চেয়েছিলেন।”
শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, “সিবিআইয়ের তরফে যে তদন্ত হচ্ছে, সেখানে হস্তক্ষেপের প্রয়োজন নেই। রাজ্য সরকারের তরফ থেকে সে সময় রাজ্যের পুলিশের কী ভূমিকা ছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।” রাজ্যের নতুন সরকারের বক্তব্য হল, অভয়ার মাকে এক রকমের ঘুষ জোর করে দেওয়ার চেষ্টা হয়েছিল। তার তদন্ত হবে। ঘটনার পর পর তদন্তে যুক্ত রাজ্য পুলিশের অফিসারদের সঙ্গে কাদের কাদের কথা হয়েছিল, তদন্ত করে দেখার নির্দেশ দিয়েছে বিজেপি সরকার। পুলিশ অফিসারদের কল লিস্ট, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাটও স্ক্যানারের তলায় থাকবে।” শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “সে সময় কার সঙ্গে কার কথা হয়েছে, তখনকার মুখ্যমন্ত্রী কিংবা কোনও মন্ত্রীর সঙ্গে পুলিশের তদন্তকারী অফিসারদের সঙ্গে তদন্তের বিষয়ে কোনও কথা হয়েছে কিনা, সব খুঁজে বার করব। এগুলোও তদন্তের অংশ।”
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজের নির্যাতিতা নিহত চিকিৎসকের মা সদ্য সমাপ্ত বিধানসভা নির্বাচনে পানিহাটি থেকে বিজেপির টিকিটে বিজয়ী হয়েছেন। মেয়েকে নির্যাতন ও হত্যার বিচার দাবিতেই জনগণের দরবারে গিয়েছিলেন তিনি। গত বুধবার পানিহাটির তৎকালীন বিধায়ক নির্মল ঘোষ, সোমনাথ দাস ও সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়ের গ্রেফতারির দাবিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন পানিহাটির বর্তমান বিজেপি বিধায়ক রত্না দেবনাথ। অভয়া কান্ডের সঙ্গে এরাও জড়িত বলে মনে করেন রত্নাদেবী। অভয়া জননীর অভিযোগ, “তাঁর মেয়ের দেহের দ্বিতীয় ময়নাতদন্তে বাধা দিয়েছিলেন প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক নির্মল ঘোষ সহ বাকি দু’জন। নথি হস্তান্তর না করে নির্যাতিতার দেহ তড়িঘড়ি সৎকার করার পিছনে তিনজনের হাত আছে।” মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী আরজি কর কান্ড নিয়ে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ায় খুশি নির্যাতিতার মা।
Feature graphic is representational and designed by NNDC.