স্পেশাল ফিচার: নির্বাচন কমিশনের সর্বশেষ ডিলিমিটেশন ২০০৮ সাল থেকে কার্যকর হয়। এর আগে পর্যন্ত কলকাতা তিনটি সংসদীয় ক্ষেত্রে বিভক্ত ছিল- কলকাতা উত্তর, কলকাতা দক্ষিণ ও কলকাতা মধ্য। ডিলিমিটেশন বা সীমানা পুনর্বিন্যাসের পর কলকাতা মধ্য সংসদীয় আসনটি বিলুপ্ত হয়ে যায়। যাদবপুর লোকসভা আসনটিকেও কলকাতার মধ্যেই ধরেন অনেকে। ৩৪ বছরের দীর্ঘ বাম জামানায় বাম শক্তি সবথেকে দুর্বল ছিল কলকাতার তিনটি লোকসভা- কলকাতা উত্তর, কলকাতা দক্ষিণ ও মধ্যে। যাদবপুর যদিও বরাবরই সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি ছিল। কিন্তু ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর লোকসভাতেও ধরাশায়ী হতে হয়েছিল সিপিএমকে। যাদবপুর সহ কলকাতার চারটি লোকসভা আসনেই সে’বার ইন্দিরা হাওয়ার জোরে জয়লাভ করেছিল কংগ্রেস।
লালদুর্গ যাদবপুর থেকে অপ্রত্যাশিত জয় পেয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতার বয়স তখনও ২৯ পেরোয় নি। প্রতিপক্ষ ছিলেন আর কেউ নন, হেভিওয়েট সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। পেশায় ব্যারিস্টার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের বয়স তখন পঞ্চান্ন। পর পর তিনটি লোকসভা নির্বাচনে বিজয়ী সোমনাথ ততদিনে সিপিএমের বড় নেতা ও দেশের সংসদীয় রাজনীতির অন্যতম মুখ। ৭৭ ও ৮০-র লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর থেকেই বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছিলেন তিনি। যাদবপুরের মতো সিপিএমের শক্ত ঘাঁটিতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বী ও সিটিং এমপিকে আনকোরা মমতা হারিয়ে দেবেন, তা কেউ কল্পনাও করতে পারে নি।
কিন্তু বিধির বিধান খন্ডাবে কে! ১৯৮৪-র ৩১ অক্টোবর দিল্লিতে নিজের বাসভবনে দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ডিসেম্বরে লোকসভা নির্বাচন নির্ধারিতই ছিল। অক্টোবর থেকেই সরকার ও বিরোধী শিবিরে ভোটের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছিল। জুন মাসে অমৃতসরের স্বর্ণ মন্দিরে সেনা অভিযান ঘটে গেছে। শিখ সম্প্রদায়ের ভাবাবেগে আঘাত লেগেছে। একাধিক কারণে দেশে ইন্দিরার জনপ্রিয়তা পড়তির দিকে। কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অসন্তোষ বাড়ছে। বিরোধীরা জোট বেঁধে শাসক কংগ্রেসকে বেগ দেওয়ার পরিকল্পনায় ব্যস্ত। কিন্তু ইন্দিরা গান্ধীর মৃত্যু সব কিছু পাল্টে দিল।
চল্লিশ বছরের রাজীব গান্ধী মায়ের চেয়ারে গিয়ে বসলেন এবং দলের হাল ধরলেন। সারা দেশে প্রবল ইন্দিরা হাওয়া। দেশবাসীর সহানুভূতিতে ভেসে যাচ্ছিলেন রাজীব। এই রকম পরিস্থিতিতে ডিসেম্বরের শেষে লোকসভা নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করল নির্বাচন কমিশন। ভোটের ফল ঘোষণা শুরু হতেই দেখা গেল প্রবল ইন্দিরা হাওয়ায় বিরোধীরা ধুয়েমুছে সাফ। চন্দ্রশেখর, হেমবতী নন্দন বহুগুণা, অটলবিহারী বাজপেয়ী এবং রামজেঠ মালানির মতো বাঘা বাঘা বিরোধী নেতারা পর্যুদস্ত। ইন্দিরা হাওয়ায় পশ্চিমবঙ্গে পর্যন্ত সিপিএমের ভিত নড়ে যায়। ৪২টি আসনের মধ্যে বামফ্রন্ট জেতে ২৬টিতে। কংগ্রেস (আই) জয়লাভ করে ১৬টি আসনে।
কংগ্রেসের জেতা ১৬ সিটের একটিই ছিল লালদুর্গ যাদবপুর। যাদবপুর লোকসভা কেন্দ্রে ১৯ হাজার ৬৬০ ভোটে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সাংসদ হয়েছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মমতা পেয়েছিলেন ৩ লক্ষ ৩১ হাজার ৬১৮ ভোট। সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় পেয়েছিলেন ৩ লক্ষ ১১ হাজার ৯৫৮ ভোট। সিপিএমের দুর্ভেদ্য ঘাঁটিতে মমতা পেয়েছিলেন ৫০.৮৭ শতাংশ ভোট। সোমনাথ পেয়েছিলেন ৪৭.৮৫ শতাংশ ভোট। দেশের সংসদীয় রাজনীতির বিখ্যাত মুখ সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে হারিয়ে ‘জায়েন্ট কিলার’ তকমা পেয়েছিলেন কালীঘাটের পটুয়া পাড়ার অখ্যাত মেয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
যাদবপুরে পরাজয়ের কয়েক মাস পরেই উপনির্বাচনে বোলপুর আসনে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে প্রার্থী করে সিপিএম। বোলপুরে বড় ব্যবধানে কংগ্রেসের হেভিওয়েট প্রার্থী সিদ্ধার্থশংকর রায়কে বড় ব্যবধানে হারিয়ে সংসদে যান সোমনাথ। এই আসন থেকেই টানা সাতবার জয় ছিনিয়ে আনেন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়। চতুর্দশ লোকসভায় অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেছিলেন তিনি। দলের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা না দেওয়ায় ২০০৮ সালে প্রখ্যাত এই সাংসদকে বহিষ্কার করে সিপিএম।
১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর থেকে জয়ের আগে পর্যন্ত রাজ্যের রাজনীতিতে মমতাকে কেউ চিনত না। যাদবপুরের জয় ২৮ বছরের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে রাতারাতি বিখ্যাত করে তোলে। সে’বার লোকসভার নির্বাচিত সদস্যদের মধ্যে মমতাই ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় উঠে আসে তাঁর নাম। সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও জায়গা করে নেন তিনি। রাজীব গান্ধীর নজরে পড়েন মমতা। মমতাকে আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয় নি। ইন্দিরার মৃত্যু না হলে ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনে কংগ্রেস ও রাজীব গান্ধীর পক্ষে সহানুভূতি হাওয়া উঠত না দেশে। তাহলে যাদবপুরের মতো লালদুর্গে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েট প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে লড়তে নেমে আনকোরা মমতা কি জিততেন? সম্ভবত না।
৮৪-তে যাদবপুরে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় হেরে গেলে কংগ্রেসের ভেতরে ক্ষমতা দখলের দৌড়ে নিঃসন্দেহে পিছিয়ে পড়তেন তিনি। দলে বড় জায়গা পেতে অনেক বেগ পেতে হত মমতাকে। ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৯- এই পাঁচ বছরে মমতা নিঃসন্দেহে নিজের পরিশ্রমেই বাংলার বাম বিরোধী রাজনীতির অন্যতম লড়াকু নেত্রী হয়ে ওঠেন। কিন্তু যাদবপুরে হেরে গেলে মমতার পক্ষে সুযোগের সদ্ব্যবহার করা কঠিন হয়ে পড়ত। ৮৯-এর লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুর থেকে দাঁড়িয়ে সিপিএমের মালিনী ভট্টাচার্যের কাছে বড় ব্যবধানে হেরেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কিন্তু ততদিনে মমতা পশ্চিমবঙ্গের কংগ্রেস শিবিরের বড় নেত্রী।রাজীব গান্ধীর গুডবুকে তাঁর নাম উঠে গেছে। অল ইন্ডিয়া ইয়ুথ কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক পদে মমতাকে বসিয়ে দিয়েছেন রাজীব। প্রদেশ যুব কংগ্রেসের দায়িত্বও মমতার কাঁধে।
১৯৯০-এর ১৬ আগস্ট প্রদেশ কংগ্রেসের ডাকা কলকাতা বনধের দিন হাজরা মোড়ে মিছিল করার সময় সিপিএমের লোকদের হাতে আক্রান্ত হন মমতা। সেদিন মমতাকে মেরে আহত করে আরও বড় নেত্রী বানিয়ে দেয় সিপিএম। ১৯৯১-এর মধ্যবর্তী লোকসভা নির্বাচনে আর যাদবপুরে দাঁড়াবার ঝুঁকি নেন নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি বেছে নেন কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি দক্ষিণ কলকাতাকে। দক্ষিণ কলকাতা কেন্দ্রে সিপিএমের তাত্ত্বিক নেতা বিপ্লব দাশগুপ্তকে হারিয়ে পুনরায় সাংসদ নির্বাচিত হন মমতা। ১৯৯১ থেকে ২০০৯- টানা ছয়বার দক্ষিণ কলকাতা আসন থেকে জয়লাভ করেন তিনি। অন্যদিকে ১৯৮৯ থেকে ২০০৪- টানা ছয়বার যাদবপুর লোকসভা আসন নিজের দখলে রাখে সিপিএম। ২০০৯-এ যাদবপুরের গড় হাতছাড়া হয় বামেদের। এখনও পর্যন্ত আর গড় পুনর্দখল করতে পারে নি সিপিএম। যাদবপুর লোকসভার অন্তর্গত সাতটি বিধানসভাই এখন তৃণমূলের দুর্ভেদ্য ঘাঁটি।
১৯৮৯-এর লোকসভা নির্বাচনে যাদবপুরের পর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে ফের হারের মুখ দেখেন নন্দীগ্রামে। ১৯৮৪-র লোকসভা নির্বাচনের ‘জায়েন্ট কিলার’ মমতা নিজেই এখন বাংলার নাম্বার ওয়ান ‘জায়েন্ট লিডার’। ভবানীপুরে মমতার বিরুদ্ধে লড়তে নেমেছেন বিরোধী শিবিরের আরেক ‘জায়েন্ট লিডার’ শুভেন্দু অধিকারী, যে শুভেন্দুর কাছে নন্দীগ্রামে পরাজিত হতে হয়েছিল মমতাকে।
Feature graphic is representational and designed by NNDC.