স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবথেকে বড় ‘জায়েন্ট কিলার’-এর নাম রাজ নারায়ণ। পাঠকদের সেই কাহিনির পূর্বাপর সব শোনালেন উত্তম দেব-
ভারতের রাজনীতিতে রায়বরেলি একটি ঘটনাবহুল নাম। উত্তরপ্রদেশের এই জেলা বরাবরই কংগ্রেসের দুর্ভেদ্য দুর্গ। একাধিকবার রায়বরেলি থেকে নির্বাচিত হয়ে সংসদে গিয়েছেন ইন্দিরা গান্ধী। উত্তরপ্রদেশে কংগ্রেসের আচ্ছে দিন বহু কাল আগেই অস্তমিত। তারপরেও রায়বরেলির মানুষ কংগ্রেসকে খালি হাতে ফেরায় না। ২০২৪-এর লোকসভা ভোটে রায়বরেলি থেকেই সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন রাহুল গান্ধী ৩ লক্ষ ৯০ হাজার ৩০ ভোটের বিশাল মার্জিনে জিতে। আবার এই রায়বরেলিই ইন্দিরার রাজনৈতিক জীবনকে কলঙ্কিত, অস্থির এমনকি লাঞ্ছিত করে ছেড়েছিল।
১৯৭১-এর লোকসভা নির্বাচনে রায়বরেলি কেন্দ্র থেকে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন সমাজতান্ত্রিক নেতা রাজ নারায়ণ। ১ লক্ষ ১১ হাজার ৮১০ ভোটে রাজ নারায়ণকে পরাজিত করেছিলেন ইন্দিরা। ইন্দিরার প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা ১ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩০৯টি। রাজনারায়ণ পেয়েছিলেন ৭১ হাজার ৪৯৯টি ভোট। প্রদত্ত বৈধ ভোটের ৬৪.৪ শতাংশ পেয়েছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। রাজ নারায়ণের জুটেছিল মাত্র ২৫. ১ শতাংশ ভোট। কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটি রায়বরেলিতে এমন বিশাল বিজয় অর্জনের পর ইন্দিরা বোধ হয় স্বপ্নেও ভাবেন নি, মাত্র চার বছর পর এই রায়বরেলিই তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অমাবস্যার অন্ধকার নামিয়ে আনবে! কিন্তু নিয়তি খন্ডানো কার সাধ্য।
ভোটে হেরে মামলা করলেন রাজ নারায়ণ। অভিযোগ, রায়বরেলিতে জিততে সরকারি ক্ষমতার অপব্যাবহার করেছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। এলাহাবাদ হাইকোর্টে ‘ইলেকশন পিটিশন’ দায়ের হল। আদালতে দায়ের করা ইলেকশন পিটিশনে রাজ নারায়ণ অভিযোগ করেছিলেন, রায়বরেলি কেন্দ্রে তাঁর হয়ে ভোটের প্রচারের জন্য রায়বরেলির জেলাশাসক ও পুলিশ সুপার এবং যশপাল কাপুর নামে আরও একজন গেজেটেড অফিসারকে ব্যবহার করেছিলেন ইন্দিরা গান্ধী। জনপ্রতিনিধিত্ব আইন-১৯৫১’র ১২৩ (৭) ধারা অনুযায়ী যা বেআইনি।
১৯৭৫-এর ১২ জুন মামলার রায় দিলেন বিচারপতি জাস্টিস জগমোহন লাল সিনহা, যে রায় রচনা করল ইতিহাস। ইন্দিরার গান্ধীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে মান্যতা দিয়ে রায়বরেলি কেন্দ্রের নির্বাচন বাতিল করে দিল আদালত। ছয় বছরের জন্য ইন্দিরার ভোটে দাঁড়ানোর অধিকারও কেড়ে নিল এলাহাবাদ হাইকোর্ট। রায় বেরোনোর ১৩ দিনের মাথায় ২৫ জুন মধ্যরাতে দেশে প্রথমবারের মতো অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা মোকাবিলায় জরুরী অবস্থা জারি করলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। একদিন আগেই এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ের উপর শর্তসাপেক্ষে স্থগিতাদেশ জারি করে সুপ্রিম কোর্ট। অনেকেই অভিযোগ করেন, নিজের পদ বাঁচাতে প্রভাব খাটিয়ে নিজের অনুকুলে সেই রায় বের করেছিলেন ইন্দিরা।
১৯৭৪ থেকেই ইন্দিরা গান্ধীর সময়টা ভাল যাচ্ছিল না। পঁচাত্তরে দেশের পরিস্থিতির আরও অবনতি হয়। ক্ষমতা হারানোর আতঙ্ক ইন্দিরার মনে জাঁকিয়ে বসে। ১২ জুন এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায় ইন্দিরা গান্ধীর অবশিষ্ট মানসিক স্থিতিও নষ্ট করে দেয়। দেশের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করেন, এলাহাবাদ হাইকোর্টের রায়ে ঘাবড়ে গিয়েই অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে ‘এমার্জেন্সি’ ঘোষণা করে বসেন ইন্দিরা। যা তাঁর রাজনৈতিক জীবনের দুরপনেয় কলঙ্ক।
১৯৭৭ সালের ১৬ থেকে ২০ মার্চ ষষ্ঠ লোকসভা গঠনের জন্য দেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। জরুরি অবস্থার মধ্যেই নির্বাচন ঘোষণা করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ২১ মার্চ ভোটের ফল ঘোষণার আগে জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। সাতাত্তরের ঐতিহাসিক নির্বাচনে ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর কৃতকর্মের জন্য শাস্তি দিয়েছিলেন ভারতের জনতা জনার্দন। রায়বরেলি কেন্দ্র থেকেই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন ইন্দিরা। প্রতিপক্ষ সেই রাজ নারায়ণ। গণনা শুরু হতেই চমকের পালা। রায়বরেলির মানুষ ইন্দিরাকে প্রত্যাখ্যান করে রাজ নারায়ণের গলায় বিজয়মাল্য পরিয়ে দিলেন। কংগ্রেসের দুর্গে ৫৫ হাজার ২০২ ভোটে ইন্দিরা গান্ধীকে পরাজিত করে ‘জায়ান্ট কিলার’ হলেন রাজ নারায়ণ। রাজ নারায়ণ পেয়েছিলেন ১ লক্ষ ৭৭ হাজার ৭১৯টি ভোট। ইন্দিরা গান্ধীর জুটেছিল ১ লক্ষ ২২ হাজার ৫১৭টি ভোট। প্রদত্ত বৈধ ভোটের ৫১.৯ শতাংশ টেনে নিয়েছিলেন রাজ নারায়ণ। দেশের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা পেয়েছিলেন মাত্র ৩৫.৭ শতাংশ ভোট। স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের সংসদীয় রাজনীতির ইতিহাসে নিঃসন্দেহে সবথেকে বড় ‘জায়েন্ট কিলার’-এর নাম রাজ নারায়ণ।
রাজ নারায়ণ একটু খ্যাপাটে প্রকৃতির ছিলেন। মাথায় অদ্ভুত ধরণের রঙ-বেরঙের ফেট্টি বাঁধতেন। আর মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য করতেন অদ্ভুত সব কান্ডকারখানা। ভোট গণনার সকালেও কেউ ভাবতে পারেন নি, রায়বরেলির মতো কংগ্রেসের শক্ত ঘাঁটিতে ইন্দিরা গান্ধীর মতো প্রবল পরাক্রমশালী নেত্রী রাজ নারায়ণের হাতে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হবেন। এমার্জেন্সির সময় এই ইন্দিরাকেই তেল মারতে গিয়ে কংগ্রেসের সভাপতি দেবকান্ত বড়ুয়া বলেছিলেন, “ইন্দিরা ইজ ইন্ডিয়া- ইন্দিরাই ভারতবর্ষ”! কিন্তু সেদিন ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষ প্রমাণ করেছিলেন, সব ক্ষমতা তাদের হাতে, তারাই ক্ষমতাসীনদের ভাগ্যবিধাতা।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।
Feature graphic is representational and designed by NNDC.