ইন্দিরা গান্ধী: ইতিহাস তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা অবশ্যই দিয়ে যাবে - nagariknewz.com

ইন্দিরা গান্ধী: ইতিহাস তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা অবশ্যই দিয়ে যাবে


দোষ ও দুর্বলতাগুলির জন্য তাঁর যথেষ্ট সমালোচনা করার পরেও ইন্দিরাকে ভুলে যাওয়ার কোনও সুযোগ নেই।‌ গায়ের জোরে ইন্দিরার কৃতিত্বকে ভুলিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হলেও ইতিহাস তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা দিয়েই যাবে। আত্ম বলিদান দিবসে দেশের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধাঞ্জলি-

স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতের রাজনীতির ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত সর্বাপেক্ষা বর্ণময় তদুপরি বিতর্কিত চরিত্রটির নাম নিঃসন্দেহে ইন্দিরা গান্ধী।‌ পিতা জ‌ওহরলালের ক্যারিশ্মাও ম্লান মেয়ে ইন্দুর কাছে। নেহেরু ভাবুক ছিলেন, দার্শনিক ছিলেন। বাগ্মিতায় অসাধারণ। কিন্তু তাঁর ভীরুতা, দোলাচল মানসিকতা ও অকারণ আবেগের বড় মূল্য দিতে হয়েছে দেশকে। তুলনায় সঙ্কটের মুহূর্তে সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনেক বেশি দৃঢ়তা দেখিয়েছেন ইন্দিরা। ১৯৮৪-র আজকের দিনেই ( ৩১ অক্টোবর ) নিজের বাসভবনে দেহরক্ষীদের গুলিতে প্রাণ দিয়েছিলেন ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী। ৩৮ বছরে গঙ্গা-যমুনা দিয়ে অনেক জল গড়িয়ে গেছে। কংগ্রেস মৃতপ্রায়। দিল্লী মোদীময়। এক প্রকার বিস্মৃতির অতলেই তলিয়ে গেছেন ইন্দিরা। কিন্তু ভারতের সব থেকে বর্ণময় ও বিতর্কিত প্রধানমন্ত্রীকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদাটুকু দিতে নিশ্চয়‌ই কার্পণ্য করবে না ইতিহাস।

পিতা মাথার উপর ছাতা না ধরলে হয়তো রাজনীতিতেই আসা হত না ইন্দিরার। ভুবন ভোলানো রূপ বলতে যা বোঝায়, বিধাতা তাই দিয়েছিলেন নেহেরু তনয়াকে। কৈশোরে অন্তর্মুখী। পড়াশোনায় অমনোযোগী। যৌবনে জীবনসঙ্গী চয়নে রীতিমতো বিদ্রোহিনী। ইন্দিরা যখন পুরোপুরি রাজনীতিতে এলেন, নেহেরুর সতীর্থরা তাঁকে গোনার মধ্যে ধরেন নি। নেহেরুর মৃত্যুর পর কংগ্রেসের ভেতরে কোনঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। লাল বাহাদুর শাস্ত্রীর অকাল ও আকস্মিক প্রয়াণ না হলে ইন্দিরার রাজনৈতিক জীবনের অন্য রকম হ‌ওয়ার যথেষ্ট‌ই সম্ভাবনা ছিল। যখন প্রধানমন্ত্রী হলেন, তখনও ‌দলের ভেতরে ও‌ বাইরে অনেকেই তাঁকে হালকাভাবে নিয়েছিলেন। প্রখ্যাত সমাজতান্ত্রিক নেতা ডঃ রামমনোহর লোহিয়ার ইন্দিরা সম্পর্কিত একটা ‌উক্তি তো বিখ্যাত হয়ে গেছে। লোহিয়া বলেছিলেন- ‘ঘুঙ্গি গুরিয়া’, বোবা পুতুল।

ইন্দিরা হলেন ভারতের সেই নারী প্রধানমন্ত্রী, যাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ‘দ্য ওনলি ম্যান ইন হার ক্যাবিনেট’।

নিজের দলের সিন্ডিকেটের বুড়ো নেতারাই হোন আর লোহিয়ার মতো হেভিওয়েট বিরোধী- সমালোচকদের মিথ্যে প্রমাণ করতে খুব বেশি সময় কিন্তু নেন নি ইন্দিরা। ভারতের সবথেকে চতুর, তীক্ষ্মবুদ্ধি, ঠান্ডামাথা এবং দৃঢ়চেতা রাজনীতিকের নামের তালিকায় ইন্দিরার নামটি এক নম্বরে না রাখলে সেটা হবে তাঁর প্রতি অবিচার। দোষ ও দুর্বলতাগুলির জন্য তাঁর যথেষ্ট সমালোচনা করার পরেও এক নম্বর জায়গা থেকে ইন্দিরার নাম কাটার কোনও সুযোগ নেই।‌ যদি না গায়ের জোরে তাঁর কৃতিত্বকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়।

ইন্দিরা গান্ধীর সবথেকে বড় কৃতিত্ব পাকিস্তানের সর্বনাশ। স্বাধীন ভারতের ইতিহাসে এখনও পর্যন্ত আমাদের রাষ্ট্রের সবথেকে সফল সামরিক অভিযান নিঃসন্দেহে একাত্তরের ভারত-পাক যুদ্ধ। এই যুদ্ধে পাকিস্তানের পরাজয় এমনকি বিপর্যয় নিয়ে কোনও বিতর্ক, কোনও সন্দেহের অবকাশ‌ই নেই। বাংলাদেশের সৃষ্টিতে ইন্দিরার অবদান একটি ঐতিহাসিক সত্য। পাকিস্তানকে ভেঙে দিয়ে দেশের পূর্ব সীমান্তের নিরাপত্তা বরাবরের মতো অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলেন ইন্দিরা গান্ধী। সিকিমের ভারতে অন্তর্ভূক্তি তাঁর আরও একটি সাহসী সিদ্ধান্ত। অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রে ব্যাঙ্ক ও খনি জাতীয়করণ ইন্দিরার অন্যতম সাহসী পদক্ষেপ। ভারতকে পরমাণু অস্ত্রধর রাষ্ট্রে পরিণত করার প্রথম সাহস দেখান ইন্দিরাই।

ইন্দিরার সাহসী ও বলিষ্ঠ সিদ্ধান্ত গুলির সুফল যেমন দেশবাসী পেয়েছে তেমনি ইন্দিরার ভুলের  কুফল‌ও ভুগেছে দেশের মানুষ। একটা কথা মানতে হবে, ইন্দিরার প্রমাদগুলিও ছিল হিমালয়ের মতোই ‌ভারি। তাঁর সবথেকে বড় ভুল নিঃসন্দেহে পঁচাত্তরে অভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থা ঘোষণা। রাজনীতি আসলেই দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া। কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হলে পতন অনিবার্য। সাতাত্তরে এমন রাজনৈতিক পতন‌ই হয়েছিল ইন্দিরার। ঊনসত্তরে কংগ্রেস বিভাজনের দায় এড়াতে পারেন না ইন্দিরা। দলের ভেতরে পিতৃতুল্য প্রবীণদের অপদস্থ করে চাটুকারদের মাথায় তুলেছিলেন দিনের পর দিন। জীবনের সবথেকে বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি নেওয়ার সময় ইন্দিরার পাশে অভিজ্ঞ এমন কেউ ছিলেন না, যিনি তাঁকে সুপরামর্শ দিয়ে খাদের কিনারা থেকে ফিরিয়ে আনতে পারেন।

ছেলে সঞ্জয়ের বাড়াবাড়ি চোখে দেখেও শাসন করেন নি ইন্দিরা।

অন্ধ পুত্রস্নেহে ইন্দিরার পদস্খলনের বিষয়টি উল্লেখ না করলেই নয়। এমার্জেন্সির সময় দুর্বিনীত সঞ্জয় গান্ধী হয়ে উঠেছিলেন সংবিধান বহির্ভূতভাবে দেশের ‌দন্ডমুন্ডের কর্তা। ছেলের বাড়াবাড়ি চোখে দেখেও শাসন করেন নি ইন্দিরা। সঞ্জয় গান্ধীকে লাই দিতে দিতে দল এবং প্রশাসনের চরম ক্ষতি করেছিলেন। পঁচাত্তর থেকে সাতাত্তর- এই দুই বছরে দল ও সরকারের ভেতরে ইন্দিরা যত শত্রু তৈরি করেছেন, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তার জন্য একমাত্র দায়ী সঞ্জয়। পঁচাত্তরে দেশে অভ্যন্তরীণ জরুরী অবস্থা জারি করে গণতন্ত্রের কন্ঠরোধ করার কোনও দরকার ছিল না। একাত্তরের তুমুল জনপ্রিয়তা চুয়াত্তর থেকে নামতে শুরু করতেই অবিশ্বাস ও সন্দেহ জাঁকিয়ে বসে লৌহমানবীর মনে। সংবিধান ও গণতন্ত্রের প্রতি আস্থা  থাকলে সেদিন হাজার চাপের মুখেও এমার্জেন্সি ঘোষণার পথে হাঁটতেন না ইন্দিরা গান্ধী। রাজনীতি আসলেই দড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যাওয়া । কাঙ্ক্ষিত গন্তব্যে পৌঁছুতে ব্যর্থ হলে পতন অনিবার্য। সাতাত্তরে এমন রাজনৈতিক পতন‌ই হয়েছিল ইন্দিরার‌। রাজনীতির শতরঞ্জে চাল‌ই হচ্ছে আসল। চাল ঠিক হলে কিস্তিমাত। চালে ভুল হলে পরাজয়ের গ্ল্যানি বহন অনিবার্য। তীক্ষ্ণবুদ্ধির রাজনীতিক হ‌ওয়ার পরেও চাল দিতে ‌গিয়ে ইন্দিরা মাথা ঠিক রাখতে পারেন নি বারকয়েক‌। 

ভুল করায় জনগণ তাঁকে বিদায় করেছিল। আবার পাপের প্রায়শ্চিত্ত করিয়ে জনগণ‌ই তাঁকে ফিরিয়ে এনেছে ক্ষমতায়। মানুষের মনের গতিপ্রকৃতি বোঝার এলেম ইন্দিরা গান্ধীর ছিল অনবদ্য। ক্ষমতাচ্যুত হ‌ওয়ার তিন বছরের মাথায় যে’ভাবে কামব্যাক করেছিলেন, তা এক কথায় অনবদ্য। ইন্দিরা গান্ধীর কর্মকাণ্ড নিয়ে  বিতর্ক যাই থাক, একটা ব্যাপার দিনের আলোর মতোই স্বচ্ছ যে,দেশকে ভালবাসায় কোন‌ও খাদ ছিল না তাঁর মধ্যে । ভারতের ‌অখন্ডতা রক্ষার প্রশ্নে তিনি ছিলেন আপোষহীন। জীবন দিয়ে মূল্য চোকাতে হতে পারে জেনেও সৈন্য পাঠিয়ে জঙ্গি খালিস্তানিদের কবল থেকে মুক্ত করেছিলেন অমৃতসরের স্বর্ণমন্দির। শেষ পর্যন্ত জীবন দিয়েই দেশের ‌অখন্ডতা রক্ষা করেছেন ইন্দিরা। আবার বিরোধীদের এই অভিযোগটাও পুরোপুরি মিথ্যে নয়- পাঞ্জাবের অকালি ও কেন্দ্রের জনতা সরকারকে ব্যতিব্যস্ত করতে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভিন্দ্রান‌ওয়ালাকে একসময় ইন্ধন জুগিয়ছিলেন ইন্দিরা গান্ধীই। ইন্দিরা শব্দের অর্থ হল লক্ষ্মী । আর শেষে গান্ধী যোগ করলে নিঃসন্দেহে এর অর্থ দাঁড়ায় সাহস । ইন্দিরার চরম রাজনৈতিক শত্রুও ছিলেন ইন্দিরার সাহসিকতায় মুগ্ধ । ইন্দিরা হলেন ভারতের সেই নারী প্রধানমন্ত্রী, যাঁর সম্পর্কে বলা হয়েছিল, ‘দ্য ওনলি ম্যান ইন হার ক্যাবিনেট’।

Photo sources- Archives.


Leave a Reply

Your email address will not be published.