কোহিনুর হিরে: ওয়ারাঙ্গলের মন্দির থেকে বাকিংহাম প্যালেসে


গোলকুন্ডার কল্লুর খনি থেকে উত্তোলিত। স্থান ছিল ওয়ারাঙ্গলের মন্দিরে বিগ্রহের নয়নে। লুট করল আলাউদ্দিন খিলজির সেনাপতি মালিক কাফুর। মুঘল দরবার থেকে ছিনিয়ে নিয়ে নাদির শাহ নাম দিল ‘কোহিনুর’- আলোর পাহাড়। জানুন কোহিনুরের ইতিহাস-

রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ গেলেন ৯৬ বছর বয়সে। রানি গেলেন কিন্তু ব্রিটিশ রাজতন্ত্র র‌ইল। এবার রাজা হলেন এলিজাবেথের জ্যেষ্ঠ পুত্র চার্লস। তবে রানির মুকুট কিং চার্লস থ্রির মাথায় উঠবে না। ওটা উঠেছে চার্লসের স্ত্রী ক্যামিলার মাথায়। ব্রিটেনের রাজার ব‌উয়ের মাথায় রানির মুকুট উঠল কি উঠল না, তা নিয়ে ভারতের মানুষের বিশেষ মাথাব্যথা নেই। আমাদের আফশোস মুকুটের মাথায় থাকা কোহিনুর হিরে নিয়ে। জগতে হিরে অনেক আছে কিন্তু কোহিনুর একটাই। কোহিনুরকে বলা হয় জগতের শ্রেষ্ঠ হিরে। বাকি ডায়ামন্ডদের যত‌ই জেল্লা থাকুক তাদের সবার স্থান কোহিনুরের নিচে। কোহিনুর হিরে ভারতের। কিন্তু ইতিহাসের লীলায় তা শোভা পায় ব্রিটেনের রানির মাথায়।

মন্দির থেকে লুট করেছিল মালিক কাফুর

হিরে-জহরত খুঁজে পায় প্রজারা কিন্তু মালিক হন রাজারা। দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ হিরে কোহিনুরের ভাগ্যেও ব্যতিক্রম কিছু ঘটে নি। ১০৫.৬ মেট্রিক ক্যারেটের কোহিনুর হিরের ওজন ২১.৬ গ্রাম। কোহিনুরের গোড়ার দিকের ইতিহাস তথ্যের অভাবে খুব একটা স্পষ্ট নয়। যত দূর জানা যায়, ১১০০ থেকে ১৩০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে অন্ধ্রপ্রদেশের গুন্টুরে কল্লুর খনি থেকে এই অসামান্য হিরেটি পাওয়া যায়। দক্ষিণের বিখ্যাত কাকোতীয় রাজবংশের হিন্দু নৃপতিদের  রাজধানী ছিল‌ বর্তমান তেলেঙ্গানার ওয়ারাঙ্গলে। ওয়ারাঙ্গলের একটি মন্দিরে বিগ্রহের তৃতীয় নয়নে বসানো ছিল কোহিনুর হিরে। ১৩১০ খ্রিস্টাব্দে  সেনাপতি মালিক কাফুরকে ওয়ারাঙ্গল অভিযানে পাঠান দিল্লির সুলতান আলাউদ্দিন খিলজি। একমাস ধরে ওয়ারাঙ্গল জুড়ে ব্যাপক লুটতরাজ চালায় মালিক কাফুরের বাহিনী। মন্দিরটিতে হানা দিয়ে বিগ্রহের চোখ থেকে খুবলে নিয়ে কোহিনুর হিরেটিও লুট করে মালিক কাফুর।  কাকতীয় সম্রাট প্রতাপরুদ্র অবশেষে সুলতানের বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করলে বিপুল ধন-সম্পদ লাভ করেন মালিক কাফুর। প্রতাপরুদ্রের কাছ থেকে প্রাপ্ত অঢেল ধনদৌলত এবং কোহিনুর সহ লুটের মালামাল নিয়ে দিল্লিতে ফিরে আসে মালিক কাফুরের বাহিনী। অন্যান্য সোনাদানা-হিরে-জহরতের সাথে কোহিনুর‌ও সুলতান আলাউদ্দিন খিলজির হাতে তুলে দেন সেনাপতি মালিক কাফুর।

ইব্রাহিম লোদি থেকে বাবরের হাতে

আলাউদ্দিন খিলজি থেকে ইব্রাহিম লোদি পর্যন্ত কোহিনুর হিরে একটানা দিল্লির সুলতানদের দখলেই ছিল বলে মনে করার যথেষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ আছে। ১৫২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম পানিপথের যুদ্ধে মুঘল সম্রাট বাবর দিল্লির শেষ সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাস্ত করেন। লোদির কাছ থেকে কোহিনুর হিরে যে বাবরের হস্তগত হয় ‘বাবরনামায়’ তার উল্লেখ আছে। যদিও তখন‌ও কোহিনুর হিরের নাম কোহিনুর হয় নি।  বাবরের মালিকানা লাভের পর কোহিনুর হিরে হাতবদল হয়ে কখনও মুঘল দরবারের বাইরে গিয়েছে বলে প্রমাণ নেই। তবে বাদশাহ হুমায়ুন, আকবর কিম্বা জাহাঙ্গীর কীভাবে কোহিনুর হিরেকে ব্যবহার করেছেন বা কতটা মূল্য দিয়েছেন তার কোনও বিবরণ পাওয়া যায় না ইতিহাসে।

মুঘল দরবার থেকে কোহিনুর হিরে ছিনিয়ে নেন নাদির শাহ।

মুঘল দরবার থেকে নাদির শাহের হাতে

১৬২৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ- তিরিশ বছর রাজত্ব করেছেন মুঘল সম্রাট শাহজাহান। শাহজাহানের ছিল হিরে-জহরত, সোনাদানা নিয়ে জাঁকজমক করার শখ। বিখ্যাত ময়ূর সিংহাসন তিনি সাজিয়েছিলেন অজস্র সোনাদানা, হিরে-জহরত, মণিমুক্তা দিয়ে। তবে ময়ূর সিংহাসনের আসল আকর্ষণ হয়ে  উঠেছিল কোহিনুর হিরে। সম্রাট আওরঙ্গজেবের জীবদ্দশাতেই মুঘল সাম্রাজ্যের পতনের সূচনা হয়। তবে নাম-কা-ওয়াস্তে মুঘল সম্রাট মুহাম্মদ ইব্রাহিমের‌ও কোহিনুর রত্ন শোভিত ময়ূর সিংহাসনে বসার সৌভাগ্য হয়েছিল। কিন্তু রাজধানী দিল্লিকে কার্যত দোজখে পরিণত করার পর, ১৭৩৯-এর‌ মার্চে, সম্রাট মুহাম্মদ শাহের চোখের সামনে দিয়ে ময়ূর সিংহাসন তুলে নিয়ে যান পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ। গর্বের কোহিনুর হিরে ও ময়ূর সিংহাসন হারানোর পরেও নয়টি বছর অপমানের জ্বালা নিয়ে বেঁচে ছিলেন মুহাম্মদ শাহ।

আলোর পাহাড়: কোহিনুর হিরের রেপ্লিকা।

নাদির দিলেন নাম আলোর পাহাড়

কোহিনুর হিরে এবং ময়ূর সিংহাসন সহ অজস্র ধনসম্পদ সঙ্গে নিয়ে পারস্যে ফিরে যান নাদির শাহ। এতদিন পর্যন্ত ময়ূর সিংহাসন আলো করা হিরেটিকে কেউ কোহিনুর নামে চিনত না। নামটি দেন নাদির‌ই। কোহিনুর মানে আলোর পাহাড়। খুব বেশি দিন কোহিনুরের আলো উপভোগ করার সৌভাগ্য হয় নি নাদির শাহর। দিল্লি লুন্ঠনের  নয় বছর বাদে দেহরক্ষীর হাতে খুন হয়ে যান পারস্যের সম্রাট নাদির শাহ। নাদিরের মৃত্যুর পর যে কোনও ভাবেই হোক কোহিনুর হস্তগত করেন পারস্য সম্রাটের সেনাপতি আহমদ শাহ দুররানি।

রঞ্জিত সিংহ নিজের উষ্ণীষে বেঁধে রাখতেন কোহিনুর।

উঠল মহারাজা রঞ্জিত সিংহের উষ্ণীষে

১৮১৩ খ্রিস্টাব্দে আহমদ শাহ দুররানির বংশধর শাহ সুজা দুররানি  বিবদমান ভায়েদের হাত থেকে বাঁচতে কাবুল ছেড়ে পালিয়ে আসার সময় কোহিনুর হিরে সঙ্গে করে নিয়ে আসেন এবং পাঞ্জাবে আশ্রয় লাভের বিনিময়ে মহারাজা রঞ্জিত সিংহের হাতে হিরেটি তুলে দেন। রঞ্জিত সিংহ তাঁর উষ্ণীষে কোহিনুর হিরেটি বেঁধে রাখতেন বলে শোনা যায়। ততদিনে হিরে শ্রেষ্ঠ কোহিনুরের খ্যাতির কথা ইংরেজদের কানেও পৌঁছে গেছে। ১৮৩৯-এর ২৭ জুন শিখ সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা মহারাজা রঞ্জিত সিংহ চিরদিনের জন্য চোখ বুজলেন। পড়ে র‌ইল তাঁর সাম্রাজ্য, তাঁর উষ্ণীষ আর উষ্ণীষে বাঁধা চোখ ধাঁধানো কোহিনুর। সাম্রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে রঞ্জিত সিংহের তিন ছেলে খুনোখুনি করে মরলে চতুর্থ পুত্র নাবালক দলীপ সিংহ ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে বসে। সিংহাসনারোহনের সময় দলীপের বয়স ছিল মাত্র ছয়।

ডালহৌসির হাতে এল, পাড়ি দিল লন্ডনে

১৮৪৯ সালে দ্বিতীয় ইঙ্গ-শিখ যুদ্ধে শিখ সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। লাহোরের চুক্তি অনুযায়ী পাঞ্জাব ব্রিটিশ অধিগ্রহণ করে নেয়। এগার বছরের দলীপ সিংহ রাজত্ব এবং কোহিনুর হিরে লর্ড ডালহৌসির হাতে তুলে দেন। লাহোর চুক্তির তিন নম্বর অনুচ্ছেদে কোহিনুর হিরে নিয়ে যেমনটি বলা হয়েছিল- “কোহিনুর নামে হিরেটি, যা শাহ সুজা উল মুলুকের কাছ থেকে মহারাজা রঞ্জিত সিংহ অধিগ্রহণ করেছিলেন তা লাহোরের মহারাজা ইংল্যান্ডের মহারানির কাছে প্রত্যর্পণ করবেন।” ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে ভারতের কোহিনুর পাড়ি দিল‌ বিলেতে।

ব্রিটেনের রানির মুকুটের ঠিক মাঝখানে বসানো থাকে কোহিনুর হিরে।

উঠল মহারানি ভিক্টোরিয়ার মুকুটে

কোহিনুর হিরে এসে পৌঁছতেই লন্ডন জুড়ে সাহেব-মেমদের মধ্যে হ‌ইচ‌ই পড়ে গেল। শো কেসে সাজিয়ে কোহিনুর জনসাধারণকে দেখানোও হল। কিন্তু কোহিনুর যখন বাকিংহাম প্যালেসে গেল‌ হিরের অক্ষত অবয়ব দেখে মহারানি ভিক্টোরিয়ার স্বামী প্রিন্স অ্যালবার্ট তেমন খুশি হলেন না। কোহিনুর পালিশ ও কাটিং করার নির্দেশ দিলেন প্রিন্স অ্যালবার্ট। ৩৮ দিন ধরে জগদ্বিখ্যাত কোহিনুর হিরে পালিশ ও কাটিংয়ের কাজ করলেন রাজ পরিবারের মণিকারেরা। পালিশ ও কাটিংয়ের ফলে কোহিনুর হিরের  ওজন ১৮৬ ক্যারেট ( ৩৭.২ গ্রাম) থেকে কমে দাঁড়ালো বর্তমান ওজন ১০৫.৬ ক্যারেটে ( ২১.১২ গ্রাম )। এরপর পরিমার্জিত কোহিনুর হিরে গেল মহারাণি ভিক্টোরিয়ার হাতে। কোহিনুর হিরেকে ঘিরে ততদিনে নানা ‘মিথ’ ছড়িয়ে পড়েছিল দেশে-দেশে। ভিক্টোরিয়ার কানেও সে’সব এসে পৌঁছেছিল। যে রাজারাই কোহিনুরের মালিক হয়েছিলেন, তাঁদের ভাগ্যে বিপর্যয় নামতে বিলম্ব ঘটে নি- এমন কথা শোনার পর ভিক্টোরিয়া নির্দেশ দিলেন কেবলমাত্র রানিদের মুকুটেই কোহিনুর শোভা পাবে। ভিক্টোরিয়ার এই নির্দেশ পরবর্তীকালে ব্রিটেনের রাজ পরিবারে কেউ লঙ্ঘন করে নি।রাজারা কোহিনুর থেকে দূরে থাকেন। কেবল রানি অথবা রাজমহিষীর মুকুটের শীর্ষেই কোহিনুর হিরের অবস্থান।

হিরে হারা হিরের দেশ

ভারতকে বলা হত হিরের দেশ। ১৭২৬ খ্রিস্টাব্দের আগে পর্যন্ত ভারতের গোলকোন্ডা অঞ্চল ব্যতীত আর কোথাও হিরে পাওয়া যেত না। শুধু কোহিনুর‌ই নয় আর‌ও অনেক দুর্লভ-দুর্মূল্য হিরের খোঁজ মিলেছিল ভারতে। তার সব‌ই পাচার হয়ে গেছে ইউরোপে। কোহিনুর ছিল কাকোতীয় রাজবংশের রাজধানী ওয়ারাঙ্গলের এক মন্দিরে আরাধ্য বিগ্রহের চোখে। কালচক্রের জটিল পথ বেয়ে তা আজ উঠতে চলেছে ইংল্যান্ডের রাজা তৃতীয় চার্লসের ব‌উ ক্যামিলার মাথায়। ভারতের কোহিনুর কি কখনও ভারতে ফিরে আসবে? ২০১৫ থেকে কোহিনুরকে দেশে ফিরিয়ে আনার একটা চেষ্টা চলছে বটে কিন্তু পাকিস্তান এমনকি আফগানিস্তান‌ও কোহিনুরের মালিকানা দাবি করে বসে আছে। অথচ বাস্তব এটাই, কোহিনুর হিরের উৎপত্তি হিন্দুস্থানের গোলকোন্ডার কল্লুর খনিতে। তার স্থান ছিল ওয়ারাঙ্গলের হিন্দু মন্দিরে বিগ্রহের নয়নে।  কোহিনুর হিরের দ্যুতির মধ্যে লুকিয়ে আছে ভারত লুটের অন্ধকার ইতিহাস।

Photo Sources- Collected.



Leave a Reply

Your email address will not be published.