শুক্রবার পরপর ঘটনা,তৃণমূল কি গৃহযুদ্ধের দোরগোড়ায়? শনিবার বৈঠক ডাকলেন মমতা


বিশেষ প্রতিবেদন : মমতা-অভিষেকের টানাপোড়েন ঘিরে তৃণমূলে কি গৃহযুদ্ধের পরিস্থিতি? ঘটনাপ্রবাহ কিন্তু দুই শিবিরে আড়াআড়ি বিভাজনের‌ই ইঙ্গিত দিচ্ছে। সব দেখেশুনে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের ধারণা- যত দিন যাচ্ছে কমার বদলে বেড়েই যাচ্ছে পিসি-ভাইপোর দূরত্ব। তৃণমূলের অন্দরে একাধিক ঘটনা ঘটল শুক্রবার সকালে।

মমতা-আইপ্যাক বিচ্ছেদ কি চূড়ান্ত ?

প্রথম ঘটনা- ট্যুইটারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে আনফলো করেছেন আইপ্যাক প্রধান প্রশান্ত কিশোর। কলকাতার পুরভোট থেকেই আইপ্যাকের সঙ্গে মন কষাকষি শুরু তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্বের। ১০৮ পুরসভার প্রার্থী তালিকা ঘিরে যা চরমে পৌঁছেছে বলে খবর। অভিষেক প্রধান্ত কিশোরের পাশে থাকলেও আইপ্যাককে ঝেড়ে ফেলতে চাইছেন পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সী ও ফিরহাদ হাকিমের মতো পুরোনো তৃণমূল নেতারা। শোনা যাচ্ছে আইপ্যাক ও দলের সিনিয়র নেতাদের দ্বন্দ্বে মমতা এখন সিনিয়রদের‌ই পক্ষে। তাই আইপ্যাক-অভিষেকের প্রার্থী তালিকা থেকে ত্রিশ শতাংশ নাম ছেঁটে ফেলতে এক মুহুর্ত দেরি করেন নি তৃণমূল সুপ্রিমো। এরপরেই নাকি আইপ্যাক প্রধান প্রশান্ত কিশোর বুঝে যান জোড়া ফুল শিবির থেকে তাঁর প্যাক‌আপের সময় এসে গেছে। আইপ্যাকের সঙ্গে তৃণমূলের চুক্তি ২০২৬ পর্যন্ত থাকলেও উভয়ের সম্পর্ক যে বাইশের শীতেই আইসিইউতে, সাংবাদিকদের সঙ্গে ঘরোয়া আলাপচারিতায় তা মেনেও নিচ্ছেন জোড়াফুল শিবিরের শীর্ষ নেতারা।

মমতাকে ট্যুইটারে আনফলো করলেন প্রশান্ত কিশোর।

এখনকার বাজারে দুই সেলিব্রেটির মধ্যে সম্পর্কের চরম অবনতির ইঙ্গিত হচ্ছে ট্যুইটারে একে-অপরেরে কাট্টি। শুক্রবার সকালে মমতার সঙ্গে সেটাই করলেন পিকে। এই ঘটনার পর তৃণমূল আর আইপ্যাকে অফিশিয়াল তালাক শুধু সময়ের অপেক্ষা বলেই মনে করছে বাংলার রাজনৈতিক মহল।

হাকিমকে দিয়ে অভিষেককে হুকুম দিলেন মমতা?

দ্বিতীয় ঘটনার রাজনৈতিক গুরুত্ব আরও অধিক। কয়েক দিন ধরেই তৃণমূলের অন্দরে ‘ এক ব্যক্তি এক পদ’ এর আওয়াজ উঠেছে। সম্প্রতি একটি চ্যানেলের সঙ্গে সাক্ষাৎকার দিতে গিয়ে আওয়াজ‌টি উস্কে দিয়েছেন স্বয়ং অভিষেক। এরপর থেকেই স্লোগানটিকে সামাজিক মাধ্যমে ট্রেন্ড করতে যাঁরা নেমে পড়েন তৃণমূলের অন্দরে অভিষেক অনুগামী বলেই তাঁদের পরিচয়। সেই তালিকার দু’জন আবার মুখ্যমন্ত্রীর ঘরের মানুষ- অদিতি ও আকাশ। প্রথমজন অভিষেকের বোন পরের জন ভাই। পিসি এক‌ই সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী এবং দলের প্রধান। ভাই-বোন অবশ্য দাদার পাশে দাঁড়িয়ে এক ব্যক্তি এক পদের নাড়া লাগাচ্ছেন।

অভিষেক অনুগামীদের ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ জিগিরের ঠ্যালায় সবথেকে অস্বস্তিতে যে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। শুক্রবার বিকেল গড়ানোর আগেই ফিরহাদ হাকিম মিডিয়াকে জানিয়ে দিলেন- ‘ এক ব্যক্তি এক পদ’ নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে আওয়াজ তোলা অনুমোদন করছেন না মমতা। সামাজিক মাধ্যমে যারা ‘এক ব্যক্তি এক পদ’ নিয়ে পোস্ট করেছেন তাদের পোস্ট মুছে ফেলতে নির্দেশ দিয়েছেন তৃণমূল সুপ্রিমো। অন্তত তেমনটিই জানিয়েছেন কলকাতার মেয়র। হাকিমের বক্তব্য যথেষ্ট কঠিন এবং সোজাসাপ্টা। তিনি বলেছেন-” নেতাদের এই পোস্ট বিভ্রান্তিকর। এবং দল তা অনুমোদন করে না।‌ অবিলম্বে ওই সব পোস্ট সরাতে হবে। সামাজিক মাধ্যমে এই রকম পোস্ট করা অন্যায়। দলনেত্রী নতুনভাবে নীতি নির্ধারণ করবেন। দলের যাবতীয় নীতি তিনিই ঠিক করবেন।”

অভিষেকের এক ব্যক্তি এক পদ নীতিকে খারিজ করলেন ববি হাকিম।

‘এক ব্যক্তি এক পদ’ দাবির শক্ত বিরোধিতা করে ফিরহাদ হাকিম যে ভরা হাটে অভিষেকের হাঁড়িই ভাঙলেন তা বুঝতে কার‌ও অসুবিধা হ‌ওয়ার কথা নয়। এবং খোদ মমতার নির্দেশেই যে ববি মুখ খুলেছেন তাও জলের মতোই পরিস্কার। পিসির কাছ থেকে এমন শক্ত জবাব পেয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় কী করেন এখন এটাই দেখার। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকেই তৃণমূলের অন্দরে কানাঘুষো ১৪ ফেব্রুয়ারি গোয়ার ভোট পর্ব মিটলেই নাকি অভিমানে আড়ালে চলে যাবেন ‘ ভাইপো’। ঘনিষ্ঠ মহলে এমন‌ই ইঙ্গিত নাকি দিয়েছেন অভিষেক।‌

মদনকে শায়েস্তা করতে চাইছে তৃণমূল?

আসলে তৃণমূলের নবীন প্রজন্মের মুখ হয়ে উঠতে চাইছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এবং এর পেছনে প্রশান্ত কিশোরের মদত আছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। নিজের অনুগতদের মুখ দিয়ে অভিষেক এমন অনেক কথা বলিয়ে নিচ্ছেন যা তৃণমূলকে অস্বস্তিতে ফেলতে যথেষ্ট। বৃহস্পতিবার রাতে অভিষেক ঘনিষ্ঠ যুবনেতা দেবাংশু ভট্টাচার্যের ফেসবুক পোস্ট অনেকটা সে’রকম। দেবাংশুর পোস্টের মূল কথা – ” আরেকবার ২০১৮ হলে আরেকটা ২০১৯ কিন্তু সময়ের অপেক্ষা.. বারবার সবটা ২০২১-এর মতন হবে না। ” পঞ্চায়েত নির্বাচনে তৃণমূল সন্ত্রাস করেছিল এবং চলতি পুর নির্বাচনেও তৃণমূল এক‌ই রাস্তা নিয়েছে, পোস্টটির মাধ্যমে রাজ্য যুব তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক তা প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিলেন। সব থেকে বড় কথা বিরোধীদের যেটা দাবি কেন্দ্রীয় বাহিনীর অধীনে পুরভোট – সেটাও চেয়েছেন দেবাংশু।

দলে শো-কজের মুখে কালারফুল মদন।

দলের এই ডামাডোলে তৃণমূলের কোন নেতা ঠিক কোন শিবিরে ঠাহর করতে আরও একটু সময় লাগবে। অনেকে হয়তো দু’দিকেই তাল দিচ্ছেন। কামারহাটির বিধায়ক মদন মিত্র দীর্ঘদিন ধরেই দলে কোনঠাসা। কামারহাটি পুরসভার প্রার্থী তালিকা নিয়ে মমতা তাঁর মন না রাখার পর থেকেই সপ্তমে উঠে গেছে কালারফুল মদনের মেজাজ। প্রকাশ্যেই মমতাকে তৃণমূলের সর্বাধিনায়ক এবং অভিষেককে দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড বলে ঘোষণা করেছেন মদন মিত্র। তৃণমূলে তিন নম্বরে কেউ নেই বলে মদনের দাবি। নাম মুখে না এনে পার্থ চট্টোপাধ্যায়, সুব্রত বক্সী এবং সৌগত রায়কে যা নয় তাই বলতেও ছাড়েন নি কামারহাটির বিধায়ক। অনেক চেষ্টার পরেও মদনের মুখে সেলোটেপ মারতে ব্যর্থ তৃণমূল শীর্ষ নেতৃত্ব। শুক্রবার সকালের খবর, মদন মিত্রকে শোকজ করতে চলেছে তৃণমূল।

জরুরি বৈঠক ডাকলেন মমতা

শুক্রবার সন্ধ্যা নামার আগেই দলের জরুরি বৈঠক ডেকেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। শনিবার বিকেল ৫টা নাগাদ মমতার কালীঘাটের বাড়িতে এই বৈঠক হবে বলে জানা গেছে। হঠাৎ করে দলের অন্দরে পরপর এমন ঘটনা ঘটে চলেছে যা সামাল দিতেই মমতার তড়িঘরি বৈঠক ডাকা বলে রাজনৈতিক মহলের অনুমান।

বিপুল জয়ে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের বছর ঘোরার আগেই তৃণমূলের আকাশে গৃহযুদ্ধের ঘনঘটা। আচমকা বৈঠক ডেকে বিপদ ঘন্টি মমতাই বাজিয়ে দিলেন? তৃণমূলের শীর্ষ নেতাদের সকলকেই বৈঠকে উপস্থিত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি। শনিবার অভিষেক নিজে কী করেন সেই দিকেই তাকিয়ে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা।

Photo Credit- Facebook & Twitter. Feature Image is symbolic.


Leave a Reply

Your email address will not be published.