পুঁজির পুজো কর বাঙালি, বিড়াল সাদা হোক কি কালো, ইঁদুর ধরলেই ভাল


গুজ্জু আদানি-আম্বানী ভাল হোক কি মন্দ তাঁদের পুঁজিতে নাই কোন‌ও গন্ধ! অনেক হয়েছে বিপ্লব, বাঙালি এবার খানিক পুঁজির পুজো কর। লিখলেন উত্তম দেব—

বাংলায় লগ্নি দরকার। পুঁজির বিপুল লগ্নি। দু:খের বিষয়, বাঙালির নিজস্ব পুঁজির ঘট প্রায় শূন্য। আমাদের ভূমিপুত্র পুঁজিপতি নেই। থাকা কিন্তু উচিত ছিল। গৌতম আদানির নাম গৌতম বণিক হলে বাঙালির লাভ ছাড়া ক্ষতি ছিল না। কিম্বা মুকেশ আম্বানীর নাম মুকেশ সাহা। গুজরাটিদের আমরা গুজ্জু বলে টিটকিরি দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভ করি। আসল কথা কী জানেন। যে নুলো, সে তো মুখের চোপা করেই সুখ পাবে। আমরা বাঙালিরা বৃহৎ পুঁজির অভাবে নুলো হয়ে আছি।

আরে ভাই, গুজ্জু বানিয়াদের ট্যাঁকের জোর আছে। তাই, ওরা দুনিয়াকে কিনে রাখে। টাকা থাকলে সবাই মাথায় তুলে নাচে— এর চেয়ে ভয়ঙ্কর সত্যি সংসারে আর কিছু নেই। সংসারটা বিষয়ীদের। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর একটি উপন্যাসে এক চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়েছিলেন— লাঠি আর টাকার জোর থাকলে সমাজের মুখ বন্ধ করা যায়।

মুম্বাইয়ের ‘অ্যান্টিলিয়া’-য় অনন্ত ও মুকেশ আম্বানীর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: শুভেন্দু অধিকারীর ফেরিফায়েড এক্স হ্যান্ডেল থেকে সংগৃহীত।

মোল্লা নাসিরুদ্দিনের একটা গল্প আছে। গল্পটি এমন। একদিন মোল্লাকে নবাব বললেন, “আচ্ছা, নাসির, খোদাতালা যদি এক থলি মোহর আর আর এক বস্তা জ্ঞান নিয়ে তোমার সামনে হাজির হয়ে বলেন, একটি বেছে নাও। তুমি কোনটা নেবে?” নাসির বললেন- “মোহর, হুজুর!” নবাব— “আমি হলে জ্ঞান বেছে নিতাম, গর্দভ!” মোল্লা হেসে জবাব দেন— “জানি হুজুর, যার যেটা নেই, সে সেটাই বেছে নেয়।” বাঙালির‌ও মোল্লা নাসিরের মতো জ্ঞান প্রচুর হয়ে গেছে। তাহার এখন মোহর দরকার।

বাঙালি একদা পুঁজির সাধনা যে করে নি, তা নয়। বাঙালি শুধু কবির নয়, বণিকের‌ও জাত।‌ একদিন সাগরে সপ্তডিঙা ভাসিয়ে বাঙালি বণিক বাণিজ্য করতে প্রবাসে যেত। কিন্তু কোম্পানির শাসন শুরু হলে চাকরির পেঁচোয় ধরায় বাঙালি পুঁজির সাধনা দিল ছেড়ে। বাঙালি এক সময় খুব কষে সমাজতন্ত্র- যৌথখামারের সাধনা করেছে।‌ শেষ পর্যন্ত না হয়েছে সমাজতন্ত্র, না টিকেছে যৌথখামার!

আমরা আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়ের সদুপদেশ কানে তুলি নি। মালক্ষ্মীকে অবহেলা করেছি। এতে মাসরস্বতীও গোঁসা করে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন। আসলে টোল চালাতেও টাকা লাগে। টাকা ছাড়া বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাগার, ইনস্টিটিউট চলে? চলে না। সে যুগে নালন্দা-তক্ষশীলা রাজানুগ্রহে চলত। এ যুগে শুধু সরকার নয়, উদ্যোগপতিরাও পৃথিবীর বড় বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলির প্রতি অনুগ্রহ করেন। আমেরিকার ধনকুবেররা সেই কবে থেকে প্রতিযোগিতা করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দান করেন। অথচ বিশ্বভারতী চালাতে গিয়ে কিন্তু দেউলে হয়েছিলেন বাঙালির প্রাণের কবি রবীন্দ্রনাথ। কত লোকের কাছে হাত পেতেছিলেন!

ধরেন যে পাঁড় বামপন্থী বাঙালি ভদ্দরলোক আড়ালে গৌতম আদানিকে দুই বেলা কষে গালি দেয়। তার ছেলে আদানির কোন‌ও কোম্পানিতে লাখ টাকা বেতনের চাকরি পেলে সে কি মানা করবে? করবে না। বাঙালি টাকা‌ওয়ালা লোককে আড়ালে‌ শালা বলে। আবার সেই টাকাওয়ালার ছেলের বিয়ে, নাতির অন্নপ্রাশনে নেমন্তন্ন পেলে গিলে করা পাঞ্জাবি পরে বত্রিশ পাঁটি দন্ত বিকশিত করে সবার আগে হাজির হয়। নিজে চোখে দেখা।

এই যে দক্ষিণেশ্বরের পরমহংস বলেছিলেন— টাকা মাটি, মাটি টাকা! তাঁর নামাঙ্কিত মিশন কি টাকা চেনে না? খুব চেনে। যে ভক্ত যত বেশি ডোনেশন দেন, সেই ভক্তের কদর তত বেশি। তাঁর প্রসাদের থালা তত বেশি ভারী। মোদ্দা কথা, আপনি চিতায় না ওঠা পর্যন্ত আপনার টাকার দরকার। এমনকি ফিজ না দিলে চুল্লিতে বডি ঢোকায় না। অস্বাভাবিক মৃত্যু হলে দেহের ময়নাতদন্ত করতে ডোমেরা কীভাবে মৃতের পরিবারের লোকেদের সঙ্গে টাকা নিয়ে দরাদরি করে, ভুক্তভোগীরা জানে।

আদানি গ্রুপের কর্ণধার গৌতম আদানিকে কলকাতায় স্বাগত জানাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। ছবি: এন‌এনডিসি।

দেং শিয়াও পিংয়ের কথা মনে আছে তো? দেং বলেছিলেন, “বিড়াল ইঁদুর ধরতে পারলেই হল। বিড়ালটি সাদা না কাল, দেখার দরকার নেই।” মানে, চিনে বিদেশি বিনিয়োগ আসলেই হল। বিনিয়োগকারী সমাজতন্ত্রী না পুঁজিবাদী, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদী না ফরাসী উদারবাদী, দেখার প্রয়োজন নেই। চিন যে আজকে বিশ্ব অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে, তা দেংয়ের সংস্কার নীতির কল্যাণে। মাওয়ের সাংস্কৃতিক বিপ্লব চিনকে প্রায় শেষ করে এনেছিল।

গুজ্জু আদানি-আম্বানী ভাল কি মন্দ জানি না। তাঁরা বাংলায় বিনিয়োগের মতো বিনিয়োগ করতে চাইলে; শুধু হাতে ধরে নয়, পায়ে ধরে তাঁদের স্বাগত জানালেও আমাদের আত্মসম্মান যাবে না। নিজের ক্ষুদ্র স্বার্থোদ্ধারের জন্য ব্যক্তি বাঙালি বন্ধ দরজার ভেতরে প্রভাবশালীর পায়ে পড়তে পারে। মণ মণ তৈলমর্দন করতে পারে। আবার কাজ ফুরোলে পাল্টিও মারতে পারে। মমতা টের পাচ্ছেন, ক্ষমতা চলে গেলে আপন কীভাবে রাতারাতি পর হয়ে যায়। কাজেই জাতির উদ্ধারে পুঁজির জন্য পুজো দরকার হলে পুজো করতে হবে। এটাই শেষ কথা।

AI generated feature image is representational.

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com