দোহাই লাগে! শিক্ষা নিয়ে আর যাই করেন, দেশের আইআইটিগুলিকে গাধার আস্তাবলে পরিণত করবেন না। লিখলেন উত্তম দেব—
যে কোনও অকাল মৃত্যুই দুঃখজনক। কিন্তু ন্যায় মৃত্যুর থেকেও বড়। একজনের মৃত্যুর কারণে সমাজ আরেকজনের প্রতি অন্যায়-অবিচার করতে পারে না। আইআইটি-বম্বের ছাত্র সাহিল ওয়াকোডের আত্মহত্যার ঘটনা নিঃসন্দেহে বেদনার। বাচ্চাছেলে! দেশের সেরা প্রতিষ্ঠানের পড়ুয়া। সারাটা জীবন পড়ে ছিল। কত ঘাত-প্রতিঘাত, ত্রুটি-বিচ্যুতি মানুষের জীবনে আসে। সামলে নিতে পারাটাই জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষা। এই শিক্ষাটাই ওর হয় নি। কেউ ওকে দেয় নি। ওর বাবা-মাও না। কিন্তু সাহিলের মৃত্যুর জন্য অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে কেন শাস্তি পেতে হবে?
একটা ছেলে আইআইটি-বম্বের মতো দেশের ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’-র এনার্জি সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। সে পরীক্ষার হলে মোবাইল নিয়ে ঢুকেছিল, যা কর্তৃপক্ষের দ্বারা অনুমোদিত নয়। চ্যাটজিপিটি খুলে উত্তর লিখছিল। ইনভিজিলেটরের হাতে ধরা পড়ে ছেলেটি পরীক্ষার হল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিল। এই তো কাহাবত! এখানে পরীক্ষা পরিদর্শক অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার দোষটা কোথায়? একজন পরীক্ষা পরিদর্শক হিসেবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করেছেন মাত্র। অধ্যাপক দুল্লার কী করা উচিত ছিল? সাহিল ওয়াকোড নামের ছাত্রটি পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করছে দেখেও না দেখার ভান করে সরে পড়া?
আইআইটি-বম্বের আত্মঘাতী ছাত্রটি অনগ্রসর সম্প্রদায়ের। সাহিলের পরিবার অভিযোগ তুলেছে, তাঁকে জাত তুলে অপমান করতেন অধ্যাপক দুল্লা। করে থাকলে নিঃসন্দেহে অন্যায় করেছেন। প্রমাণিত হলে আইনে যা শাস্তি আছে, তিনি পাবেন। আইআইটি-বম্বে কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। কিন্তু তদন্তের রিপোর্ট সামনে আসার আগেই অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লাকে নিলম্বিত করা হল কোন যুক্তিতে? অভিযোগ ওঠা মাত্রই গর্দান নিতে হবে? সত্যাসত্য যাচাইয়ের বালাই নেই! মৃত ছাত্রটি অনগ্রসর সম্প্রদায়ের একজন— এটাই পঠনপাঠনে নিবেদিতপ্রাণ একজন অধ্যাপককে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই শাস্তি দেওয়ার জন্য যথেষ্ট?
একজন ভাল শিক্ষককে অপদস্থ করা হচ্ছে এই কারণে যে তিনি এক পরীক্ষার্থীকে নকল করার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন! তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ (মৃত ছাত্রটিকে জাত তুলে অপমান) সম্পূর্ণ মিথ্যে, তখন এই অধ্যাপকের সম্মানহানির ক্ষতিপূরণটা কীভাবে মিটিয়ে দেবে আইআইটি-বম্বে?
ড. সূর্যনারায়ণ দুল্লা আইআইটি-বম্বের ‘এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনয়ারিং’-এর একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক। নিজের বিষয়ে তিনি যথেষ্ট কৃতবিদ্য। তিনি নিজে শক্তি বিজ্ঞানের একাধিক বিষয়ের উপর গবেষণা করেছেন। অসংখ্য ছাত্রছাত্রী তাঁর অধীনে গবেষণা করে পিএইচডি লাভ করেছেন। এখনও বহু গবেষক ড. দুল্লার তত্ত্বাবধানে গবেষণায় রত আছেন। একজন ভাল শিক্ষককে অপদস্থ করা হচ্ছে এই কারণে যে তিনি এক পরীক্ষার্থীকে নকল করার সময় হাতেনাতে ধরে ফেলেছেন! তদন্তে যদি প্রমাণিত হয় অধ্যাপক সূর্যনারায়ণ দুল্লার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ (মৃত ছাত্রটিকে জাত তুলে অপমান) সম্পূর্ণ মিথ্যে, তখন এই অধ্যাপকের সম্মানহানির ক্ষতিপূরণটা কীভাবে মিটিয়ে দেবে আইআইটি-বম্বে?

ছাত্র পরীক্ষায় নকল করে ধরা পড়ে সুইসাইড করবে। শাস্তি পাবেন কে? ইনভিজিলেটর। বা! দারুণ তো। আইআইটি-তেও নকল করার স্বাধীনতা চাই? দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা যে ইনস্টিটিউশনে পড়ালেখা করেন। যে ইনস্টিটিউশনের পাসআউটরা পৃথিবীর সেরা সেরা প্রতিষ্ঠানের শীর্ষপদে চাকরি পান, সেই ইনস্টিটিউশনের মানের অবনতি না ঘটানো পর্যন্ত আমরা কি সন্তুষ্ট হব না? একটা কথা কেন আমরা বলছি না, আইআইটির মতো ইনস্টিটিউটে যারা পড়ে, তাদের চাপ নিতে হয়। এটা নতুন কোনও ঘটনা নয়। আইআইটিতে দিনরাত এক করে খাটতে হয়। যে চাপ নিতে পারবে না, আইআইটি তার জন্য নয়। সিদ্ধিলাভ করতে হলে কঠোর সাধনার বিকল্প নেই।
সবথেকে অদ্ভুত লাগে যখন দেখি, সরকার যে প্রতিষ্ঠানকে ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’ হিসেবে গড়তে চায়, আবার সেই প্রতিষ্ঠানের চৌকাঠ থেকেই প্রকৃত ‘এক্সেলেন্ট’-দের তাড়িয়ে দেওয়ার যাবতীয় ব্যবস্থা সরকারকেই করতে হয়! এটাই হচ্ছে আমাদের দেশের রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতা। যেখানে ছাঁকনিটা হওয়ার কথা শুধু মাত্র মেধার, সেখানে ছাঁকনিটা হচ্ছে অন্য কিছুর। আইআইটির মতো ‘সেন্টার অব এক্সেলেন্স’-তো এক্সেলেন্টদের জায়গা। সেখানে যারা পড়ার সুযোগ পায়, আমরা ধরে নেবো, তারা সবাই এক্সেলেন্ট। সরকার কি ‘কপিবুক’ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি করার জন্য দেশের আইআইটিগুলিতে কোটি কোটি টাকা ঢালছে?
বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও পুঁজি- এই তিনের উপর দখল না থাকলে আধুনিকতম বিশ্বের বৈষয়িক দুনিয়ার অধিপতি হওয়ার স্বপ্ন না দেখাই ভাল। মেধা এবং দক্ষতা ছাড়া বিজ্ঞান-প্রযুক্তির দুনিয়ায় আমরা অচল। ফাল পেড়ে, আবেগ দেখিয়ে, অতীতের স্মৃতিচারণ করে বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতে কামিয়াব হওয়া যায় না। অনেক মেধাবী ও দক্ষ জনবলের প্রয়োজন। তাদেরকে সঠিক গবেষণায় নিয়োজিত করতে হবে। উন্নত মানের গবেষণার জন্য আবার প্রচুর অর্থ দরকার। তার মানে অর্থ, মেধা, গবেষণা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
দেশের ভাল ভাল ইনস্টিটিউটগুলিকে ধ্বংস করে দেওয়া মানে দেশটাকেই ধ্বংস করে দেওয়া। জাতীয়তাবাদ মানে মাঠ কাঁপিয়ে চেল্লানো নয়। মেধাই হচ্ছে মানুষের প্রকৃত শক্তি— যা দিয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিকে আয়ত্ত্ব করা যায়। দেশের সবথেকে মেধাবীদের দেশের কাজে লাগানোটাই সবথেকে বড় জাতীয়তাবাদ। মেধা ও দক্ষতাকে পেছনের সিটে ঠেলে দিয়ে আপনি দেশকে সুপার পাওয়ার করবেন! শিক্ষা নিয়ে আর যাই করেন, দেশের আইআইটিগুলিকে দয়া করে গাধার আস্তাবলে পরিণত করবেন না। দেশ একেবারে শেষ হয়ে যাবে।
Feature image is representational and AI generated.
