ডেস্ক রিপোর্ট: রাজ্যের হোটেলগুলি কি জতুগৃহ? সোমবার ভোরে তারাপীঠের পর বুধবার গভীর রাতে কলকাতার মির্জা গালিব স্ট্রিট— দু’দিনের ব্যবধানে দুই হোটেলে অগ্নিকান্ডে ১৭ জনের মৃত্যু! পিঠোপিঠি দুই অগ্নিকান্ডের জেরে হোটেল ও অতিথিনিবাসগুলির অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে নাগরিক মহলে। এই পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য জুড়ে বেসরকারি হোটেল ও অতিথিনিবাসগুলির অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার অডিট করার সিদ্ধান্ত নিল রাজ্য সরকার।
রাজ্যের হোটেল ও গেস্ট হাউসগুলির অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা কতটা মজবুত। আদৌ সব হোটেল-অতিথিনিবাসে দমকলের নির্দেশিকা অনুযায়ী অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা আছে কিনা। ফায়ার ব্রিগেডের নো অবজেকশন সার্টিফিকেট ছাড়াই রাজ্যে কতগুলো হোটেল-গেস্ট হাউস চলছে, সব খতিয়ে দেখা হবে অডিটে। পূর্বতন সরকারের আমলে কলকাতা সহ রাজ্যের অন্যত্র হোটেল-রেস্তরাঁ ও গেস্ট হাউসগুলিকে ট্রেড লাইসেন্স ও ফায়ার লাইসেন্স প্রদানে কোনও দুর্নীতি-অনিয়ম হয়েছিল কিনা, অডিটে তাও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানিয়েছেন রাজ্যের দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী।

নিউ মার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি হোটেলের তিন তলায় বুধবার রাত দুটোর দিকে আগুন লাগে। খবর পেয়ে পাঁচ মিনিটের মধ্যে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও আবাসিকদের উদ্ধারে অভিযানে নামেন দমকলকর্মীরা। হোটেলটিতে ওঠানামার সিঁড়ি সঙ্কীর্ণ এবং সরু করিডোরের দু’পাশে আবাসিকদের থাকার রুম। দুর্ঘটনার সময় সবাই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন ছিলেন। হোটেলে আগুন লেগেছে শুনে আবাসিকেরা ঘুম চোখে দরজা খুলে বেরোতে গিয়ে দেখেন পুরো করিডোর ধোঁয়ায় ঢেকে গেছে। কেউ কেউ ছাদে উঠে গেলেও অনেকেই ঘরের মধ্যে আটকা পড়েন।
দমকলকর্মীরা দ্রুত সময়ের মধ্যে হোটেলটি থেকে ৬০ জন আবাসিককে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠান। ৯ জন আবাসিকের মৃত্যু হয়েছে। তাঁদের মধ্যে ছ’জন পুরুষ, দু’জন মহিলা এবং একটি শিশু। ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ হয়ে সকলের মৃত্যু হয়েছে বলে হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে। আরও সাত-আটজনের চিকিৎসা চলছে। মৃতদের একজন হোটেলেরই কর্মী, বাকিরা বাংলাদেশ থেকে আসা পর্যটক। মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই তা নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন দমকলকর্মীরা। কিন্তু তারপরেও ৯ জনের প্রাণহানি কেন হল?
নয়টি প্রাণের মৃত্যুর জন্য হোটেলটির পরিকাঠামোকেই দায়ী করছে নিউ মার্কেট থানার পুলিশ ও দমকল। মির্জা গালিব স্ট্রিটের যে বহুতলের তিন তালায় আগুন লেগেছিল, তার প্রত্যেকটি তলায় একটি করে হোটেল-গেস্ট হাউস। কোনওটিতেই অগ্নিকান্ড প্রতিরোধ করার মতো ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। কোনও হোটেলে আপৎকালীন নির্গমন নেই। ওঠানামার একটিই লিফ্ট ও সঙ্কীর্ণ সিঁড়ি। সঙ্কীর্ণ করিডোরের দুই পাশ দিয়ে ঘিঞ্জি ঘর। যে হোটেলটিতে আগুন লেগেছিল, সেই হোটেলের কর্তৃপক্ষ দমকলের কোনও নিয়মই মানেন নি বলে অভিযোগ।
ঘটনার তদন্তে সিট গঠন করেছে লালবাজার। মির্জা গালিব স্ট্রিটের হোটেলে অগ্নিকান্ডের পরিপ্রেক্ষিতে দমকলমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরীর সঙ্গে দীর্ঘক্ষণ কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অগ্নিনির্বাপন দফতরের উচ্চপদস্থ আধিকারিদের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন দমকলমন্ত্রী। হোটেলগুলিতে আগুন লাগার কারণ ও অগ্নিকান্ডের সময় হোটেলগুলি থেকে আবাসিকদের দ্রুত ও নিরাপদে উদ্ধারে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে ফায়ার ফাইটারদের, তা আধিকারিকদের কাছে জানতে চান মন্ত্রী। রাজ্যের দমকলমন্ত্রী সাংবাদিকদের জানান, “পূর্বতন সরকারের অভিশাপ আমাদের বহন করতে হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, “গত ১৫ বছর ধরে ব্যাঙের ছাতার মতো হোটেল ও গেস্ট হাউস গজিয়ে উঠেছে রাজ্যে। সেই সব হোটেল ও গেস্ট হাউস কীভাবে সরকারি ও স্থানীয় পুর প্রশাসনের ছাড়পত্র পেল, তা আমরা খতিয়ে দেখব।”
কৌশিক চৌধুরী বলেন, “পরিস্থিতি দেখে মনে হচ্ছে, এই ধরনের হোটেল ও অতিথিশালা গড়ে তোলার সময় অগ্নিনিরাপত্তা বিধির তোয়াক্কা করা হয় নি। অগ্নিনিরাপত্তা বিধি লংঘন করার পরেও হোটেল ও অতিথিশালাগুলির ফায়ার ব্রিগেড ও কর্পোরেশন থেকে ছাড়পত্র পেতে কোনও অসুবিধে হয় নি।” এই ধরনের বেআইনি কার্যকলাপ আর চলবে না বলে আশ্বাস দেন দমকলমন্ত্রী। নিউ মার্কেটের হোটেলে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় কলকাতার পূর্বতন মেয়র ও মমতা সরকারের পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমকে একহাত নিয়েছেন রাজ্যের বর্তমান পুর ও নগরোন্নয়নমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি প্রশ্ন তোলেন— “পূর্বতন সরকার কী করেছে? পূর্বতন মন্ত্রী, যিনি আমার জায়গায় ছিলেন, তিনি কী করেছেন? তিনি তো মেয়রও ছিলেন। কী করে ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হল? কী করে ফায়ার লাইসেন্স দেওয়া হল? কী করে এমন সব ভবনে হোটেল খোলার অনুমতি দেওয়া হল?” কলকাতা শহরে এমন আরও কত হোটেল-লজের পরিস্থিতি জতুগৃহ হয়ে রয়েছে, তা নিয়ে শঙ্কিত অগ্নিমিত্রা।
Feature graphic is representational and AI generated.