জনমোহিনী নীতি একটা নির্বাচিত সরকারের জন্য কত বড় গলার কাঁটা হতে পারে, তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত অন্নপূর্ণা যোজনা। মমতা লক্ষ্মীর ভান্ডার দিয়ে শুরু করেছিলেন। মহিলা ভোট তৃণমূলের কাছ থেকে কেড়ে নিতে ভাতা ১,৫০০ টাকা থেকে দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৩,০০০ টাকা করার প্রতিশ্রুতি দেয় বিজেপি। বিজেপি ভোটে তো জিতল, কিন্তু জনমোহিনীর বাঘের পিঠ থেকে নামবে কীভাবে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার!
লক্ষ্মীর ভান্ডারে ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে মমতার সরকার বরাদ্দ করেছিল ২৬,১০০ কোটি টাকা। মমতা বাছবিচার না করে ২ কোটি ২২ লক্ষ মহিলাকে লক্ষ্মীর ভান্ডার দিতেন। শুভেন্দু অধিকারীর সরকার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের বাজেটে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য বরাদ্দ করেছে ৩৬,০০০ কোটি টাকা, লক্ষ্মীর ভান্ডারের থেকে ৯,৯০০ কোটি টাকা বেশি। এই আগস্ট মাসে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ মহিলাকে অন্নপূর্ণার ভাতা দেওয়া হয়েছে বলে মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন। এই সংখ্যক মহিলাকে ৩,০০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হয়ে থাকলে এই মাসে সরকারের খরচ হয়েছে ৪,৩৫০ কোটি টাকা! উপভোক্তার সংখ্যা যদি একই থাকে, তবে অন্নপূর্ণা বাবদ সরকারের বছরে খরচ ৫২,২০০ কোটি টাকা!
অথচ অন্নপূর্ণা খাতে সরকারের ঘোষিত বাজেট বরাদ্দ ৩৬,০০০ কোটি টাকা। পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিরিক্ত আরও ১২,০০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করার কথা মাথায় আছে সরকারের। মোট ৪৮,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু তাতেও তো ১ কোটি ৪৫ লক্ষ উপভোক্তাকে ১২ মাস ৩,০০০ করে দেওয়ার টাকা কুলিয়ে উঠছে না। ৪,২০০ কোটি টাকার ঘাটতি থাকছে। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্তের তো মাথায় ঘায়ে কুকর পাগলের দশা!
সবথেকে বড় কথা। যোগ্য-অযোগ্যের বাছবিচার কে মানবে? যিনি অন্নপূর্ণা তিনিই চন্ডী। চারদিকে অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে যা ধুন্ধুমার পরিস্থিতি দেখছি, তাতে মা চন্ডীদের ক্ষোভ সামাল দিতে আগে-পরে কমপক্ষে ২ কোটি মহিলাকে অন্নপূর্ণা যোজনার আওতায় আনতে বাধ্য হবে সরকার। কারণ, ভোট বড় বালাই। বিগত সরকারের লক্ষ্মীর ভান্ডারের উপভোক্তাদের কাছাকাছি। আর ২ কোটি মহিলাকে মাসে ৩,০০০ টাকা করে দিলে প্রতি মাসে খরচ ৬,০০০ কোটি টাকা। বছরে ৭২,০০০ কোটি টাকা! রাজ্য সরকারের বাজেটের ১৬-১৭ শতাংশই চলে যাবে শুধু অন্নপূর্ণাদের ভাতা দিতে!
পশ্চিমবঙ্গের মতো জনঘনত্বপূর্ণ রাজ্য, যে রাজ্যের জনসংখ্যা ১২ কোটি। বিরাট সংখ্যক মানুষের হাতে যথেষ্ট টাকা নেই। পরিবারগুলির রোজগার কম। স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা যায় নি। পর্যাপ্ত সামাজিক সম্পদ তৈরি হয় নি। ঘরে বসে ভাতা পাওয়ার সহজলভ্য সুযোগ রাজনৈতিক দলগুলি একবার তৈরি করে দেওয়ার পর আর মানুষকে থামানো যাবে? থামানো যাচ্ছেও না।
ভাতাতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষ্ট সরকার স্থায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অর্থ বরাদ্দ করবে কোন দিক দিয়ে? পরিকাঠামোর উন্নয়ন হবে কার বাপের টাকায়? জনগণের টাকাই জনগণের কাছে ফিরে আসে। মমতার আমল থেকে রাজ্য সরকারের দফতরগুলিতে কার্যত কোনও নিয়োগ নেই। অদূর ভবিষ্যতে নিয়োগ হবে এই সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে না। ভাতা ভোট দেয়। ভোট ভাতা দেয়। এই চক্রের হাত থেকে সহজে রেহাই নেই।
AI generated Feature image is representational.