‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ মিসির বেসরা গ্রেফতার! অবশেষে নিশ্চিহ্ন মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি


শুধু মাথার দাম‌ই মিসিরের গ্রেফতারের গুরুত্ব বোঝার জন্য যথেষ্ট নয়। মিসির বেসরার গ্রেফতারের ফলে সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটি সম্পূর্ণ অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ল। পৃথিবীর যে কোনও কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত হয় কেন্দ্রীয় কমিটি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির মাথায় থাকা পলিটব্যুরো দ্বারা। এই মুহূর্তে মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির সকল সদস্য হয় মৃত নয় ধৃত অথবা আত্মসমর্পণ করে সমাজের মূলস্রোতে পুনর্বাসিত। দেশের মাটি থেকে সশস্ত্র মাওবাদীদের নির্মূল করতে ২০২৬-এর ৩১ মার্চ সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তার আগেই অবশ্য সিপিআই (মাওবাদী)-র সাংগঠনিক ও সামরিক কাঠামো ভেঙে চুরমার হয়ে গিয়েছিল যৌথবাহিনীর অভিযানে।

মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র জীবিত সদস্য মিসির বেসরা ধৃত। মিসিরের গ্রেফতারের সাথে সাথেই কি শেষ হয়ে গেল মাওবাদীরা? সংগৃহীত ফটো।

তিপ্পিরি তিরুপতি (দেবুজি) ও মাল্লা রাজি রেড্ডি ( সংগ্রাম)-র আত্মসমর্পণের পর মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির জীবিত সদস্যদের মধ্যে একমাত্র মিসির‌ই ছিলেন পুলিশের নাগালের বাইরে। চলতি বছরের ২২ ফেব্রুয়ারি ৬২ বছরের তিপ্পিরি তিরুপতি ওরফে দেবুজি তেলেঙ্গানা পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। দেবুজির সঙ্গেই আত্মসমর্পণ করেছিলেন মাল্লা মাজি রেড্ডি ওরফে সংগ্রাম। ২০২৫-এর মে মাসে ছত্তীশগঢ়ের নারায়ণপুরের জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ নিহত হ‌ওয়ার পর মাওবাদী দলের সাধারণ সম্পাদক তথা সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব দেবুজিই পেয়েছিলেন বলে কোন‌ও কোন‌ও মহল থেকে দাবি করা হয়।

২০২৫-এর জানুয়ারি মাসেও সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটিতে ১৭ জন সদস্য সক্রিয় ছিলেন। এই বছরের ফেব্রুয়ারির শেষে তিপ্পিরি তিরুপতি ও মাল্লা রাজি রেড্ডি আত্মসমর্পণের পর তা মাত্র একজনে এসে ঠেকে। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) মিসির বেসরা পুলিশের জালে ধরা পড়তেই মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটি ধ্বংস হয়ে গেল। কেন্দ্রীয় কমিটির আরেক সদস্য এই মুহূর্তে জীবিত না মৃত, বেঁচে থাকলেও কোথায় আছেন, তা নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের গোয়েন্দাদের হাতে সঠিক তথ্য নেই। তিনি ৭৭ বছরের মুপ্পালা লক্ষ্মণ রাও ওরফে ‘গণপতি’। জীবিত থাকলেও বয়স ও বার্ধক্যের ভারে গণপতি যে দল ও সশস্ত্র রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে পুরোপুরি নিষ্ক্রিয় সে ব্যাপারে নিশ্চিত পুলিশ।

সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর প্রাক্তন সাধারণ সম্পাদক মুপ্পালা লক্ষ্মণ রাও ওরফে ‘গণপতি’র একমাত্র ফটো। ৭৭ বছরের গণপতির অবস্থান ও পরিণতি সম্পর্কে নিশ্চিত নন গোয়েন্দারা। সংগৃহীত ফটো।

২০১৮- নভেম্বরে বার্ধক্যজনিত কারণে সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর সাধারণ সম্পাদক পদ থেকে গণপতি অব্যাহতি নিলে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন বাসবরাজ। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি নেওয়ার পরেই অসুস্থ গণপতি গ্রেফতারি এড়াতে নেপাল হয়ে ফিলিপাইনে পালিয়ে গিয়েছেন বলে সন্দেহ গোয়েন্দাদের একাংশের। ২০২৫-এর ২১ মে ছত্তীশগঢ়ের নারায়ণপুরের জঙ্গলে নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে ২৭ জন গেরিলা সহ নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ নিহত হন। বাসবরাজের মৃত্যুই ছিল মাওবাদীদের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর শেষ বড় আঘাত। কেন্দ্রীয় কমিটির বাকি সদস্যরা কেউ নিহত, কেউ‌ গ্রেফতার ও কেউ আত্মসমর্পণ করার পর স্বাভাবিকভাবেই একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিলেন মিসির বেসরা।

গণপতির স্থলাভিষিক্ত হয়েছিলেন নাম্বালা কেশব রাও ওরফে বাসবরাজ। ২০২৫-এর ২১ মে ছত্তীশগঢ়ের নারায়ণপুরের জঙ্গলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে বাসবরাজ নিহত হ‌ন। সংগৃহীত ফটো।

মাওবাদীদের কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র সক্রিয় সদস্য মিসিরকে হন্যে হয়ে খুঁজছিল পুলিশ। ধাওয়া খেয়ে মিসির ঝাড়খণ্ড-ওড়িশার সীমান্তবর্তী সারণ্ডার জঙ্গলে আশ্রয় নিয়েছিলেন। নকশাল দমনে নিয়োজিত যৌথ‌ বাহিনী সারান্ডার জঙ্গল ঘিরে চিরুনি তল্লাশি শুরু করলে ক্রমাগত স্থান বদল করতে করতে ঝাড়খন্ডের আরও ভেতরে ঢুকে পড়েন তিনি। মিসির বেহারার হয় এনকাউন্টারে নিহত হ‌ওয়া নয় পুলিশের হাতে গ্রেফতার অথবা আত্মসমর্পণ ছিল শুধু সময়ের অপেক্ষা।

সাম্প্রতিক সময়ে মিসির কয়েকজন সঙ্গী সমেত ঝাড়খন্ডের পারশনাথ পাহাড় সংলগ্ন জঙ্গলে লুকিয়ে ছিলেন। তাঁর গতিবিধি টের পেয়ে ছাপা মারে কেন্দ্রীয় বাহিনী। পালাতে গিয়ে মঙ্গলবার রাত ৯টা নাগাদ ধানবাদ-গিরিডির সীমান্ত লাগোয়া জঙ্গলে ধরা পড়ে যান মিসির বেসরা। মোচু ও সৌরভ নামে তাঁর দুই সঙ্গীকেও গ্রেফতার করেছে পুলিশ। দলের ভেতর ভাস্কর ও সাগর নামে পরিচিত ছিলেন মিসির। তাঁর বাড়ি গিরিডি জেলার হালরাডিহিতে। কলেজে পড়তে পড়তেই নকশালপন্থী রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন তিনি।

২০০৭ সালেও একবার মিসিরকে গ্রেফতার করেছিল ঝাড়খন্ড পুলিশ। ২০০৯ সালে বিহারের লখিসরাই জেলা আদালতে এক মামলার শুনানিতে হাজিরা দিতে মিসিরকে পুলিশ নিয়ে গেলে, পুলিশের উপর অতর্কিত হামলা চালিয়ে আদালত চত্বর থেকেই তাঁকে তুলে নিয়ে যায় মাওবাদীরা। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছিলেন ২০২৬-এর ৩১ মার্চের মধ্যেই মাওবাদীদের নির্মূল করতে হবে। সিপিআই (মাওয়িস্ট)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির একমাত্র জীবিত সদস্য মিসির বেসরা গ্রেফতার হ‌ওয়ার সাথে সাথেই ২০২৬-এর জুলাই মাসের শেষে মাওবাদীরা রাজনৈতিক ও সামরিকভাবে নির্মূল হল বলাই যায়।

Feature graphic is representational.


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

nagariknewz.com