দলকানা ও দলদাস বাদে সকল শান্তিপ্রিয় বাঙালি জ্ঞানেশ কুমারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছেন। কারণ অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন তিনি। লিখলেন উত্তম দেব-
পশ্চিমবঙ্গে অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান। এই প্রক্রিয়ার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভোটগ্রহণ সদ্যই সম্পন্ন হয়েছে। ২৯৪জন প্রার্থীর ভাগ্য স্ট্রংরুমে ইভিএমে বন্দী। আগামী ৪ মে ভোটগণনা। পশ্চিমবঙ্গবাসীর জনাদেশ পেয়ে কোন দল রাজ্যে সরকার গঠন করবে, তা ওইদিন বিকেলের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। নির্বাচন প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে বহুদফায় ভোটগ্রহণ বাংলায় রেওয়াজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এ’বার সেই রেওয়াজ ভেঙে মাত্র দুই দফায় ভোটগ্রহণ শেষ করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রথম দফায় রাজ্যের ১৬ জেলায় ১৫২ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৩ এপ্রিল। দ্বিতীয় দফায় রাজধানী কলকাতার পাশাপাশি ছয় জেলার ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে ২৯ এপ্রিল। আচ্ছা বলুন তো পশ্চিমবঙ্গে এত সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ ভোটগ্রহণ আর কবে দেখেছেন? স্মৃতির অলিগলি হাতড়ে দেখুন তো মনে করতে পারেন কিনা!
মানি পাওয়ার, মাসল পাওয়ার এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা বা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ পাওয়ার ব্যবহার করে নির্বাচনকে নানাভাবে প্রভাবিত করা যায়। কিন্তু সবথেকে খারাপ হল ভোটগ্রহণের দিন হিংসা-অশান্তি, বুথ দখল করে ছাপ্পা এবং সাধারণ মানুষকে ভোট দিতে বাধা দেওয়া। এই রাজ্যে ভোটের সময়সূচি ঘোষণার তিন মাস আগে থেকেই রাজনৈতিক হিংসা বেড়ে যায় এবং ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসে, ততই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনকালীন সময়ে রাজনৈতিক হিংসাকে নিয়ন্ত্রণ করা কতটা কঠিন, তা ভারতের নির্বাচন কমিশনের কর্তাব্যক্তিরা ভালোই জানেন। এবারের দুই দফা ভোটের কোনও দফাতেই মানুষের অপমৃত্যু হয় নি। প্রথম দফায় মালদহ, মুর্শিদাবাদ, বীরভূম, পূর্ব মেদিনীপুর এবং কোচবিহারের মতো স্পর্শকাতর জেলাগুলিতে পর্যন্ত প্রাণহানি ঘটে নি!
দ্বিতীয় দফার ভোটে ভাঙড়ের মতো হিংসাদীর্ণ অঞ্চলে একটা পটকা ফাটানোরও সাহস পায় নি দুষ্কৃতীরা। সংখ্যালঘু অধ্যুষিত ভাঙড়ের সাধারণ মানুষ দু হাত তুলে নির্বাচন কমিশন, কেন্দ্রীয় বাহিনীকে আশীর্বাদ করেছেন। কারণ তাঁরা বহুদিন পর নির্ভয়ে, নিরাপদে নিজের ভোট নিজে দিয়ে অক্ষত দেহে ঘরে ফিরে এসেছেন। ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনেও কম কড়াকড়ি করে নি নির্বাচন কমিশন। তারপরেও ভোট ঘিরে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২৪ জন নিহত হয়েছিল। তাহলেই বুঝুন, ছাব্বিশে বাংলায় রক্তপাতহীন নির্বাচন করতে কত নিবিড় পরিকল্পনা করে এগোতে হয়েছে কমিশনকে!
২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময়ে ভাঙড়ের কথা ভাবুন আর বুধবার বিধানসভা ভোটের দিনের ভাঙড়ের কথা ভাবুন! পরিস্থিতিতে আকাশ-পাতাল ফারাক আপনার চোখে পড়ছে না? দুই দফায় ২৯৪টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়ে গেল। অথচ একটা লাশ পড়ল না! বোমাবাজি হল না! ওয়ান শটার হাতে বুথের আশেপাশে দুষ্কৃতীদের দাপাদাপির দৃশ্য নিউজ চ্যানেলের ক্যামেরায় ধরা পড়ল না! সবথেকে বড় কথা, মানুষের ভোটাধিকার সুরক্ষায় সফল হয়েছে নির্বাচন কমিশন। আপনি যদি নেহাতই দলকানা না হন এবং রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একজন সংবেদনশীল মানুষ হন, আপনি দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর টিমকে ধন্যবাদ জানাতে বাধ্য।
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ ভোট করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। নির্বাচন কমিশন সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কঠোর হলে সঙ্গত কারণেই গাত্রদাহ হয় শাসকদলের। যে দল যখন বিরোধী পক্ষে থাকে, সেই দল চায় নির্বাচন কমিশন কঠোর হাতে নির্বাচন পরিচালনা করুক। এই বিরোধীরাই যখন ক্ষমতায় গিয়ে বসেন, তখন তাঁদের ভাষা পাল্টে যায়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন বিরোধী নেত্রী ছিলেন, তখন তিনি চাইতেন, রাজ্যে প্রতিটি নির্বাচন কেন্দ্রীয় বাহিনীর অধীনে হোক। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর মমতা নির্বাচন এলেই নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় বাহিনীকেও তাঁর প্রতিপক্ষ বানিয়ে ফেলেন। এটা খুবই সত্যি কথা যে নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষ হলে কমিশনের অনেক পদক্ষেপই শাসকদলকে অসন্তুষ্ট করে।
শাসকদলের সঙ্গে পুলিশ ও আমলাতন্ত্রের মাখামাখি তো গোপন কিছু নয়। নির্বাচনের সময় এই আঁতাত না ভাঙতে পারলে কমিশনের পক্ষে কীভাবে অবাধ, নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু ভোট করা সম্ভব? জ্ঞানেশ কুমার তৃণমূল ঘনিষ্ঠ আমলা ও পুলিশ আধিকারিকদের পদ থেকে অপসারণ করলে মমতার রাগের কারণ আমরা বুঝি। রাজ্য পুলিশ বুথে মোতায়েন থাকলে যদি জনগণ অবাধে নিজের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারত, তাহলে কেন্দ্রীয় বাহিনীর দরকারই পড়ত না। তৃণমূলের আমলে পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনগুলির কথা রাজ্যের মানুষ ভুলে যায় নি। মীরা পাণ্ডের মতো নির্ভীক আইএএসকে রাজ্য নির্বাচন কমিশনার পদে বসিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্কেল হয়েছিল। এরপর থেকে চোখ-কান ও মেরুদন্ড পরীক্ষা করে যতজনকে তিনি রাজ্য নির্বাচন কমিশনারের চেয়ারে বসিয়েছেন, তাঁরা প্রত্যেকেই একজন আরেকজনের থেকে বেশি দলদাস ছিলেন। পশ্চিমবঙ্গ হচ্ছে সেই রাজ্য, যে রাজ্যে পুরসভা নির্বাচনে শাসকদলের সন্ত্রাস সামাল দিতে না পেরে ভোট চলাকালেই পদত্যাগ করে পালিয়েছিলেন নির্বাচন কমিশনার।
ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে ধোলাই করে সাফসুতরো করেছিলেন প্রাক্তন প্রধান নির্বাচন কমিশনার টিএন শেষন। উঠতে-বসতে এই তামিল ব্রাহ্মণকে গালমন্দ করতেন যে দু’জন রাজনৈতিক নেতা, তাঁদের একজন বিহারের লালুপ্রসাদ যাদব, আরেকজন পশ্চিমবঙ্গের জ্যোতি বসু। কেন করতেন? কারণ শেষন তাঁদের কায়েমি স্বার্থে জোরেশোরে আঘাত করেছিলেন। একই কারণে দেশের বর্তমান প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার অনেকেরই চক্ষুশূল। কিন্তু মমতার মতো কেউ আদাজল খেয়ে জ্ঞানেশের পিছনে পড়ে থাকেন নি। যদিও জ্ঞানেশ কুমারকে কর্তব্য থেকে টলানো যায় নি। তিনি পাহাড় প্রমাণ প্রতিরোধের মুখে এসআইআর প্রক্রিয়া শেষ করে তবে ছেড়েছেন। এসআইআর নিয়ে অবশ্য কিছু বিতর্ক আছে। কিন্তু এসআইআর-এর ফলে অনেক প্রকৃত ভোটারের নাম কাটা গেলেও ভুতুড়ে ভোটার মুক্ত হয়ে ভোটার তালিকা শুদ্ধ ও স্বচ্ছ হয়েছে। ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে টিএন শেষন মহান। তিনি ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থায় যে সব বড় ধরণের সংস্কার এনেছিলেন, তার সুফল আমরা এখনও পাচ্ছি। তবে জ্ঞানেশ কুমার শেষনের থেকেও কঠিন কাজটি সেরে ফেলতে সফল হয়েছেন। আর তা হল পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিক হিংসাদীর্ণ রাজ্যে একটি হিংসামুক্ত, সুষ্ঠু নির্বাচন উপহার দেওয়া।
হ্যাঁ; পশ্চিমবঙ্গেও যে হিংসামুক্ত অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব, জ্ঞানেশ কুমার ও তাঁর টিম তা প্রমাণ করে ছাড়লেন। ভোটগ্রহণ মিটে গেছে। শাসক ও বিরোধী- কোনও তরফ থেকেই ভোটগ্রহণ নিয়ে বড় কোনও অভিযোগ নেই। সাধারণ মানুষ তো ভয়মুক্ত পরিবেশে সানন্দে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরে নির্বাচন কমিশনকে সাধুবাদ জানিয়েই চলেছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশ কয়েক জায়গায় চড়-থাপ্পড় মেরে রাজনৈতিক দলের বেয়াড়া কর্মীদের সরিয়ে দিয়েছে। বেশ করেছে। নাগরিকদের অবাধ ভোটাধিকার নিশ্চিত করার জন্য যা করার দরকার, তার সবকিছুই করার সাংবিধানিক দায়িত্ব কেন্দ্রীয় বাহিনী ও পুলিশের আছে। তারা সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেছে বলেই বাংলায় ৯৩ শতাংশ ভোট পড়েছে। যা দেশের ইতিহাসে সর্বকালীন রেকর্ড। এবারের নির্বাচন সুন্দর ও শোভন করার নেপথ্যে এক বঙ্গসন্তান প্রাক্তন আইএএস-এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। তিনি সুব্রত গুপ্ত। বেঙ্গল ক্যাডারের কৃতী ও দক্ষ আমলা ছিলেন। কিন্তু উপযুক্ত মূল্য পান নি। সুব্রত গুপ্তকে বিশেষ পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচনকে কলঙ্কমুক্ত করতে তাঁর মূল্যবান পরামর্শ কাজে লাগিয়ে দারুণ সফল হয়েছে কমিশন।
ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়েছে। এখন বাকি ভোটগণনা। নির্বাচন পরবর্তী হিংসাই এখন আমাদের সবার উদ্বেগের কারণ। একুশের বিধানসভা নির্বাচনে ফল ঘোষণার পর রাজ্য জুড়ে ভয়াবহ হিংসাত্মক ঘটনা ঘটেছিল। তার পুনরাবৃত্তি রোধ প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক দল, সকলের দায়িত্ব।

লেখক পরিচিতি: উত্তম দেব। মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। কলামিস্ট। প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও ডিজিটাল সব মাধ্যমেই কাজ করেছেন। রাজনৈতিক ভাষ্যকার ও বিশ্লেষক। জাতীয়, আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক পরিস্থিতির উপর নিয়মিত কন্টেন্ট লেখেন।
Feature graphic is representational and designed by NNDC.