সম্পাদকীয়
পশ্চিমবঙ্গ, অসম, কেরালা, তামিলনাড়ু ও পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ২৩ ও ২৯ এপ্রিল দু’দফায় ২৯৪টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। চার রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত পুদুচেরি- সর্বত্রই সোমবার (৪ মে) ভোটগণনা। একাধিক বুথে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় রাজ্যের ফলতা বিধানসভার ভোটগ্রহণ বাতিল করে দিয়ে আগামী ২১ মে পুনরায় ভোটগ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ফলতার ২৮৫টি বুথেই নতুন করে ভোটগ্রহণ হবে। গণনার দিন ধার্য হয়েছে ২৪ মে। ফলে সোমবার বাংলায় ২৯৩ আসনের ভোটগণনা হবে।
দেশের চার রাজ্য ও একটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু সারা দেশের নজর পশ্চিমবঙ্গের দিকে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের প্রত্যাবর্তন হবে নাকি বঙ্গে বিজেপির বিজয়রথ ছুটবে- তা নিয়ে চর্চা চতুর্দিকে। জনগণ যা চাইবে তাই হবে। জনাদেশ ইভিএমে বন্দি। অধীর আগ্রহে বঙ্গবাসী প্রতীক্ষার প্রহর গুনছেন রবিবার রাত পেরিয়ে সোমবার সকাল আটটা কখন আসবে। বাংলার সাধারণ মানুষ শুধু ভোটের ফল জানতেই উদগ্রীব নয়, তাঁরা উৎকন্ঠিত নির্বাচন পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়েও। পশ্চিমবঙ্গের ট্র্যাক রেকর্ড ভাল নয়। এই রাজ্য রাজনৈতিক হিংসা ও উত্তেজনার জন্য কুখ্যাত। একুশের বিধানসভা নির্বাচনের পরে রাজ্য জুড়ে ভয়াবহ হিংসার কথা মানুষ ভুলে যায় নি। বহু মানুষ খুন হয়েছিলেন। নারীরা ধর্ষিত হয়েছিলেন। লুটপাট, বাড়িঘরে আগুনের অজস্র ঘটনা ঘটেছিল ক্যানিং থেকে কোচবিহার। হাজার হাজার মানুষকে ঘর ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছিল।
যুদ্ধে বিজয়ীরা যেমন বিজিতদের প্রাণনাশের পাশাপাশি তাদের সম্পদ থেকে সম্ভ্রম সব লুট করে, পশ্চিমবঙ্গে প্রতিটা নির্বাচনের পর অনেকটা সেই ধরণের ঘটনা ঘটে থাকে। যদিও গণতন্ত্রে হিংসা-প্রতিহিংসার কোনও স্থান নেই। কিন্তু জয়ের উল্লাসে এ কথা ভুলে যাই আমরা। এবারের পশ্চিমবঙ্গের হাই ভোল্টেজ বিধানসভা নির্বাচন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। নির্বাচন কমিশন বাংলার রাজনৈতিক বাতাবরণ ও ভোট কেন্দ্রিক সহিংসতার ইতিহাস সম্পর্কে সম্যক অবহিত। নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপের কারণে এ বারে বাংলায় প্রাক নির্বাচনী পর্বে বড় কোনও হিংসাত্মক ঘটনা ঘটে নি। দুই দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছে। ভোটগ্রহণের দুটি দিনেও বিচ্ছিন্ন দু-চারটি অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়া পরিবেশ ছিল শান্তিপূর্ণ। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতিতে মানুষ নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন।
এখন মানুষের একটাই চিন্তা, ভোটগণনা শেষেও রাজ্যের পরিস্থিতি শান্ত থাকবে তো? জনগণের রায় যাই হোক, সব দলকে মেনে নিতে হবে। বিজয়ী দলের শীর্ষ নেতৃত্বের কাঁধে গুরু দায়িত্ব দলের কর্মীদের সংযত রাখা। পরাজিত দলের সদস্য-সমর্থকেরা যেন নিরাপদে, নির্ভয়ে নিজেদের বাড়িতেই থাকার সুযোগ পান। নাগরিকদের নিরাপত্তা দেওয়ার দায়িত্ব প্রশাসনের। ভোট মিটে যাওয়ার পরেও দুই মাস পর্যাপ্ত সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সাধু উদ্যোগ। কিন্তু প্রশাসনের একার পক্ষে ১২ কোটি মানুষের এই রাজ্যে ক্যানিং থেকে কোচবিহার- প্রান্তে প্রান্তে সবাইকে নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব নয়। রাজনৈতিক দলগুলি নিজেদের কর্মীদের সংযত রাখার দায়িত্ব না নিলে নির্বাচন পরবর্তী হিংসা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখা অসম্ভব ব্যাপার।
সব থেকে দুর্ভাগ্যজনক হল, বিভিন্ন দলের শীর্ষ নেতৃত্বের মুখ থেকেই উস্কানিমূলক মন্তব্য বেরোচ্ছে। ভোটের পর দেখে নেবো- শাসকদলের পাতি নেতাদের মুখ থেকে গ্রামে গঞ্জে এই হুমকি মানুষকে অহরহ শুনতে হয়। শীর্ষ নেতারাও যদি সহিষ্ণুতা হারিয়ে আকারে ইঙ্গিতে প্রতিপক্ষ শিবিরের লোকদের ভোটের পর দেখে নেওয়ার হুমকি দিতে থাকেন, তবে পাড়ায় পাড়ায়, গ্রামে গ্রামে পাতি নেতাদের আস্ফালন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা সহজেই অনুমেয়। সব দলেরই বড় বড় নেতাদের তো কিছু হয় না। তাঁরা নিরাপত্তার ঘেরাটোপে নিরাপদেই থাকেন। মারামারি করে মরে সাধারণ মানুষ।
প্রতিবেশী ভিন্ন রাজনৈতিক দল করে, তাই তার ঘরে আগুন দিতে হবে! তার গোয়াল পুড়িয়ে দিতে হবে! পুকুরে বিষ ঢালতে হবে! তার দোকানটি ভেঙে দিতে হবে! এই প্রতিহিংসার রাজনীতি সত্তরের দশক থেকেই বাংলার রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে কলুষিত করছে। মুখে বলছো বটে বদলা নয়, বদল চাই। কিন্তু ২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনের পর বাংলা বদলার কুৎসিত রাজনীতিই দেখেছে। তাই আমরা বলতে চাই, ৪ মে যেই জিতুক, সমাজে শান্তিশৃঙ্খলা, সম্প্রীতি বজায় রাখতে হবে। বাতাসে বারুদের গন্ধ চাই না। সন্তানহারা মায়ের কান্না, স্বামীহারা স্ত্রীর কান্নায় বাংলার বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, আমরা এমন নারকীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হতে চাই না। বাংলার আকাশ জুড়ে শান্তির পারাবত উড়ুক, শব সন্ধানী শকুন নয়।
Feature image is representational.