সম্পাদকীয়
পশ্চিমবঙ্গে অষ্টাদশ বিধানসভা গঠনের জন্য নির্বাচনী প্রক্রিয়া চলছে। বৃহস্পতিবার প্রথম দফায় রাজ্যের ১৬টি জেলার ১৫২টি আসনে ভোটগ্রহণ হবে। বিধানসভা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে যে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে নির্বাচন কমিশন, তা এক কথায় অভূতপূর্ব। এই রাজ্যে ভোট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই মানুষের অনেক অভিযোগ। বিগত দিনে বাংলায় পঞ্চায়েত ও পুরসভা নির্বাচনগুলিতে ভোটদাতারা নিজেদের গণতান্ত্রিক অধিকার ঠিকমতো প্রয়োগ করতে পারেন নি। ২০১৮ ও ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে কী হয়েছে, বাংলার জনগণ তা ভুলে যায় নি। ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে রাজ্যে রক্তগঙ্গা বয়ে গিয়েছিল বললে ভুল হবে না।
পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতি এতটাই খারাপ যে বিগত দিনগুলিতে বিধানসভা ও লোকসভা নির্বাচন নিয়েও অনেক অভিযোগ উঠেছিল। এই রাজ্যে শাসকদল, পুলিশ ও প্রশাসন একটু সুযোগ পেলেই নির্বাচনে অনিয়ম ও গাজোয়ারি করতে সিদ্ধহস্ত। এইবার ভারতের নির্বাচন কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, নির্বাচনে অনিয়ম, কারচুপি ও বিশৃঙ্খলা করার কোনও সুযোগই তারা কোনও পক্ষকে দেবে না। নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপে সাধারণ জনগণ খুলি। বিরোধী দলগুলি সন্তুষ্ট। কিন্তু সবাই খুশি নন। যাঁরা খুশি নন, নির্বাচন কমিশনের কঠোরতায় তাঁদের গাত্রদাহ হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন ভোটে ছাপ্পা দেওয়ার রাস্তাগুলি বন্ধ করে দিয়েছে। ভোটারদের হুমকি-ধামকি দিয়ে শাসকদলের নেতারা জেলে যাচ্ছেন। রাজ্য সরকারের প্রশাসন যাতে রাজ্যের শাসকদলের হয়ে ভোটে পক্ষপাতিত্ব না করতে পারে, নির্বাচন কমিশন সেই লক্ষ্যে যাবতীয় ব্যবস্থা নিয়েছে। যে সমস্ত পুলিশ আধিকারিক ও আমলাদের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন আছে, তাঁদের নির্বাচনের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। মোট কথা, পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে রাজ্য প্রশাসনকে রাজ্যের শাসকদল থেকে ‘নিউট্রালাইজ’ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। নির্বাচন কমিশন এই কাজটি অতি দক্ষতার সঙ্গেই করতে পেরেছে বলে মনে হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশনের কড়াকড়ি শাসকদলের ভাল না লাগারই কথা। তাদের ভাল লাগছেও না। তারা রাগে-ক্ষোভে নির্বাচন কমিশনের মুন্ডুপাত করছে। মুখ্যমন্ত্রী পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন, দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনার সম্পর্কে বিষোদ্গার করে চলেছেন। নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ করতে যে আধিকারিকেরা নিজ নিজ দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত, তাঁদের হুঁমকি দিতে পর্যন্ত পিছপা হচ্ছেন না রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী! আর আছেন শাসকপক্ষের ধামাধরা বুদ্ধিজীবী, বিদ্বজ্জনদের দল। নির্বাচন নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপ তাঁদের ভাল লাগছে না।
রাজ্যে প্রথম দফার ভোটে ২৪০৭ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রত্যেকটা বুথে ওয়েব ক্যামেরা বসানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের দফতরে বসে আধিকারিকেরা ওয়েব ক্যামে সরাসরি ভোটগ্রহণ পর্যবেক্ষণ করবেন। নির্বাচনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাতে ন্যস্ত করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিকারিকেরা জনগণের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে অভয়বাণী দিচ্ছেন- “আপনারা নির্ভয়ে ভোট দিন। কেউ আপনাদের কেশাগ্র স্পর্শ করার সাহস পাবে না।”
চটিচাটা বুদ্ধিজীবীদের এ সব দেখে চোখে ঘুম নেই। তাঁরা বলছেন, বাংলা কি কাশ্মীর হয়ে গেল! তাঁরা বলছেন, বাংলায় কি যুদ্ধ লাগল? যখন পঞ্চায়েত নির্বাচনে বাংলায় লাশের পর লাশ পড়ছিল, যখন মানুষ বুথে গিয়ে ভোট না দিয়ে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন, তখন এই হারামিরা মুখে লিউকোপাস্ট লাগিয়ে বসেছিল। গণতন্ত্রে ভোট হচ্ছে নাগরিকদের আমানত। এই আমানত রক্ষা করা নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। বাংলায় ভোটারদের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা করার জন্য যা যা করা দরকার, নির্বাচন কমিশন তা করবে। তাতে যাদের জ্বলার জ্বলবে। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ, প্রকৃত ভোটাররা নির্ভয়ে নিজের ভোট নিজে দিতে চান। নির্বাচন কমিশনের কঠোর পদক্ষেপে তারা খুশি।
আমরা আশা করব, পশ্চিমবঙ্গের এবারের বিধানসভা নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হবে। ভোট শেষে আমরা যেন বলতে পারি, বাংলাতেও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন হয়। বাংলাকে কলঙ্ক মুক্ত করতেই বাংলার নির্বাচন নিয়ে এত কঠোর নির্বাচন কমিশন। একটা সুন্দর নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলা কলঙ্কমুক্ত হোক।
Feature image credit: Official FB page of CRPF.