বঙ্গে বিধানসভা ভোট: প্রথম দফায় জিতেছে 'রেফারি' নির্বাচন কমিশন

বঙ্গে বিধানসভা ভোট: প্রথম দফায় জিতেছে ‘রেফারি’ নির্বাচন কমিশন


নির্বাচন যদি গণতন্ত্রের রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হয়, তবে নির্বাচন কমিশন এই খেলার আম্পায়ার। আম্পায়ার বা রেফারির কাজ কত কঠিন, তা একমাত্র তাঁরাই জানেন। এই কঠিন কাজটিই প্রথম দফার ভোটে দারুণ ভালভাবে সম্পন্ন করতে পেরেছে নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে বাঙালির যে অংশ চুতিয়া, তাদের উচ্চবাচ্য মিহি হয়ে গেছে। এরা দেশের প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে বিজেপির দালাল তো বটেই এমনকি বাঙালির শত্রু বলে দাগিয়ে ছেড়েছিল। নির্বাচনের প্রথম পর্বে বাংলায় একটি লাশ‌ও পড়ে নি। ভোট দিতে বুথে পৌঁছে ছাপ্পাবাজদের হুমকিতে ভোট না দিয়েই ঘরে ফিরে আসতে হয় নি সাধারণ মানুষকে। বুথ দখল, বুথ জ্যামের খবর নেই। ইভিএম লুঠ হয় নি। এমন কোনও ছিদ্র খুঁজে পাওয়া যায় নি, যার উল্লেখ করে জ্ঞানেশ কুমারকে গাইলানো যায়। তাই চটিচাটা খচ্চরদের মুখে রা নেই।

শত সমালোচনায় বিদ্ধ প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার। ২৩ এপ্রিল কিন্তু বাংলার জনগণের চোখে হিরো তিনিই। ফাইল ফটো

বৃহস্পতিবার সারা দিনে যতটুকু গোলমাল হয়েছে, তাকে ছিটেফোঁটা বলা চলে। ভোটে অনিয়মের খবর পাওয়া মাত্রই দ্রুত পদক্ষেপ করেছে নির্বাচন কমিশন।‌ দু-তিন জায়গায় প্রার্থীদের উপর হামলা হয়েছে।‌ কিন্তু নিরাপত্তাকর্মীদের তৎপরতায় সবাই অক্ষত রক্ষা পেয়েছেন। কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর সমাজের একটি সম্প্রদায়কে লেলিয়ে দিতে কম উস্কানি দেন নি খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। বীরভূম জেলার দুবরাজপুর বিধানসভার খয়রাশোলে একটি বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনীর জ‌ওয়ানদের উপর পাথর বৃষ্টি হয়েছে।‌ জখম হয়েও ঠান্ডা মাথার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনেছেন জ‌ওয়ানেরা। বুথ পরিদর্শনে গিয়ে দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার কুমারগঞ্জ বিধানসভার বিজেপি প্রার্থী শুভেন্দু সরকার আক্রান্ত হয়েছেন। এই ঘটনায় পাঁচ অভিযুক্তকে দ্রুত গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

বীরভূমের লাভপুর, মুর্শিদাবাদের ডোমকল সহ যে জায়গাতেই দুষ্কৃতীরা খানিকটা অশান্তি করেছে, কেন্দ্রীয় বাহিনী তাদের দ্রুত সময়ের মধ্যে উপযুক্ত দাওয়াই দিয়েছে।‌ গুন্ডা-বদমাইশদের শান্ত করার একমাত্র ঔষধ লাঠ্যৌষধি। ভোটের দিন লাঠ্যৌষধি প্রয়োগে দ্বিধা করে নি পুলিশ-কেন্দ্রীয় বাহিনী। ফলে নাগরিকেরা ভোট দিয়েছেন নির্ভয়ে। ৯৩ শতাংশ ভোট তো আর এমনি এমনি পড়ে নি। নির্বাচন কমিশন উপলব্ধি করেছিল, বাংলায় অবাধ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য চাই আঁটোসাঁটো নিরাপত্তা ও প্রশাসনকে শাসকদলের প্রভাব থেকে বের করে আনা। শত সমালোচনাতেও অবিচলিত থেকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার এই দুই কাজ সঠিকভাবে করতে পেরেছেন বলেই বৃহস্পতিবার পশ্চিমবঙ্গে ১৫২টি আসনে নির্বিঘ্নে ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে।

কেন্দ্রীয় বাহিনী গ্রামে গ্রামে দাপিয়ে বেড়িয়েছে বলেই ২৩ এপ্রিল নির্ভয়ে ভোট দিতে পেরেছেন শান্তিপ্রিয় জনগণ। সংগৃহীত ফটো

পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে কেন্দ্রীয় বাহিনীর হাজার হাজার জ‌ওয়ান মোতায়েন করতে হয়েছে। রাস্তার জ‌ওয়ানদের রুটমার্চ আর সাঁজোয়া গাড়ি দেখে বাংলাপক্ষ, চটিভক্ত বাঙালি বুদ্ধিজীবী, বিদ্বজ্জনদের সে কী ন্যাকামি! বহিরাগত বাহিনী নাকি বাংলা দখল করে নিল। বাংলা কি কাশ্মীর-মনিপুর? এত জ‌ওয়ান কেন? কত প্রশ্ন। কত বাহানা। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জ‌‌ওয়ানদের ভারী বুটের শব্দে নাকি গ্রাম বাংলায় নারীদের হৃদয় প্রকম্পিত! এমন‌ও অভিযোগ করেছেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কেন্দ্রীয় বাহিনীর পাহারা ছাড়া পশ্চিমবঙ্গে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন সম্ভব? ২০১১-র বিধানসভা নির্বাচনে বুথে বুথে কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন না করলে মমতা ভোটে জিতে মুখ্যমন্ত্রী হতে পারতেন?

ভোটগ্রহণ ঘিরে নির্বাচন কমিশন কঠোর হাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা না করলে শুধু মুর্শিদাবাদ জেলাতেই দশজনের লাশ পড়ে যেত। মালদহে কমপক্ষে পাঁচজন মরত। বৃহস্পতিবারের ভোটে সেই মালদহ-মুর্শিদাবাদ মোটের উপর ঘটনাশূন্য! দেখে গর্গ চাটুজ্যে, নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী, রন্তিদেব সেনগুপ্ত, আবুল বাশার, সুজাত ভদ্রদের গাত্রে চুলকানি হচ্ছে না? প্রশাসন নিরপেক্ষ থাকলে, পুলিশ দলদাসত্ব ত্যাগ করলে অবাধ ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন যে বাংলাতেও সম্ভব, প্রথম দফার ভোটে তা প্রমাণিত। ভোট নিয়ে শাসক-বিরোধী কোন‌‌ও পক্ষের মুখে অভিযোগ নেই। তৃণমূল কংগ্রেস পর্যন্ত ভোটগ্রহণের দিন নির্বাচন কমিশনের ভূমিকায় সন্তোষ প্রকাশ করেছে। সমালোচনা করবে কোন মুখে? এমন সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ ভোট আগে কখনও দেখেছে বাংলা!

আগামী ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয় দফায় ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ। সেদিন ফের অগ্নিপরীক্ষা নির্বাচন কমিশনের। দ্বিতীয় দফায় কলকাতা সহ সাত জেলার ১৪২ আসনে ভোটগ্রহণ নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে মোট ২৩২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন। সাধারণ মানুষ নিরাপদে বুথে পৌঁছে নিজের ভোটটি নিজে দিয়ে অক্ষত দেহে ঘরে ফিরতে চান। এইটুকু নিশ্চিত করতে পারলেই নির্বাচন কমিশন জনগণের চোখে হিরো।

Feature graphic is representational and designed by NNDC.

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *