বাঙালির বিরুদ্ধে সবথেকে বড় অভিযোগ, বাঙালি ঝুঁকি নিতে ভয় পায়। এই জন্য ব্যবসার থেকে বাঁধা মাইনের চাকরিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করি আমরা। ঝুঁকি নিতে বাঙালির অনীহা ও ভীতি আছে দেখেই বাঙালি স্থিতাবস্থায় নিরাপদ বোধ করে। বাঙালি কি স্থিতাবস্থার দাস? হয়তো তাই। পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের নেতৃত্বে বামফ্রন্ট টানা ৩৪ বছর রাজত্ব করেছে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটা একটা বিরল ঘটনা। কিন্তু তাতে কি রাজ্যের বিরাট কিছু উন্নতি হয়েছে? বরং শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান ও শিল্পে পশ্চিমবঙ্গের অধঃপতন হয়েছে।
গণতন্ত্র তো অচল, অনড় কোনও ব্যবস্থা নয়। পছন্দ না হলে নাগরিকবৃন্দ যাতে সরকার পাল্টে দিতে পারেন, শাসনকর্তাদের পরিবর্তন করতে পারেন, এই জন্যই তো আধুনিক গণতন্ত্রের উদ্ভব। গণতন্ত্রের সার্থকতা তার পরিবর্তনশীলতায়। ভারতের অনেক প্রদেশেই পাঁচ বছর অন্তর সরকার পরিবর্তন হয়। সেই সব প্রদেশ কিন্তু অন্ধকারে ডুবে যায় নি। বরং উন্নয়নের নিরিখে এই প্রদেশগুলি পশ্চিমবঙ্গ থেকে অনেক এগিয়ে গেছে। বাংলা থেকে দলবেঁধে পরিযায়ী শ্রমিকরা যে সব রাজ্যে কর্মসংস্থানের জন্য যান, সে সব রাজ্যের মানুষ সরকার পাল্টানোর জন্য ১৫-২০ বছর অপেক্ষা করেন না। এটা প্রমাণ করে সরকার পরিবর্তন হলেই রাজ্য গোল্লায় যায় না।
পশ্চিমবঙ্গের জনগণের সামনে আগামী ২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল সরকার বদলের সুযোগ এসেছে। দুই দফায় বাংলায় বিধানসভা নির্বাচন। আমাদের রাজ্যে ১৫ বছর ধরে যে দল সরকার চালাচ্ছে, সেই দল ও সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের অভিযোগের শেষ নেই। ঘরে ঘরে বেকার। শিক্ষিত যুবক-যুবতীদের হাতে কাজ নেই। কারণ সরকার কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ব্যর্থ। সরকারি দফতরগুলিতে শত শত শূন্য পদ। কিন্তু নিয়োগ নেই। অন্যদিকে নিয়োগ দুর্নীতির ফলে হাজার হাজার যোগ্য প্রার্থী চাকরি থেকে বঞ্চিত। ঘুষ দিয়ে অযোগ্যদের চাকরি দিয়েছে এই সরকার। এসএসসি নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় ২৬ হাজার চাকরি বাতিল করে দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
উপযুক্ত পরিবেশের অভাবে এই রাজ্যে শিল্পপতিরা বড় বিনিয়োগ করতে ভয় পান। বিনিয়োগের অভাবে বৃহৎ শিল্প নেই। শিল্প না থাকায় রাজ্যের কর্মক্ষম যুবক-যুবতীদের সামনে কাজের সুযোগ নেই। রাজ্যের শিক্ষার হালও খুব খারাপ। সরকারি স্কুলগুলিতে শিক্ষকের অভাবে পড়ালেখা লাটে উঠেছে। ছাত্রছাত্রীদের অভাবে বহু সরকারি স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। অভিভাবকেরা সরকারি স্কুলে সন্তানদের পাঠাতে ভয় পান, কারণ সেখানে লেখাপড়া হয় না। দুর্নীতি, তোলাবাজি সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সরকারি প্রকল্পের টাকা মেরে দেওয়া হচ্ছে। দুর্নীতি ধরা পড়ায় একাধিক জনহিতকর প্রকল্পে পশ্চিমবঙ্গের জন্য বরাদ্দ স্থগিত করে রেখেছে কেন্দ্রীয় সরকার। সুচিকিৎসার জন্য পশ্চিমবঙ্গবাসীর গন্তব্য দক্ষিণের রাজ্যগুলি। বাঙালির নিজের রাজ্যের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার প্রতি ভরসা উঠে গেছে বহু আগেই।
গণতন্ত্রে নির্বাচিত সরকার জনগণের সেবক মাত্র। পাঁচ বছর পর পর জনগণ সরকারের পারফরম্যান্স যাচাই করে দেখার সুযোগ পান। নির্বাচন মানেই হচ্ছে মূল্যায়ন। সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অনেক অসন্তোষ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ। কিন্তু যে সরকার আছে, তাই মন্দের ভাল, এই সরকার চলে গেলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে- এমন মানসিকতা থাকলে কিন্তু ভারী মুশকিল। এই মানসিকতাকেই বলে স্থিতাবস্থার প্রতি দাসত্ব। ঝুঁকি না নেওয়ার ভীরুতা। বাঙালির সামনে, বঙ্গবাসীর সামনে সুযোগ এসেছে, পাল্টে দেওয়ার। নতুন কাউকে সুযোগ দেওয়ার। পনেরো বছর এক দলকে তো শাসন করার সুযোগ দিলাম। পাঁচটা বছর আরেক দলকে সুযোগ দেওয়া যায় না?
গণতন্ত্রে ভোট হচ্ছে শান্তিপূর্ণভাবে সরকার বদলের সংবিধান প্রদত্ত পথ। ইভিএমে বোতাম টিপে নীরব বিপ্লবের সুযোগ কি বাঙালি এ’বারও হাতছাড়া করবে? পাল্টানো দরকার, চাই নতুন সরকার।