'জায়েন্ট কিলার' বিধান রায়: ৪১-এর অখ্যাত এক চিকিৎসকের কাছে ৭৪-এর বিখ্যাত সুরেন্দ্রনাথের হার!

‘জায়েন্ট কিলার’ বিধান রায়: ৪১-এর অখ্যাত এক চিকিৎসকের কাছে ৭৪-এর বিখ্যাত সুরেন্দ্রনাথের হার!


৭৪ বছরের সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের তখন ভারতজোড়া খ্যাতি। এমনকি খ্যাতি বিলেত পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। অসাধারণ বাগ্মী সুরেন্দ্রনাথ সে সময় ছিলেন বাংলার প্রাদেশিক সরকারের একজন মন্ত্রীও। বছরে তাঁর বেতন ছিল ৬৪ হাজার টাকা। লোকে সুরেন ব্যানার্জিকে ‘চৌষট্টি হাজারি মন্ত্রী’ বলে ডাকত। ড. বিধানচন্দ্র রায় তখন ৪১ বছরের যুবক। রাজনীতিতে সদ্য পা রেখেছেন। ডাক্তার হিসেবেও তখন‌ তেমন নামডাক হয় নি।

বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের পরামর্শে ব্যারাকপুর মিউনিসিপ্যাল আসনে হেভিওয়েট সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সিদ্ধান্ত নেন বিধান রায়। স্বতন্ত্র বা নির্দল হিসেবেই বিখ্যাত সুরেন বাড়ুজ্যের বিরুদ্ধে ভোটে দাঁড়িয়ে গেলেন অখ্যাত চিকিৎসক বিধান রায়। পরে অবশ্য বিধান রায়কে সমর্থন দিয়েছিল দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের স্বরাজ্য দল‌ও।

সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও ড. বিধানচন্দ্র রায়। নির্বাচনে নবাগত বিধান রায়ের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন সুরেন্দ্রনাথ। ফটো: এন‌এনডিসি গ্রাফিক্স

ভোটগ্রহণের তারিখটা ১৯২৩ সালের ২৬ নভেম্বর। আলিপুর জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের দফতরে ভোটগণনা হয়েছিল ৩০ নভেম্বর। সে বারের নির্বাচনে ব্যারাকপুর মিউনিসিপ্যাল আসনে ভোটারের সংখ্যা ছিল ১১ হাজার ৬৬০ জন। ভোট দিয়েছিলেন ৮ হাজার ২৯ জন। ৫৮টি ভোট বাতিল হয়েছিল। গণনা শেষে দেখা গেল, প্রবল পরাক্রমশালী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে দিয়েছেন অখ্যাত বিধানচন্দ্র রায়। বিধান রায়ের ঝুলিতে পড়েছিল ৫৬৮৮টি ভোট। রাষ্ট্রগুরুর কপালে জুটেছিল মাত্র ২২৮৩টি ভোট। ৩ হাজার ৪০৫ ভোটে সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়কে হারিয়ে বিজয়ী হয়েছিলেন রাজনীতিতে নবাগত বিধান রায়।

সেবারের নির্বাচনে একা সুরেন্দ্রনাথ হারেন নি। অপর দুই নরমপন্থী নেতা ড. নীলরতন সরকার ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশের জেঠতুতো ভাই ব্যারিস্টার এস আর দাশ‌ও পরাজিত হয়েছিলেন।‌ কংগ্রেসের নরমপন্থী বা মডারেট নেতারা ইংরেজ সরকারকে তোষণ করতেন। তাঁদের ব্রিটিশ তোষামোদকে ভাল চোখে দেখেন নি বাংলার জনগণ। বঙ্গীয় ব্যবস্থাপক সভার নির্বাচনে মানুষের মনোভাবের প্রতিফলন ঘটেছিল বলা চলে। ভোটের ফল ঘোষণার পরদিন আনন্দবাজার পত্রিকায় হেডলাইন ছিল, “নির্বাচনের ফলাফল/ মন্ত্রীদের কেল্লা ফতে/ সুরেন্দ্রনাথ কুপোকাত/ নীলরতনের পতন।” আনন্দবাজারের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, “বাঙ্গালীর স্বদেশী যুগের মুকুটহীন রাজা, নন-কোঅপারেশন যুগের চৌষট্টি হাজারি মন্ত্রী সুরেন্দ্রনাথ আপ্রাণ চেষ্টা করিয়াও পরাজিত হ‌ইয়াছেন।”

নিজের রোজগারের একটা বড় অংশ ভোটে দুই হাতে খরচ করেও মানুষের মন জয় করতে পারেন নি ঝানু রাজনীতিবিদ সুরেন্দ্রনাথ। তাঁকে পরাজয় বরণ করতে হয়েছিল রাজনীতিতে আনকোরা বিধান রায়ের হাতে। এই ধাক্কা সামলাতে পারেন নি প্রবীণ নেতা। দুই বছর পরেই ইহলোক ত্যাগ করেন ভগ্নহৃদয় সুরেন্দ্রনাথ।

Feature image is representational and AI generated.

 


Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *